24/09/2026
আজ ২৪ সেপ্টেম্বর। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার তেইশ বছর বয়সে পটাশিয়াম সায়ানাইড মুখে তুলে নিয়েছিলেন পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনে, শুধু এই কারণে যে জীবিত অবস্থায় ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়লে অত্যাচার আর অপমানের যে পথ তাঁর সামনে খুলে যেত, সেই অপমান তিনি নিজের শরীরে নিতে রাজি ছিলেন না। যে ক্লাবের গেটে লেখা ছিল "কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ", সেই ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এক বাঙালি মেয়ে, মাস্টারদা সূর্য সেনের নির্দেশে, এমন একটা সময়ে যখন মেয়েদের অস্ত্র ছোঁয়ার কথাই ভাবা যেত না। ইতিহাসের পাতায় এটুকুই লেখা থাকে সাধারণত—তারিখ, ঘটনা, আত্মাহুতি। কিন্তু যেটা প্রায়ই বাদ পড়ে যায়, সেটা হল প্রীতিলতা কোনো বিচ্ছিন্ন বীরত্বের গল্প নন। তিনি ছিলেন একটা সংগঠিত রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ, যে লড়াই রাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠিন দমনপীড়নের মুখেও সংগঠিত থাকতে শিখেছিল।
আজকের বাংলায়, আজকের ভারতে, যখন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গলা তোলা মানুষদের ইউএপিএ দিয়ে জেলে ভরা হয়, যখন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে "রাষ্ট্রদ্রোহী" তকমা দেওয়া হয় অক্লেশে, তখন প্রীতিলতার লড়াইকে শুধু ফুল দিয়ে স্মরণ করাটা একরকম প্রতারণা। প্রীতিলতা যে ব্রিটিশ রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের যন্ত্রপাতি আজও অক্ষত—শুধু মালিক বদলেছে, রং বদলেছে, আর দমনের ভাষাটা আরও মসৃণ হয়েছে। তখন ছিল ঔপনিবেশিক আইন, আজ আছে ইউএপিএ, দেশদ্রোহ, এনএসএ। তখন ছিল কালাপানি, আজ আছে বছরের পর বছর বিনাবিচারে জেল।
আর একটা কথা প্রায় বলা হয় না—প্রীতিলতা একজন মেয়ে ছিলেন বলেই তাঁর লড়াইটা দ্বিগুণ কঠিন ছিল। শুধু ব্রিটিশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, নিজের সমাজের পিতৃতান্ত্রিক ধারণার বিরুদ্ধেও তাঁকে লড়তে হয়েছিল, যে ধারণা বলত মেয়েদের জায়গা রান্নাঘরে, বিপ্লবে নয়। আর প্রীতিলতার সেই লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা আজও দেখা যায় সাফুরা জারগারের মতো মানুষদের মধ্যে—জামিয়া মিলিয়ার এক গবেষক ছাত্রী, যাঁকে সিএএ-বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার "অপরাধে" ইউএপিএ দিয়ে জেলবন্দি করা হয়েছিল, সেই অবস্থাতেও যখন তিনি গর্ভবতী। রাষ্ট্র তখনও সেই একই ভয় দেখায়, যে ভয় দিয়ে ব্রিটিশরা প্রীতিলতাদের দমাতে চেয়েছিল—একজন মেয়ে যখন প্রশ্ন তোলে, তাকে শুধু আটকানো নয়, তাকে শিক্ষা দিয়ে দেওয়া দরকার, যাতে আর কোনো মেয়ে সাহস না পায়।
আজ যখন দেখি প্রতিবাদের ময়দানে মেয়েরা এগিয়ে আসছেন—NEET দুর্নীতির বিরুদ্ধে, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে, কারখানার নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে—তখন প্রীতিলতার ছায়া সেখানেও দেখা যায়। কিন্তু ছায়া দেখাটাই যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্র আজও সেই নারীদের গলা টিপে ধরার চেষ্টা করে, শুধু অস্ত্র বদলেছে—গুলির বদলে এখন হেনস্থা মামলা, মিথ্যা এফআইআর, চরিত্রহনন।
প্রীতিলতা জানতেন, তাঁর একার আত্মত্যাগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভেঙে পড়বে না। তবু তিনি এগিয়েছিলেন, কারণ কোনো লড়াই শুরু হওয়ার আগে সবাই জানে না সেটা জিতবে কিনা—তবু লড়াইটা লড়তে হয়, নইলে পরের প্রজন্মের হাতে কিছুই থাকে না দাঁড়ানোর জন্য। আজ যাঁরা রাস্তায় নামছেন, প্রশ্ন তুলছেন, জেল-জুলুমের ভয়কে উপেক্ষা করে সোচ্চার হচ্ছেন, তাঁরা আসলে প্রীতিলতার সেই অসমাপ্ত লড়াইটাই চালিয়ে যাচ্ছেন। ফারাক শুধু এটুকু—তখন শত্রুর চেহারাটা স্পষ্ট ছিল, সাদা চামড়া আর ইউনিয়ন জ্যাক। আজ শত্রু নিজের রংয়ে সেজে আসে, নিজের ভাষায় কথা বলে, নিজের পতাকা ওড়ায়—আর ঠিক সেই কারণেই তাকে চেনা, আর তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, আরও কঠিন কাজ।