25/05/2025
যে নামটি আমরা যাচ্ছি ভুলে - রাসবিহারী বসু
▪️আমরা তাঁদেরকেই মনে রাখি যাদেরকে মনে রাখে ইতিহাস। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন অনেক নায়ক রয়েছেন যাঁরা আজ ইতিহাসের পৃষ্ঠায় প্রায় ভুলে যাওয়া কিছু নাম হয়ে রয়ে গিয়েছেন। তাঁদেরই একজন হলেন রাসবিহারী বসু — এক অবিস্মরণীয় বিপ্লবী, যিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের সূচনা করেছিলেন এবং আজীবন ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্নে বিশ্বাস রেখে লড়ে গিয়েছেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের নাম শুনলেই প্রথমে আমাদের মনে পড়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর কথা। কিন্তু অমরা খুব কম মানুষই জানি , এই সেনাবাহিনীর প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রাসবিহারী বসু। কোনো একরাতে তাঁর পক্ষে এই বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ব্রিটিশ শাসনের চোখ এড়াতে তিনি জাপানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সেখান থেকেই স্বাধীন ভারতবর্ষ গড়ে তোলার জন্য তাঁর লড়াই চালিয়ে যান। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ছাড়া আজাদ হিন্দ ফৌজের জন্মই হতো না।
আজাদ হিন্দ ফৌজের বীজ বপনকারী রাসবিহারী বসু কৈশোর থেকেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই তিনি ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপে অংশগ্রহণ শুরু করেন। ১৯০৮ সালের আলিপুর বোমা মামলা তাঁকে প্রথমবার জনসমক্ষে নিয়ে আসে । এরপর তিনি দেরাদুনে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে কেরানির চাকরি নেওয়ার আড়ালে বিপ্লবী কাজ চালিয়ে যান।
১৯১২ সালে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের ওপর বোমা হামলার পরিকল্পনায় তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। যদিও দুর্ভাগ্যবশত হার্ডিঞ্জ বেঁচে যান। কিন্তু রাসবিহারী বসু ধরা পড়েননি। এই ঘটনার পর থেকেই ব্রিটিশ গোয়েন্দারা তাঁর পেছনে লেগে যায়।
১৯১৩ সালে তিনি বাঘা যতীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বাঘার সাহস ও আদর্শ রাসবিহারীর চিন্তাধারায় বড়সড় প্রভাব ফেলে। এরপর তিনি গদর আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন— যা ছিল বিদেশে থাকা ভারতীয়দের দ্বারা পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন।
পরবর্তীতে ১৯১৫ সালে ব্রিটিশদের চোখ এড়াতে তিনি জাপানে চলে যান। সেখানে প্রথমে তাকে আশ্রয় দেন কিছু পান-এশিয়ান সংগঠন। পরে তিনি জাপানি নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং জাপানেই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত গড়ে তোলেন।
রাসবিহারী বসু কেবল একজন বিপ্লবী ছিলেন না, তিনি একজন সাহিত্যিক ও দার্শনিকও ছিলেন। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সিনেমার জগতেও তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। রামায়ণ ও গীতার জাপানি অনুবাদ তাঁরই করা। এমনকি তিনি এক সময়ে বোম্বেতে (বর্তমানে মুম্বই) এশীয় চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে তোলার স্বপ্নও দেখেছিলেন, যা পরবর্তী কালে বলিউডে রূপান্তরিত হয়।
১৯২৪ সালে রাসবিহারী বসু জাপানে 'ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ' প্রতিষ্ঠা করেন। এই বছরই তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় সুভাষচন্দ্র বসুর, যা সম্ভব হয় বীর সাভারকরের উদ্যোগে। এই সাক্ষাৎই ছিল আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের বীজ রোপণের মুহূর্ত। ১৯৪২ সালে রাসবিহারী আজাদ হিন্দ ফৌজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরে সুভাষচন্দ্র বসুর হাতে এর নেতৃত্ব তুলে দেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সুভাষের নেতৃত্বেই এই ফৌজ ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে।
রাসবিহারী বসু, যিনি দেশে-বিদেশে প্রতিনিয়ত স্বাধীন ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছেন এবং সেই স্বপ্ন পূরণের নিরলস প্রচেষ্টা করে গেছেন , তিনি আজও ভারতের ইতিহাসে অমর। হ্যাঁ , স্বাধীনতার পরে হয়তো তাঁর নাম কিছুটা আড়ালে পড়ে গেছে, কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস তাঁকে কখনো ভুলে যেতে পারে না , ভারতবাসী হিসেবে আমরা তাঁকে কখনোই ভুলে যেতে পারি না।
আজ ২৫ মে, ২০২৫ , রাসবিহারী বসুর ১৩৮ তম জন্মদিন।
ভারতের এই মহান দেশপ্রেমিক ও বিপ্লবীর চরণে জানাই শতকোটি প্রণাম। 🙏🏻