26/08/2026
প্রথমে আসা যাক জ্যোতি বসুর চারবারে ব্যারিস্টার হওয়ার একটি স্টুপিড তথ্যের বিষয়ে।
১৯৩৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে বি.এ অনার্স করার পর ইংল্যান্ডে গিয়ে তিনি UCL-এ আইন পড়া শুরু করেন এবং ১৯৩৬ সালে Middle Temple-এ ভর্তি হন। তখন ব্রিটেনে ব্যারিস্টার হওয়ার জন্য চারটি Inns of Court-এর (Middle Temple, Inner Temple, Lincoln’s Inn, Gray’s Inn) কোনও একটির সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল।
Middle Temple-এ ভর্তি হওয়ার পর আইন অধ্যয়ন, Bar-এর নির্ধারিত পরীক্ষা এবং অন্যান্য পেশাগত শর্ত পূরণ করতে হতো। অর্থাৎ Barrister হওয়া শুধু একটি পরীক্ষায় পাশ করার বিষয় ছিল না; এটি ছিল একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সব শর্ত পূরণের পর সংশ্লিষ্ট Inn একজন শিক্ষার্থীকে “Called to the Bar” করত।
জ্যোতি বসুর ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ায় প্রায় চার বছর সময় লাগে এবং তিনি ২৬ জানুয়ারি, ১৯৪০ সালে Called to the Bar হন। গান্ধী-জিন্নাহর ক্ষেত্রে প্রায় তিন বছর এবং নেহেরুর ক্ষেত্রেও প্রায় চার বছর সময় লেগেছিল। তাই “একবারে ব্যারিস্টার” বা “চারবারে ব্যারিস্টার”—এই বিভাজনটাই অর্থহীন।
এবার হরেকৃষ্ণ কোঙরের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে।
“হরেকৃষ্ণ কোঙর এইট পাশ”—এই তথ্য সম্পূর্ণ ভুল।
তিনি মেমারি বিদ্যাসাগর স্মৃতি বিদ্যামন্দির থেকে দশম শ্রেণির পরীক্ষায় ফার্স্ট ডিভিশন ও সংস্কৃতে লেটার নিয়ে উত্তীর্ণ হন। এরপর বঙ্গবাসী কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে পড়া শুরু করেন। কিন্তু ১৯৩২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে ছয় বছরের জন্য সেলুলার জেলে বন্দি হওয়ায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি।
বিষয়টি তাঁর পরিবারের জন্যও বড় ধাক্কা ছিল। তাঁর বাবা শরৎ কোঙর তাঁকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু সম্ভ্রান্ত পরিবারের জীবন ও বিলাসিতা প্রত্যাখ্যান করে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হন। এছাড়াও তিনি সাতটি ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারতেন।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বি.এ-তে ৪২% মার্কস ছিল—এমন কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তিনি অনার্সসহ ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। ষাটের দশকে অনার্স ধরে রাখা যে সহজ বিষয় ছিল না, তা যাঁরা সেই সময়ের পড়াশোনার সঙ্গে পরিচিত তাঁরা জানেন। একই কথা আশি-নব্বইয়ের দশকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এবার সরোজ মুখার্জি ও অনিল বিশ্বাসের প্রসঙ্গ।
“সরোজ মুখার্জি ১২ পাশ” এবং “অনিল বিশ্বাস বি.এ ফেল”—দুটিই মিথ্যা তথ্য।
সরোজ মুখার্জি ১৯২৮ সালে বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুল থেকে ফার্স্ট ক্লাসে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। এরপর বৃত্তি নিয়ে শ্রীরামপুর কলেজ থেকে I.S.C পাশ করেন। ১৯৩০ সালে লবণ সত্যাগ্রহে অংশ নিয়ে কারারুদ্ধ হন। মুক্তির পর বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হলেও বি.এ পরীক্ষার আগেই আবার গ্রেফতার হন। ফলে কারাগারে বন্দি অবস্থাতেই বি.এ পাশ করেন এবং পরবর্তীতে এম.এ ও আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন।
অন্যদিকে অনিল বিশ্বাস কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজ থেকে বি.এ অনার্স করে কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্সে ভর্তি হন। ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণে গ্রেফতার হয়ে ১১ মাস কারাবাস করেন। বন্দি অবস্থাতেই পরীক্ষা দিয়ে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন।
রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই হোক, ইতিহাসের ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার সময় অন্তত তথ্য যাচাই করা উচিত। পছন্দ বা অপছন্দের ভিত্তিতে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, জীবনের ঘটনা বা অর্জনকে বিকৃত করা ইতিহাসচর্চা নয়।