28/07/2026
বাংলার অত্যন্ত প্রিয় উৎসব রথযাত্রা। এই বঙ্গভূমির বিভিন্ন প্রান্তে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে অনুষ্ঠিত হয়। আর কথায় বলে রথ টানলে দুর্গা আসে। এই রথযাত্রার সঙ্গে বাঙালির প্রিয় উৎসব শারদোৎসবের এক নিবিড় যোগ আছে ।এই রথযাত্রার পরবর্তী প্রধান বড় উৎসব এই বাংলায় দুর্গোৎসব ।প্রধান বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে যে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় তাতে কাঠের নির্মিত রথেই শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেব ও বিভিন্ন পারিবারিক অন্যান্য কুলদেবতারা অধিষ্ঠান করেন । কিন্তু এই বাংলার কিছু স্থানে ধাতব রথ দেখতে পাওয়া যায় যেমন লোহা, পিতল, সোনা বা রূপো দিয়ে নির্মিত রথ ।এমনই এক রথযাত্রার কথা বলবো আজকে । যেখানে পিতলের রথে ভগবান আরোহন করেন । হুগলী জেলার চুঁচুড়ার আনুমানিক ছয়শো বছরের প্রাচীন হালদার বাড়ির রথ পিতলের এক চূড়া বিশিষ্ট রথে হালদার পরিবারের কুলদেবতা শালগ্রাম শিলা নারায়ণ শ্রী শ্রী বাসুদেব জিউ অধিষ্ঠান করেন। রথের মাথায় রয়েছে সুদর্শন চক্র ও ভগবান বিষ্ণুর বাহন গরুড় পক্ষী রথের মাথা থেকে ছয়টি ঘন্টা বাঁধা রয়েছে । রথের নীচে দুটি পিতলের ঘোড়া যারা রথটিকে যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে । রথের উপরিভাগে একটি কক্ষ আছে যার ভিতরে সিংহাসনে বসে থাকেন শ্রী শ্রী নারায়ণ বাসুদেব জিউ ও ঠিক তার সামনে মাঝারি ভাগে বসে আছে পিতলের সারথীর মূর্তি ও রথের নিম্নভাগে দুই পাশে দুটি পিতলের সিপাই বিদ্যমান । সোজা ও উল্টোরথ দুই দিনই রথ সাজিয়ে তার ভিতরে নারায়ণ কে বসিয়ে বিধি মেনে পূজার্চ্চনার পরে রথ টানা হয় । এই বাড়ির উপরের ঠাকুর ঘরে শ্রী শ্রী বাসুদেব জিউ থাকেন ও নিত্য সেবিত হন । রথের সময় তাঁকে নামিয়ে রথে বসানো হয় রথযাত্রা ও পুনর্যাত্রা দুই দিনই সন্ধ্যাবেলাতে রথ টানা হয় । এই বাড়িতে একটি দুর্গা দালান আছে সোজা রথের দিনে দেবী দুর্গার কাঠামো পূজা হয় । এখানে দেবী দুর্গার মহিষাসুরমর্দিনী সিংহবাহিনী দশভুজা ত্রিনয়নী বিগ্রহের পূজা হয় । এক চালার প্রতিমাতে দেবী দুর্গার সাথে তাঁর চার পুত্র কন্যা লক্ষ্মী , সরস্বতী , কার্তিক ও গণেশ রয়েছেন ।চুঁচুড়া হালদার বাড়ির শারদীয়া দুর্গা পূজা আনুমানিক চারশো বছরের প্রাচীন । চুঁচুড়ার ষন্ডেশ্বরতলার পাশে শ্মশানের কাছে গঙ্গার ঘাটে এক হতদরিদ্র ব্রাহ্মণ পূর্ণ কুটির নির্মাণ করে বসবাস করতেন। গঙ্গায় নৌকা করে যে সব যাত্রীরা যেত তারা ওই ব্রাহ্মণের কুটিরেই রাত্রি যাপন করতেন ।