12/05/2026
" প্রগতিশীল এবং সর্বহারা সংস্কৃতি চর্চার নামে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের যে চেহারা দেখছি, তাতে আর একটি কথাও না বলে পারছি না। তা হচ্ছে, শ্রমিক, চাষী ও নিম্নমধ্যবিত্তদের উপর মালিকগোষ্ঠী ও জোতদারদের ভয়াবহ অত্যাচারের ঘটনাগুলিকে করুণ কাহিনী হিসাবে ইনিয়ে-বিনিয়ে বলতে পারলেই যে সর্বহারা বিপ্লবী সংস্কৃতির জন্ম দেওয়া যায় না, আজ একথা ভালোভাবে বোঝার সময় এসেছে। পুঁজিবাদী শোষনের যাঁতাকলে পিষ্ট এবং সবদিক দিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিক, চাষী ও নিম্নমধ্যবিত্ত বস্তিবাসীদের দৈনন্দিন ক্লেদাক্ত জীবনযাত্রা হুবহু ফুটিয়ে তোলা, অর্থাৎ তার হুবহু প্রতিচ্ছবিও সর্বহারা সংস্কৃতি নয়। বিপ্লবী সর্বহারা সংস্কৃতির কথা যাঁরা বলছেন, তাঁদের প্রথমেই বোঝা দরকার, আমাদের দেশের সর্বহারাশ্রেণীর বিন্যাস কি? দুনিয়ার সমস্ত পিছিয়ে-পড়া দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও শ্রমীকশ্রেণীর মধ্যে তিনটে ভাগ রয়েছে। একদল যাদের সঙ্গে গ্রামীন চাষীজীবনের আজও পূর্ণচ্ছেদ ঘটেনি। মজুরের এই অংশ চাষীজীবনের নানা কুসংস্কার, কুঅভ্যাস, ধর্মীয় অন্ধতা ও গোঁড়ামি প্রভৃতি গ্রাম্য অভ্যাসগুলো শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে আমদানি করছে। মজুরশ্রেণীর দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে, যারা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলি থেকে অর্থনৈতিক শোষনের চাপে ধীরে ধীরে বস্তিবাসী ও মজুরে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতির দিক থেকে মজুরশ্রেণীতে পরিণত হলেও ভাবগত ও রুচিগত দিক থেকে মধ্যবিত্ত বাবু সমাজের সঙ্গে এদের সম্পর্ক আজও একেবারে চুকে যায়নি। মজুরশ্রেণীর এই অংশই শ্রমিক আন্দোলনে পেটিবুর্জোয়া ভাববিলাসীতা ও দোদুল্যমানতা, ব্যক্তিগত সুবিধাবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা, ব্যক্তিবাদ, উদারনীতিবাদ, অর্থনীতিবাদ ও সমস্ত রকমের সুবিধাবাদী মানসিকতা আমদানি করে থাকে। সর্বশেষ যে অংশ, এদের শহরের মধ্যবিত্ত বাবু সমাজ ও গ্রামীন চাষী সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক একেবারে চুকে গিয়েছে। আমাদের দেশে এরা সংখ্যায় অল্প হলেও সর্বহারাশ্রেণীর মধ্যে এরাই সবচেয়ে বিপ্লবী অংশ-কাজে কাজেই সবচেয়ে বেপরোয়া (desparate)। কিন্তু, যতদিন পর্য্যন্ত না এরা যথার্থ শ্রেণীসচেতন হয়, অর্থাৎ বিপ্লবী চেতনা এদের মধ্যে গড়ে ওঠে, মনে রাখতে হবে ততদিন এই বেপরোয়াভাব (desperateness) কিন্তু উদ্দেশ্যহীন, এবং আজ সমাজে বুর্জোয়া ব্যক্তিবাদের যে নোংরা পরিণতি ঘটেছে, তার প্রভাবও এদের মধ্যে পুরোমাত্রায় বর্তমান। এই তিনটি অংশের ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতার পারস্পরিক দ্বন্দ্বই হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণীর আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। কিন্তু গোটা শ্রমিকশ্রেণীর সাথে পুঁজিপতিশ্রেণীর প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতিগত ক্ষেত্রে যে মরণপণ সংগ্রাম চলছে, তাই হচ্ছে আজকের সমাজের মূল দ্বন্দ্ব। এই মূল দ্বন্দ্বই ক্রমাগত শ্রমিকশ্রেণীর আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে প্রভাবিত করে চলেছে। এখানে সর্বদা মনে রাখতে হবে, প্রতিদিনকার শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য থেকে শ্রমিকদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক চেতনা, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ভাবাদর্শ, সর্বহারাশ্রেণীর রাজনীতিটা আপনাআপনি জন্ম নেয় না। এই চেতনা বাইরে থেকে নিয়ে যেতে হয় (comes from without), অর্থাৎ এই চেতনা আয়ত্ব করার সংগ্রাম একটা আলাদা সংগ্রাম। আর, এই কারনেই একমাত্র সর্বহারা বিপ্লবী রাজনীতির প্রভাব বাড়িয়েই শ্রমিকশ্রেনীর মধ্যে বুর্জোয়া, পেটিবুর্জোয়া ও সামন্ততান্ত্রিক ভাবধারার যে প্রভাব আজও বর্তমান রয়েছে, তা ভাঙতে হবে এবং ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে নতুন বিপ্লবী চেতনা, মূল্যবোধ, ন্যায়নীতি ও নৈতিকতার ধারণা গড়ে তুলতে হবে।"
শিবদাস ঘোষ।।
(ক্রমশঃ)।।
(সুত্র-' ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও আমাদের কর্তব্য'-শিবদাস ঘোষ, এই পুস্তক থেকে উদ্ধৃত।)।
(মৃত্যুঞ্জয় চক্রবর্তী, আনারা, জেলা-পুরুলিয়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ কর্তৃক ফেসবুকে প্রচারিত।)