29/11/2025
সময়টায় হয়তো হারিয়ে যাওয়ার, সময় বলতে এই শতাব্দী বলা যেতেই পারে, বা আরও উচ্চাকাঙ্খী হলে এই সহস্রাব্দ, তবে হারিয়ে যাওয়ার বিরাম নেই কিছুতেই।
জল, জমি, জঙ্গল, নয়ানজুলি হারিয়ে গেছে বলে এক বন্ধু ক্ষুব্ধ এবং ক্রুদ্ধ, "শিশু সুলভ" বলে মুখে বললেও জানি বিষয়টা গুরুতর। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সকলের স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকার অধিকার, দেশের সাংবিধানিক অধিকার, বহুত্ববাদের প্রকাশের অধিকার, ভিন্নমত পোষণ করেও বন্ধু থাকার অধিকার হারিয়ে যাচ্ছে বলে উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক গবেষক বন্ধু। মাটির সাথে যোগ নেই বলে খিল্লি করে দিয়েছি নিশ্চিন্তে। মন খারাপ মানুষের মনের খেয়াল রাখার খেয়াল রাখে নি কেউ, তাঁদের অধিকার রাখার কথা সোচ্চার কন্ঠে বলে যাচ্ছেন এক অনুজা, বুর্জোয়া বিলাসিতা বলে ইগনোর করে গেছি, হয়তো (?) অন্যায়ই হয়েছে।
কাজেই এই অবস্থায় হঠাৎ করে ছয় ঋতুর মধ্যে এক ঋতু খুঁজে পাই নি বহুদিন বলে দুঃখ করলে ফেসবুক সমাজ ভালো চোখে নেবেন না। দুঃখ করার নিতান্তই কিছু একটা চাই বলে এই সব ঢং, এমন বললেও তর্কে যাব না।
তবে আমার দেওয়ালে আমার বার্তা, এই ভাবনা থেকেই এক মন কেমন করার কথা, হেমন্ত হারিয়ে যাচ্ছে। সামান্য হেমন্ত হারিয়ে গেলে কি বা যায় আসে কেউ বলতেই পারেন, তবে অভিমান না করলেও, হেমন্তের ইতিহাস ভোলার নয়। ছোটবেলার কথা মনে ভিড় করে আসে, হেমন্ত এতটা দুর্লভ এবং অদেখা ছিল না ছোট বেলায়। স্পষ্ট বুঝতে পারতাম শরতের চলে যাওয়া, শীতের পদধ্বনি আসত জানান দিয়েই, মাঝের সময় টুকু নিরবিচ্ছিন্ন হেমন্তের হাতে। দুর্গাপূজার সাথে হিসেব মিলিয়েই হয়তো শরৎ আর হেমন্তের ফারাকটা আরও বেশী করে চোখে পড়ত। শরৎ মানেই মাঠ জুড়ে প্যান্ডেল আর আলোর ঝলকানি, আর সেই মাঠেই বিসর্জনের পর বাঁশ, দড়ি আর অগণিত উপেক্ষিত পেরেকের সাথে এক অসামান্য অবুঝ নীরবতা, খবর দিত হেমন্ত আসছে।
দূরকমের হেমন্ত দেখার কথা মনে আছে, সম্পূর্ণ আলাদা রকম সময়কালে স্থান, কাল, পাত্র সব পাল্টালেও এক এবং একমাত্র যোগসূত্র ছিল হয়তো এই হেমন্ত, তাই আরও বেশী করেই মনে আছে।
হেমন্তের সাথে প্রথম আলাপ রাঢ় বাংলায় এক লাল মাটির শহরে, হেমন্ত তখন ঠিক সেই সময়টা যখন বিকেলে খেলতে গেলেই হঠাৎ করে সন্ধ্যে এসে যেত আর খেলা বাকী রেখেই বাড়ি ফিরতে হত। সেই সময়ে এজন্য মন খারাপ হত না বললে মিথ্যা কথাই বলা হবে, তবুও কেন জানি না সেই এগিয়ে আসা সন্ধ্যগুলো বড় কাছের ছিল। বাড়ি ফিরতে ফিরতে দেখতাম ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলে উঠছে, আশেপাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসছে ধূপের গন্ধ আর শঙ্খের ধ্বনি, আমি আনন্দে এটুকু ভেবেই যে বাবার সাদা এম্বাসেডর বাড়ির সামনে আসার সময় হয়ে এল।
আগের মিলেনিয়ামের শেষ দশকে আমাদের সেই মফস্বল শহরে ঠান্ডা পড়ত একটু বেশী, তবে গরমকালের লোডশেডিং এর উৎপাত খানিক কমে যেত শরৎ পেরোলেই আর আমাদের সেই পাড়ায় সন্ধ্যা হলে সব বাড়ির ছেলে মেয়েদের পড়তে বসার এক আশ্চর্য প্রথা ছিল। তাই বাড়ি ফিরেই পড়তে বসার এক তাড়া ছিল ঠিকই তবে সকালে স্কুল যাওয়ার কারণে দুপুরেই বাড়ির কাজ প্রায় শেষ হয়ে থাকত বলে তেমন দীর্ঘায়িত হত না সন্ধ্যাবেলার পড়াশুনার পর্ব। সন্ধ্যায় বৈঠকখানায় তখন আড্ডা জমে উঠেছে বাবা আর প্রতিবেশী বাবার সহকর্মীদের। এনাদের আসলেই অনেক গুলো ক্যাটাগরিতে একসাথে ফেলা যেত, সরকারি আবাসনে থাকতাম বলে বাবার সহকর্মী আর প্রতিবেশী সেটটা কমন যেত, আর সেই বাম আমলে সরকারি আমলাদের ছেলেরা সকলেই জেলা স্কুলে পড়ত বলে এনাদের অনেকেই আমার সহপাঠী বা সিনিয়র জুনিয়রদের বাবা, তাই এনাদের স্ট্যাটাস অনেক ক্ষেত্রেই নিতান্ত "বাবার কলিগ" এর চাইতে অনেকটা কাছের। ওনাদের গল্প আড্ডা শুনতাম মাঝে মাঝে পর্দার আড়াল থেকেই, আর তখনই গুটি কতক মানুষের নিন্দা মন্দ শুনেছিলাম বেশ বেশী রকম। নাম গুলো ঝাপসা হলেও লোকগুলোর দোষ না কি একটাই, "তেল দেওয়া"। ব্যাপারটা স্পষ্ট না বুঝে অবাক হতাম, কারণ তখন তেল মেখে চান করা নিত্য দিনের অভ্যাস ছিল আমাদের। গিজার লাগত না, হেমন্ত বা শীত যাই হোক এক বালতি জল নিয়ে বারান্দায় এক ঘণ্টা রাখলেই কাজ হত।
যা হোক বাবার সেই সান্ধ্য আড্ডার পর আমার আর ভাইয়ের বাবার কাছে গল্প শোনার একটা অবকাশ বেরিয়েই আসত, আর সেই গল্পগুলোর মজা তখন না বুঝলেও পরে এসে বুঝেছি। কি আশ্চর্য, ঐ গল্প গুলো কোনোদিন কোনও বই, পত্রিকা এমনকি ২০ বছর পর ইন্টারনেটেও পাই নি। এখন বুঝি গল্প গুলো সব কটাই বাবার নিজের বানানো, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়তো তাৎক্ষণিক। তবে অবাক কান্ড সব গুলো গল্প শেষ হত এক রকম ভাবে, যেখানে অনেক গুলো হাবিজাবি লোক একটা রাজা বা জমিদার বা দৈত্যকে হারিয়ে দেয়। আমার বেশ লাগত, মনে মনে ভাবতাম আমরা স্কুলের সব বন্ধু মিলে সেই মাস্টারটাকে, যে একটু দুষ্টুমি করলেই দুমাদ্দুম চড় চাপাটি লাগায়, একদিন ঠিক হারিয়ে দেব।
------- (ক্রমশ)