27/08/2026
ছোট দলের বড় নেতা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এইটা একটা আলাদা প্রজাতি ছিল। দল ছোট, ভোট নাই, অফিস একটা, চেয়ার তিনটা। কিন্তু লোকটা দাঁড়াইলে দেশের রাজনীতির কম্পাসের কাঁটা নড়ত। কেমন ছোট? এত ছোট যে জামানত বাজেয়াপ্ত হইত।
আর কেমন বড়?
নির্মল সেন 'অনিকেত' ছদ্মনামে দৈনিক বাংলায় উপসম্পাদকীয় লিখতেন। 'স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই' শিরোনামের একটা লেখার পর ১৯৭৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে তাঁর কলাম বন্ধ করা হয়। দৈনিক বাংলার সম্পাদক ডাইক্যা জানাইলেন, প্রধানমন্ত্রী আপনার লেখা বন্ধ করসেন।ভাইবা দেখেন। একটা রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী, যার পিছনে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র, তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ কইরা একটা লোকের কলাম বন্ধ করতে হইসিল।
ওইটাই ছিল ছোট দলের বড় নেতার মাপ। তার দলের সদস্য সংখ্যা যাই হোক, তার কলমের একটা খোঁচা গণভবনে গিয়া লাগত।
আবার ধরেন, কমরেড ফরহাদ। তিনি মারা গেলেন। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিরা কবিতা লিখলেন। শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক। একজন রাজনীতিকের মৃত্যুতে কবিতা লেখা হইত, বিবৃতি না।
কাজী জাফর আহমেদ। মাঠ কাঁপানো শ্রমিক নেতা, ভাসানীর সহচর। মাহমুদুর রহমান মান্না তুখোড় বক্তা, ভালো ছাত্র, ভাইগুলা সুপার ব্রিলিয়ান্ট। আ স ম আব্দুর রব, চার খলিফার একজন। হাসানুল হক ইনু, বুয়েটের ছাত্র। রাশেদ খান মেনন, বাবা বিচারপতি আব্দুল জব্বার খান, পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার। ভাই, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, কবি, পরে সচিব, রাষ্ট্রদূত ও মন্ত্রী। এনায়েতুল্লাহ খান, প্রখ্যাত সাংবাদিক ও পরে মন্ত্রী। মেননের ডাইনিং টেবিল দেশের রাজনীতি উল্টায়ে দিতে পারতো। এদের কেউ কেউ পরে বড় দলের কাঁধে চইড়া সংসদে গেছেন, মন্ত্রী হইসেন, শেষে বড় দলের ভিতরেই বিলীন হইয়া গেছেন। ওইটা আলাদা আলোচনা।
কিন্তু একটা জিনিস অস্বীকার করার উপায় নাই। এদের পাতে দেওয়া যাইত।
আপনি বসলে তাদের সাথে জীবনানন্দ নিয়া আলাপ করতে পারতেন। শেক্সপিয়ার নিয়া পারতেন। মার্ক্স লেনিন কপচাইলে উনি আপনার সাথে সমান লেন্থে ব্যাটিং কইরা যাইতেন। ত্যাগের একটা জীবন পিছনে ছিল, জেলখাটা ছিল, বইপড়া ছিল। মানে দলটা ছোট ছিল, লোকটা ছোট ছিল না।
এখন কী?
এখনও ছোট দল আছে। ছোট দলের বড় নেতাও আছে। শুধু বড় হওয়ার সংজ্ঞাটা বদলাইসে।
আগে ছোট দলের বড় নেতা মানে ছিল, যার লেখা বন্ধ করতে প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে হাত দিতে হইত। প্রধান কবিরা কবিতা লিখতো।
এখন ছোট দলের বড় নেতা মানে হইল, বাটপার বিকাশ নুরা, বাটপার আম তারেক, বাটপার রকেট রাশেদ। আপনি এদের পাশে বসে না আধা মিনিট কথা বলতে পারবেন, না এদের দেখে আপনার রাজনীতি করার ইচ্ছা হবে।
আগে দলটা ছোট ছিল, লোকটা বড় ছিল। এখন দলটা ছোট, লোকটা আরো ছোট।
কী অধঃপতন!