18/08/2026
উত্তাল সমুদ্রে অনড় সংকল্প: নেতাজির ঐতিহাসিক সাবমেরিন অভিযান:-
ভারতকে মুক্ত করতে একজন নেতা কতটা দুঃসাহসী ও দৃঢ়সংকল্প হতে পারেন, ইতিহাসের এই অধ্যায়টি তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ।
কিয়েল বন্দর থেকে যাত্রা শুরু:
১৯৪৩ সাল—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চরম অস্থিরতার সময়। ভারতের স্বাধীনতার দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার লক্ষ্যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু জার্মানি থেকে জাপান যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ৮–৯ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে জার্মানির কিয়েল বন্দর থেকে ব্রিটিশদের চোখ এড়িয়ে জার্মান সাবমেরিন U-180-তে চেপে বসেন নেতাজি ও তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী আবিদ হাসান। দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে, আফ্রিকার উপকূল প্রদক্ষিণ করে তাঁরা প্রবেশ করেন ভারত মহাসাগরে।
ভারত মহাসাগরে ভয়াবহ বিপত্তি:
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ২৬ এপ্রিল মাদাগাস্কারের অদূরে এক গোপন স্থানাঙ্কে জার্মান সাবমেরিনটির সঙ্গে জাপানি সাবমেরিন I-29-এর মিলিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুই সাবমেরিন কাছাকাছি আসতেই শুরু হয় মারাত্মক ঝড় ও প্রকাণ্ড ঢেউ। দুটি ভারী সাবমেরিন কাছাকাছি এলে ধাক্কা লেগে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা, আর দূরে থাকলে উত্তাল স্রোতে মানুষ স্থানান্তর করা সম্পূর্ণ আত্মঘাতী!
মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে অনড় সিদ্ধান্ত:
টানা দু'দিন (২৬ ও ২৭ এপ্রিল) চেষ্টা করেও যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছিল না। সাবমেরিনের সীমিত জ্বালানি, শত্রু রাডারে ধরা পড়ার ভয় এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে জার্মান ক্যাপ্টেন ওয়ার্নার মুসেনবার্গ মিশন বাতিল করে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানান। কিন্তু নেতাজির উত্তর ছিল পরিষ্কার—ফিরে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই! যেভাবেই হোক তাঁকে জাপানি সাবমেরিনে পৌঁছাতেই হবে।
ইতিহাসের নজিরবিহীন স্থানান্তর:
২৮ এপ্রিল নেতাজি সিদ্ধান্ত নেন ছোট বাতাসভর্তি রাবার ডিঙিতে করে উত্তাল সমুদ্র পার হবেন। ক্যাপ্টেন মুসেনবার্গ এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে প্রথমে রাজি না হলেও নেতাজির অটল সংকল্পের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হন। পাহাড়প্রমাণ ঢেউ আর নিশ্চিত মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে নেতাজি ও আবিদ হাসান সেই ছোট রাবার বোটে নামেন এবং ঢেউয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিরাপদে জাপানি সাবমেরিন I-29-এ গিয়ে পৌঁছান।
সামরিক ইতিহাসের পাতায় বিশ্বযুদ্ধের আবর্তে উন্মুক্ত উত্তাল সমুদ্রে এক সাবমেরিন থেকে অন্য সাবমেরিনে কোনো রাষ্ট্রনেতার এমন বিপজ্জনক স্থানান্তর ছিল একমাত্র এবং অভূতপূর্ব ঘটনা।
স্বাধীনতার নতুন ভোর:
এই দুঃসাহসিক অভিযানের পর ৬ মে তাঁরা সুমাত্রার সাবাং দ্বীপে পৌঁছান এবং সেখান থেকে টোকিও পৌঁছে নেতাজি 'আজাদ হিন্দ ফৌজ'-এর সর্বাধিনায়কত্ব গ্রহণ করেন। দেশের স্বাধীনতার কাছে নিজের জীবন তাঁর কাছে কতটা গৌণ ছিল, এই ঘটনা তার স্পষ্ট প্রমাণ।
যে মানুষটি দেশের জন্য মৃত্যুর মুখে পা বাড়াতে দু'বার ভাবেননি—তাঁকে আজ যারা হেয় করার দুঃসাহস দেখায়, তারা কি আদৌ ভারতবাসী?
#নেতাজীসুভাষব্রিগেডএকসংগ্রাম