23/09/2026
SIR প্রক্রিয়াকে আমি সমর্থন করেছিলাম। এর মধ্যে ষড়যন্ত্র আছে, নিশ্চিত জেনেই সমর্থন করেছিলাম। আমার আশা ছিল, আমাদের রাজ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বুথস্তরে শক্ত সাংগঠনিক শক্তি আছে। তারা নিশ্চয়ই মাঠেই নির্বাচন কমিশনের ছকবাজি ফাঁস করে দেবেন। কিন্তু দেখলাম, তারা নিবিড় কাজের বদলে চমকের রাজনীতির রাস্তায় হাঁটল। ফলে চরম বিপদে পড়লেন কয়েক লক্ষ মানুষ। এখনও তাঁরা বিপদ থেকে মুক্তি পাননি। কোনও রাজনৈতিক দলকে নাম হারানো মানুষদের পাশে দাঁড়াতেও তেমন দেখা যাচ্ছে না।
নির্বাচন কমিশনের ষড়যন্ত্রের খানিকটা ফাঁস করল Indian Express এর একটি রিপোর্ট। আমাদের তৃণমূল সরাসরি দুর্নীতি, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট নিয়ে ব্যস্ত রাখা হচ্ছে। আর নির্বাচন কমিশন কীভাবে বিজেপির হয়ে ডাকাতি করে ফাঁক করে দিয়েছে সেটা স্পষ্ট হবে রীতিকা চোপড়ার রিপোর্টে। সেটা থেকে কিছু অংশ লিখছি।
***
রিপোর্টে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যের মধ্যে দুই কমিশনার—সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন।
কমিশনের তৃতীয় সদস্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। দুই কমিশনারের অভিযোগ, বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাঁদের না জানিয়েই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তাঁদের কোনও আপত্তি কানেও তোলা হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারকে তথ্যগত অসঙ্গতির জন্য চিহ্নিত করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেয়। সুপ্রিম কোর্ট পরে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনালে এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ দেয়। গত সপ্তাহে নির্বাচন কমিশন আদালতকে জানায়, ট্রাইব্যুনালগুলির সামনে মোট ৩৮ লক্ষ আপিল রয়েছে।
- ২২.২১ লক্ষ আপিল করেছেন বাদ পড়া ভোটাররা—নাম ফেরানোর জন্য।
- ১৬.১০ লক্ষ আপিল করা হয়েছে তালিকায় নাম থাকা ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য।
এই দ্বিতীয় ধরনের আপিল কারা করেছে, কমিশন তা জানায়নি।
এখানেই নির্বাচন কমিশনার সান্ধুর প্রশ্ন। তিনি কমিশনকে লিখে জানতে চান: এই আপিলগুলি নির্বাচন কমিশনের হয়ে করার অনুমতি কে দিয়েছে? আর আসলে এই আপিলগুলি কে করেছে? সান্ধুর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি নিজে, বিবেক যোশি এবং পশ্চিমবঙ্গের Chief Electoral Officer—কেউই এই আপিল করার সিদ্ধান্ত বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতেন না।
***
ভোটার হতে হলে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের Form-6 পূরণ করতে হয়। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ে এই ফর্মে একটি নতুন প্রশ্ন যোগ করা হয়। নতুন ভোটারকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তাঁর বাবা-মা বা দাদু দিদার নাম আগে ভোটার তালিকায় ছিল কি না।
মে মাসেই নির্বাচন কমিশনার বিবেক যোশি লিখিতভাবে বলেছিলেন, সরকারের নিয়ম না বদলে এভাবে Form-6 পরিবর্তন করা যায় না। সুখবীর সিং সান্ধুও এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত ছিলেন। তারপরও Form-6 পরিবর্তন করা হয়।
১৩ আগস্ট সান্ধু লিখিতভাবে বলেন, এই পরিবর্তন “অননুমোদিত এবং অবৈধ” এবং এটি দ্রুত সরিয়ে দেওয়া উচিত।
***
নির্বাচন কমিশনের দীর্ঘদিনের ব্যবস্থা হলো—ভোটার তালিকা মূলত স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।প্রতিটি এলাকার Electoral Registration Officer বা ERO ভোটার তালিকার দায়িত্বে থাকেন।
দুই নির্বাচন কমিশনার প্রশ্ন তুলেছেন, এখন কি ভোটার তালিকার তথ্য ধীরে ধীরে দিল্লি বা কেন্দ্রীয় স্তরে কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে?
বিবেক যোশি মে মাসে এই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ভোটার ডেটাবেসে পরিবর্তন করার ক্ষমতা যেন শুধু সংশ্লিষ্ট আইনগত কর্মকর্তাদের কাছেই থাকে।
সুখবীর সিং সান্ধুও পরে একই সমস্যা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু রাজ্য নির্বাচন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন যে ERONet নামে ভোটার তালিকার যে অনলাইন ব্যবস্থাটি রয়েছে, তাতে তাঁদের সম্পূর্ণ প্রবেশাধিকার নেই। সান্ধু প্রশ্ন তোলেন, আইন অনুযায়ী যাঁদের ভোটার তালিকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাঁদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার ক্ষমতা IT বিভাগের কর্মকর্তাদের আছে কি না।
***
ভারতের সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনে রয়েছেন:
- একজন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বা CEC
- দুজন নির্বাচন কমিশনার বা EC
তিনজনের পদমর্যাদা সমান।
CEC হলেন “first among equals”—অর্থাৎ তিনজনের মধ্যে প্রথম, কিন্তু একা সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই।
আইনে বলা হয়েছে, কমিশনের কাজ যতটা সম্ভব সর্বসম্মতভাবে হওয়া উচিত। মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে।
বাস্তবে দুই নির্বাচন কমিশনার বলছেন, কমিশনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই বেশ কিছু কথা কমিশনের বক্তব্য বলে বাইরে বলা হচ্ছে।
দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৪টি আনুষ্ঠানিক লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, তাঁদের জ্ঞান বা অনুমোদন ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁরা ক্যাবিনেট সচিবকেও সব জানিয়েছেন।
***
কী ভাবে জ্ঞানেশ কুমারের একচেটিয়া রাজত্ব কায়েম হয়েছে, সেটা স্পষ্ট। আর সংঘী জ্ঞানেশের হাত ধরে যে ভোটের নামে ডাকাতি হয়েছে, সেটাও স্পষ্ট। নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন নিয়েও স্পট প্রভু সেবায় জ্ঞানেশের তুঘলকি রাজ চলছেই।
নিন্দা চেঁচামেচি কান্নাকাটি করে কিছু হবে না। খেলাটা টেনে আনতে হবে অন্য মাঠে। বদলের কিছু ইঙ্গিত ফুটে উঠতে শুরু করেছে।
জাতীয় কংগ্রেস জিন্দাবাদ