একদিন কোনো এক ঝড় জলের রাত্রে এক বৃহন্নলা তাঁর কুটিরে আশ্রয় চান ব্রাহ্মণ সেই বৃহন্নলাকে থাকতে দিয়ে তিনি শ্মশানে শুতে চলে যান। ভোর বেলা তিনি কুটিরে ফিরে দেখেন সেই বৃহন্নলা নেই, কিন্তু পরে আছে এক ঘোড়া সোনার মোহরের কলস। সেই রাত্রেই তিনি দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পান ও দেবী ভগবতী তাঁকে বলেন যে দেবী দুর্গার জন্যে ওই স্বর্ণ মোহর দিয়ে দালান নির্মাণ করে দেবী আরাধনা করতে। তিনি দেবীর আদেশ মতো গঙ্গার তীরবর্তী এই স্থানে দূর্গা দালান সহ প্রাসাদপ্রম ভবন নির্মাণ করিয়ে সানন্দে শারদীয়া দূর্গা পূজার আয়োজন করেন । সেই থেকে কুলদেবতা শ্রী শ্রী বাসুদেব জিউর ঠাকুরবাড়িতে শারদীয়া দূর্গা পূজার সূচনা হয়। এই দূর্গা দালান ও স্থাবর সম্পত্তি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসাবে বিবেচিত হয় । শারদীয়া দুর্গা পূজার ও কুলদেবতা শ্রী শ্রী বাসুদেব জিউর সেবার ভাগ আগে পাঠক বংশের ওপরেই ছিল, সেই কারণে চুঁচুড়ার এই জায়গার নাম হয় পাঠক গলি ও গঙ্গার ঘাটের নাম পাঠক ঘাট ।হালদার বংশের পূর্ব পুরুষ শ্রী মাধব হালদারের পুত্র শ্রী নবীন চন্দ্র হালদারের সাথে শ্রী বৃন্দাবন পাঠকের একমাত্র কন্যা কুসুম কুমারীর বিবাহ হয় । তাই পরবর্তী কালে কুসুম কুমারী দেবীর পুত্র ও বংশধরেরাই এই দেব সেবার ও দেবোত্তর সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রাপ্ত করেন । সেই থেকে এই পূজা হালদার বাড়ির পূজা নামে বিখ্যাত হয় । রথযাত্রার পরে প্রতিমা নির্মাণের কাজ শুরু হয় । আগে কৃষ্ণনগর থেকে কুমোর আসত। এখন স্থানীয় কুমোরই প্রতিমা নির্মাণ করেন। প্রতিপদাদি কল্পারম্ভে দেবী দুর্গার পূজা আরম্ভ হয়। ষষ্ঠীর দিনে বেলতলায় বোধন , সপ্তমী নবপত্রিকা স্নান ও স্থাপনের দ্বারা দেবী দুর্গার আগমন ঘটে । প্রতিদিন আরতি পুষ্পাঞ্জলী চন্ডীপাঠ ভোগারতি হয় বিধি মেনে । অষ্টমীর দিন ধুনো পোড়ানো হয়।নবমীর সকালে কুমারী পুজো হয়। দশমীর দিন অপরাজিতা ধারণ হালদার বাড়ির পুজোর একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য।অপরাজিতা ধারণ করে শ্রী শ্রী ষণ্ডেশ্বর শিবের মন্দিরে গিয়ে পুজো দিয়ে ও বাবা কে প্রদক্ষিণ করে সকলে বাড়ি ফিরে আসেন । যতক্ষণ না বিসর্জন হয়, ততক্ষণ হালদার বাড়িতে উনুন ধরানো হয়না। হালদার বাড়ির পুজোয় প্রতিপদ থেকে নবমী এই নয় দিন ধরে নিরামিষ খাওয়া হয়। তাতে শুক্তো ও বড়ি দিয়ে তেঁতুলের টকের পদ থাকে প্রতিদিন । পুজোয় রাঁধুনী আসে সেই ওড়িশার বালাসোর থেকে।হালদার বাড়ির শুক্তো নাকি অপূর্ব খেতে হয় ও মুখে লেগে থাকে এরকমই তার স্বাদই আলাদা।পরিবারের সবার জন্য তো বটেই, বাইরে থেকে যে সব অতিথিরা আসেন , সবার জন্য খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত থাকে পুজোর ক’টা দিন। দুর্গা দালানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হয় পুজোর কটা দিন ।এই ভাবেই রথযাত্রা ও শারদীয়া দূর্গা পূজা আজও পুরানো ঐতিহ্য মেনে পালন করে চলেছে চুঁচুড়ার হালদার পরিবার।
🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿🌿
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
চুঁচুড়া হালদার বাড়ির রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে শ্রী শ্রী বাসুদেব জিউ ও দেবী দুর্গার কাঠামোর বিশেষ পুণ্য দর্শন
স্থান : হালদার বাড়ি ( চুঁচুড়া , হুগলী )
©Koushick Banerjee
Do not post these picture without prior permission