12/08/2026
কমরেড শম্ভু মাহাতোকে শেষ লাল সালাম — হুল জোহার
ঝাড়গ্রাম, ১২ আগস্ট ২০২৬
অত্যন্ত দুঃখ ও গভীর বেদনার সঙ্গে জানানো যাচ্ছে যে, CPI(ML)/ক্লাস স্ট্রাগলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং আমাদের সকলের প্রিয় কমরেড শম্ভু মাহাতো গতকাল ঝাড়গ্রাম হাসপাতালে সন্ধ্যা প্রায় ৬টার সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে ঝাড়খণ্ডের গণআন্দোলন, শ্রেণিসংগ্রাম এবং বামপন্থী আন্দোলনের পরিসরে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি হলো।
CISF আন্দোলন থেকে বিপ্লবী জীবনে
কমরেড শম্ভু মাহাতোর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে পূর্ব ভারতে CISF জওয়ানদের মধ্যে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। মর্যাদা, বেতন, কর্মসময় ও কাজের পরিবেশসহ বিভিন্ন দাবিতে জওয়ানদের আন্দোলন পরবর্তীতে তীব্র সংঘর্ষ ও বিদ্রোহের রূপ নেয়। এই আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল বোকরো স্টিল প্ল্যান্ট।
সেই সময় তাঁর নাম ছিল প্রফুল্ল কুমার। তিনি ছিলেন বিহারের সন্তান এবং CISF-এর একজন কমান্ডার। আন্দোলনের কঠিন পরিণতিতে কয়েকজনের মৃত্যু হয়, বহু জওয়ান গ্রেফতার হন এবং অনেকে আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন।
আত্মগোপন অবস্থায় প্রফুল্ল কুমার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সেই সংকটের সময় তাঁর পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। শেষ পর্যন্ত কমরেড সত্যনারায়ণ সিং তাঁকে আগ্রহের সঙ্গে আশ্রয় ও রাজনৈতিক সহায়তা দেন। সেই সূত্রে একঝাঁক CISF জওয়ান CPI(ML)-এর বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁদের অন্যতম ছিলেন প্রফুল্ল কুমার।
পরবর্তীতে তিনি সর্বক্ষণের বিপ্লবী কর্মী হিসেবে নিজেকে জনগণের সংগ্রামে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন। তাঁর নতুন রাজনৈতিক পরিচয় হয় কমরেড শম্ভু মাহাতো। এরপর তাঁর সমগ্র জীবন ঝাড়খণ্ডের মাটি ও মানুষের অধিকার, গণআন্দোলন, শ্রমিক-কৃষকের সংগ্রাম এবং শ্রেণিসংগ্রামের কাজে উৎসর্গিত হয়।
ঝাড়খণ্ডের পরিচিতি ও পৃথক রাজ্য আন্দোলনে অনবদ্য ভূমিকা
কমরেড শম্ভু মাহাতোর রাজনৈতিক জীবনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল ঝাড়খণ্ডের স্বতন্ত্র পরিচয়, অধিকার ও পৃথক ঝাড়খণ্ড রাজ্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ও অনবদ্য ভূমিকা। ঝাড়খণ্ডের মাটি, মানুষ, জল-জঙ্গল-জমি এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার প্রশ্নে তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগ্রামী।
তিনি ডাক্তার রামদয়াল মুন্ডা, ডাক্তার বি.পি. কেশরী, ডাক্তার রোজ কেরকেট্টা, সন্তোষ রানা, লেবা চাঁদ টুডু, টি.কে. রাপাজ প্রমুখ নেতাদের সঙ্গে ঝাড়খণ্ড সমন্বয় সমিতি এবং হুল ঝাড়খণ্ড ক্রান্তি দল-এর যৌথ উদ্যোগে তৎকালীন গুমলা জেলার সিমডেগা বিধানসভা এলাকার বিস্তীর্ণ গ্রামীণ অঞ্চলে দীর্ঘদিন কাজ করেন।
সেই সময় সুপরিচিত আদিবাসী নেতা উইলিয়াম লুগুন ও জোসেফ লুগুনের নেতৃত্বে পরিচালিত জঙ্গল বাঁচাও আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। গ্রামীণ ও আদিবাসী জনগণকে সংগঠিত করা, জঙ্গল রক্ষা এবং জল-জঙ্গল-জমির ওপর স্থানীয় মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
জঙ্গল ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার প্রশ্নে তাঁর সক্রিয় অবস্থান এবং কাঠ পাচার ও অবৈধভাবে জঙ্গল ধ্বংসের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করার কারণে তিনি কাঠ ব্যবসায়ী ও তথাকথিত জঙ্গল মাফিয়াদের রোষের মুখে পড়েন। তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার উদ্দেশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যার চেষ্টাও করা হয়। কিন্তু গুরুতর বিপদের মুখেও তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসেননি। জল, জঙ্গল, জমি ও মানুষের অধিকারের পক্ষে তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত ছিল।
