09/05/2026
///সংঘম্ শরণম্?///
২০২৬ বিধান সভা নির্বাচন সমাপ্ত। আজ পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠের অতি দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক ঘরানা প্রথমবার সরকার গঠন করল। এমতাবস্থায় বাংলার অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, সরকারী ক্ষেত্র, ধর্ম সংস্কার, সহিষ্ণুতা, নারী ও ক্যুয়ার নিরাপত্তা প্রভৃতির প্রতি আসন্ন বিপদ এবং ঘুষপেটিয়া-রোহিঙ্গা তত্ত্বের প্রতি হিন্দু বাঙালীর সমর্থনের নিরিখে ফ্যাসীবাদী গণমনস্তত্ত্বের উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে খেটে খাওয়ার আদর্শকে বাংলার মাটিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার কাজ শুরু করতে হবে। এবারের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও গণনার দিনের বিভিন্ন প্রবণতা সমগ্র প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, এই প্রশ্নের মূল উৎস হল ভোটার বিন্যাস পরিবর্তনকারী এবং ভবিষ্যতের নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পথ প্রশস্তকারী এসআইআর প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার প্রকৃত বিরোধিতা তৃণমূল সরকার করেনি। বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠন (সিএসএ-ও এই প্রক্রিয়ায় ছিল) ও ব্যক্তি কেরলম সরকারের ন্যায় এসআইআর-এর বিরোধিতায় বিধান সভায় রেজোলিউশান পাশ করানোর দাবীপত্র জমা দেওয়ার কর্মসূচী নিলেও তা তৃণমূল সরকারের পক্ষে অফিশিয়ালি গ্রহণ করা হয়নি। ফলে এখন নির্বাচন প্রক্রিয়ার গলদ নিয়ে তৃণমূল কুম্ভীরাশ্রু ফেললেও আদতে তার কোনও মানে নেই। এটা অস্বীকার করার জায়গা নেই যে চরম দুর্নীতি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মসংস্থানের পরিকল্পনাহীনতা এবং অভয়ার মর্মান্তিক ঘটনাই তৃণমূল সরকারের পতনের জন্য দায়ী। এখন অবস্থা ভালো নয় বুঝে মমতা বামপন্থীদের সাহায্য চাইছে। হকার আন্দোলনকে সাবোটাজ এবং বাম জপের মালা হাতে তৃণমূলের হকার উচ্ছেদ প্রকল্প চলাকালীন খেটে খাওয়া মানুষের সাথে তৃণমূলপন্থী বামেদের গদ্দারীর ঘটনা আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি। ফ্যাসিস্টদের রোখার নামে তৃণমূলের পদলেহন এবার ধোপে না টিকলেও বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তৃণমূলের আঁচলে তাদের শরণ নেওয়া বা খেটে খাওয়ার আন্দোলনে তৃণমূলকে জায়গা করে দেওয়ার রাজনীতির উদয়ের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই সমস্ত প্রবণতার চরম বিরোধিতা করব আমরা। ফ্যাসিস্টদের আক্রমণকে প্রতিহত করতে বাস্তব পরিস্থিতির নিরিখে ডান-বাম স্পেকট্রাম নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করতে হতে পারে ঠিকই, কিন্তু সেই ঐক্য কখনই খেটে খাওয়া জনগণের অভিব্যক্তিকে তোয়াক্কা না করে স্রেফ নিজ সংগঠনের স্বার্থের ভিত্তিতে করলে চলবে না। সব লড়াইয়েরই অভিমুখ হতে হবে খেটে খাওয়া জনতার স্বার্থ রক্ষা। বিজেপি-আরএসএস-এর রাজনীতির আদর্শগত বিরোধিতার জন্য প্রয়োজন একটা বামপন্থী পরিসর। এবারের নির্বাচনে কিছু বিজনেস হাউসের স্বার্থ রক্ষার্থে জাতীয় কংগ্রেস বাম জোট ত্যাগ করায়, আমরা যে বাম ঐক্যের কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, তার আংশিক বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনুধাবন করে এই প্রক্রিয়ার উৎসেচকের ভূমিকা পালন করতে আমরা সমস্ত সমালোচনা বজায় রেখেই একক এবং মঞ্চগতভাবে সরাসরি বাম দল নির্বিশেষে বাম প্রার্থীদের প্রচারে অংশগ্রহণ করেছিলাম। বামেদের একাংশের সাথে আমাদের বোঝাপড়া এটাই ছিল যে তৃণমূল থেকে আগত দুর্বৃত্তদের যেখানে যেখানে আইএসএফ টিকিট দেবে, সেখানে সেখানে বাম প্রার্থী দেওয়া হবে। কিন্তু আদতে তার কোনোকিছুই না করে আরাবুল স্তুতি করা হল। বাম আন্দোলনের প্রতি মুসলমানদের একাংশের সমর্থন ফিরিয়ে আনার বদলে আইএসএফ-কে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর সুবিধাবাদে যাওয়া হল। এতে কিন্তু তৃণমূল স্তরে বামপন্থীদের সাংগঠনিক ক্ষতিই হয়ে চলেছে। আর বাঘ থেকে বেড়াল হয়ে যাওয়া আরাবুল এখন আইএসএফ-এর পতাকা তলে নেকড়েতে পরিণত হয়ে নতুন সন্ত্রাসের অধ্যায়ের সূচনা করছে। আমরা এই পলিটিক্যাল কলিউশানের তীব্র বিরোধিতা করছি। প্রার্থীদের জয়ী হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে আমরা প্রচার করিনি। তবে এই কঠিন পরিস্থিতিতে ডোমকলে সাথী মোস্তাফিজুর রহমানের জয় নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। আমরা তাঁকে রক্তিম অভিনন্দন জানাচ্ছি। একমাত্র বামপন্থী বিধায়ক হিসেবে তিনি বিধান সভায় কর্মসংস্থানের দাবী উত্থাপন করবেন এবং সকল প্রকার বেসরকারিকরণের তীব্র বিরোধিতা করবেন, এই প্রত্যাশা রাখি আমরা। প্রতীকী আন্দোলন সুদীপ্ত গুপ্ত থেকে আনিস খান এবং পতাকাবিহীন, নির্দিষ্ট দাবীবিহীন, পেশাভিত্তিক আন্দোলন কামদুনি থেকে অভয়া, সর্বক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার দিতে অপারগ থেকেছে এবং আরএসএস বা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ এই অরাজনৈতিক ধাঁচ বজায় রেখে ডানপন্থীদের সুবিধা করে দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের পটুতা প্রমাণ করেছে। তাই আন্দোলন করে হারতে হারতে গা সওয়া হয়ে গেলে চলবে না। আন্দোলনে রাজনৈতিক ব্যানার এবং বাম পার্টিদের প্রত্যক্ষ উপস্থিতিও মঞ্জুর করতে হবে। সারা দেশে এই মুহূর্তে ফ্যাসিস্টদের বিজয় রথকে রুখতে হলে প্রয়োজন সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সমাজে বামপন্থীদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং দেশব্যাপী খেটে খাওয়ার লড়াই ধারণ করতে পারবে এমন একটি নতুন পার্টি গঠন। তা যতক্ষণ না সম্ভব হচ্ছে, যা কিছু ঐতিহাসিকভাবে রয়ে গেছে, সমস্ত সমালোচনা বজায় রেখে তার সাথে ঐক্যবদ্ধ লড়াই চালাতে হবে। এবারের নির্বাচনী প্রচার বিভিন্ন বামপন্থী পার্টিদের সাথে আমাদের সংহতি বাড়ানোর একটা বৃহত্তর পরিসর তৈরি করেছে। জিয়াগঞ্জের লেনিন মূর্তি ডাক দিচ্ছে, নিজেদের সংগঠনকে চাঙ্গা রাখো, মতাদর্শগত কর্ষণ চালাও, ঐক্যবদ্ধ লড়াই করো আর দেশব্যাপী নতুন খেটে খাওয়ার পার্টি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করো।
সংঘম্ শরণম্ গচ্ছামি
~সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যাক্টিভিজম
০৯/০৫/২০২৬