পরবর্তী সময়ে ওই অঞ্চলে সক্রিয় কাঠ ব্যবসায়ী ও জঙ্গল মাফিয়াদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত জোসেফ লুগুন হত্যাকাণ্ড ঝাড়খণ্ডের জঙ্গল ও আদিবাসী অধিকার রক্ষার আন্দোলনের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। সেই কঠিন সময়ে কমরেড শম্ভু মাহাতোর ভূমিকা ও সাহসিকতা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার মতো।
শুধু গুমলা ও সিমডেগা নয়, ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলের গণআন্দোলনের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। রাঁচি, সিংভূম, ধানবাদ, পালামু, পাকুড়, দুমকা সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের গণআন্দোলন, আদিবাসী অধিকার এবং পৃথক ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দাবির আন্দোলনের পরিসরে তিনি পরিচিত ও সক্রিয় কর্মী হিসেবে মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।
ঝাড়খণ্ডের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক-সামাজিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং জল, জঙ্গল, জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর আদিবাসী ও স্থানীয় জনগণের অধিকার রক্ষার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল আপসহীন।
তাই কমরেড শম্ভু মাহাতোর প্রয়াণ কেবল একটি রাজনৈতিক দলের একজন নেতার মৃত্যু নয়—এটি ঝাড়খণ্ডের দীর্ঘ গণআন্দোলনের এক নিবেদিতপ্রাণ সৈনিকের বিদায়। তাঁর অবদান পৃথক ঝাড়খণ্ড রাজ্য আন্দোলন, আদিবাসী অধিকার এবং গণসংগ্রামের ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
অন্তিম যাত্রায় সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ
আজ ১২ আগস্ট সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে, তাঁর জীবনসঙ্গিনী কমরেড রীনা রানার ঘোড়াধরা, ঝাড়গ্রামস্থিত বাসভবন থেকে কমরেড শম্ভু মাহাতোর মরদেহের অন্তিম যাত্রা শুরু হয়। পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশী এবং বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠনের নেতা-কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা এই অন্তিম যাত্রায় শামিল হন।
অন্তিম যাত্রা ডালতলা কালীমন্দির, পুরাতন ঝাড়গ্রাম পর্যন্ত যায়। সেখানে বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।
CPI(ML) Mass Line, লোধাশুলি, মেদিনীপুরের পক্ষ থেকে কমরেড নিরঞ্জন বেরা এবং CPI(ML) New Democracy-এর কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে কমরেড মানস সরকার পার্টির লাল পতাকা কমরেড শম্ভু মাহাতোর মরদেহে অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ঝাড়খণ্ড থেকে উপস্থিত ছিলেন ঝাড়খণ্ড আন্দোলনের সেনানী ও ঝাড়খণ্ড কওমি একতা মঞ্চের গৌতম বোস। এছাড়াও স্থানীয় সমাজকর্মী রাজেন হাঁসদা সহ বহু মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
কমরেড শম্ভু মাহাতোর জীবনসঙ্গিনী কমরেড রীনা রানা মরদেহে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তাঁর প্রিয় সহযোদ্ধাকে শেষ বিদায় জানান।
কমরেড শম্ভু মাহাতো রেখে গেলেন তাঁর জীবনসঙ্গিনী কমরেড রীনা রানা এবং এক পুত্রকে। তাঁর পরিবারের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা ও সংহতি জানাই।
একজন বিপ্লবী কর্মীর জীবনের প্রকৃত মূল্য তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ে নয়, বরং জনগণের মুক্তির সংগ্রামে তাঁর অবদান, ত্যাগ ও অঙ্গীকারে। কমরেড শম্ভু মাহাতোর জীবন সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
তাঁর সংগ্রাম, তাঁর অঙ্গীকার এবং শোষিত-বঞ্চিত মানুষের প্রতি তাঁর অবিচল পক্ষপাত আগামী দিনের সংগ্রামী প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
প্রিয় কমরেড শম্ভু দা,
তোমাকে জানাই শেষ লাল সালাম!
হুল জোহার!
কমরেড শম্ভু মাহাতো অমর থাকুন।
কমরেড শম্ভু মাহাতোকে লাল সালাম।
লাল জোহার! হুল জোহার! ✊🏾
------
গৌতম কুমার বোস,
ঝাড়খণ্ড আন্দোলনকারী সহ সামাজিক ন্যায়, শ্রম ও মানবাধিকার কর্মী।
যোগাযোগ: 9431381513