29/08/2026
বাবার প্রতীক্ষায় অবুঝ শিশু।কিসের বলি হলেন সৈকত আর তার পরিবার?
সেদিন কি আকাশ কালো ছিলো, চাঁদ কি ছিলো লুকিয়ে?নিস্তব্ধতা কি ভারী কোনো পাথরের মতো চেপে বসেছিলো শহরের বুকের উপর?
নিয়ন আলোর আলোকিত শহর আবারো জমে উঠেছে। ব্যস্ত হয়ে গেছে ব্যস্ত মানুষ গুলো। ফেইসবুকে পুরোনো হয়ে গেছে সৈকত নাম, নতুন কোনো ভাইরাল টপিক দখল করেছে ফেইসবুক আর পত্রিকার পাতা। দল বেঁধে শান্তনা দেয়ার মানুষ গুলো একে একে ফিরে গেছে আপন ভুবনে। কেবল থমকে আছে একটি ঘর।
সন্ধ্যা রাত,বারান্দার কোনায় দেয়ালঘড়িটার টিকটিক শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। টেবিলে ঢাকা পড়ে থাকা থালাগুলোর দিকে তাকিয়ে বসে আছে চার বছরের ছোট মেয়ে। তার চোখে ঘুম নেই, সেখানে জমে আছে এক সমুদ্র অপেক্ষা। অতি প্রিয় মানুষের জন্য প্রতীক্ষা। যার কোল স্বর্গীয়, যার স্পর্শে মায়া আর ছায়া।
কিছু অপেক্ষা শেষ হয় না। কিছু ডাক আর কোনো দিন ফিরে আসে না। পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্পাপ দুই চোখ তখনো দরজার পানে চেয়ে আছে—যদি এখনই দরজাটা একটু ফাঁক হয়, যদি চিরচেনা কণ্ঠটা ভেসে আসে, "আম্মু আমার,আম্মু গো!কোথায় আমার কলিজা?এখনো খাওনি মা ?
ছোট মেয়েটি দরজার ফাটল দিয়ে বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকায়। মা এসে নরম হাতে মেয়ের মাথায় হাত রাখেন। মায়ের সেই স্পর্শে কোনো উষ্ণতা নেই, আছে এক বুক শঙ্কা আর উদ্বেগ। চোখের জল আড়াল করে বুকে পাষান বেঁধে মা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বলে, "মারে... অনেক রাত হয়েছে, তুই খেয়ে নে। তোর বাবার আসতে আজ দেরি হবে...
মেয়েটি তার অবুঝ, নিষ্পাপ চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে জিদ ধরে, "না মা! আমি একদম খাব না। বাবা ফোনে বলল না—'খাবার রেডি করো, আমি আসছি!' বাবা না আসলে আমি এক লোকমাও মুখে দেব না। বাবা আমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দেবে... আমি বাবার কোলে বসে খাব, শক্ত করে বাবাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাব। বাবা ছাড়া কি আমার ঘুম আসে?
কি জবাব দেবে মা? আকাশ কাঁপানো চিৎকার দিতে গিয়েও থমকে যেতে হয় অবুঝ বাচ্চাদের মুখে চেয়ে। কি করে বুঝবে পৃথিবী, চারপাশে সৈকতের গায়ের গন্ধ। যেদিকে চোঁখ যায় মনে হয় এইতো মানুষটা কাল এখানে বসেছিলো। এখানে শুয়ে ছিলো!সৈকতের মোবাইলটা এখনও আগের জায়গায়!নম্বরটায় বারবার রিং হয়ে কেটে যায়, কেউ ধরে না। চারপাশের হাওয়া যেন এক অজানা আশঙ্কায় থমকে গেছে। আজও বার বার সেই রাত ফিরে আসে।
যে রাতে অনেক মানুষের চাপা কান্না আর আর্তনাদ ছুটে আসে বাড়ির উঠোনে।
রক্তাক্ত, ছিন্নভিন্ন একটি নিথর দেহ নিয়ে একদল মানুষ এসে দাঁড়ায়। রাতের অন্ধকার আলোয় চেনার উপায় নেই, নির্মম সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাত সবটুকু ক্যানভাস আঁকড়ে রক্তে লাল করে দিয়েছে।
যে মানুষটি একদিন আগেও ফোনে হেসে বলেছিলেন—'খাবার রেডি করো, আসছি', তিনি এলেন... তবে নিজ পায়ে হেঁটে নয়, কিছু মানুষের কাঁধে ভর করে।
মায়ের হৃদয়বিদারক কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু ছোট মেয়েটি কিছুই বুঝতে পারেনি সেদিন । সে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে সেই নিথর দেহটার পাশে বসেছিলো । নরম দুটি হাত দিয়ে বাবার গাল দুটো ঝাঁকিয়ে বলেছিলো , "বাবা? ওঠো না বাবা... তুমি ঘুমাচ্ছ কেন? দ্যাখো, আমি এখনো খাইনি! তুমি তো বলেছিলে তাড়াতাড়ি আসবে... আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে বাবা, ওঠো না..."
বাবার মুখজুড়ে জমে থাকা রক্তে হাত বুলিয়ে শিশুটি হাসানোর চেষ্টা করেছিলো , "তোমার গায়ে এগুলো কিসের লাল রং বাবা? তুমি কি খেলা করছিলে? মা, বাবাকে বলো না উঠতে! আমার সাথে কথা বলছে না কেন?"
রাত গভীর আলো নিথর হতে থাকে । সৈকতকে নিয়ে যাওয়া হলো শেষ বিদায়ের চিরন্তন ঠিকানায়। মেয়েটি দরজায় দাঁড়িয়ে বাবার সেই ঠান্ডা, রক্তমাখা হাত দুটো আঁকড়ে ধরে টেনেছিল "বাবাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ তোমরা? বাবাকে নিয়ে যেও না! বাবা, তুমি না বললে আজ সকালে আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরতে যাবে? বাবা... একবার তাকাও না..."
সে জানে না তার বাবা আর কোনো দিন তাকাবে না। আততায়ীর হিংস্রতা এক রাতে কেড়ে নিয়েছে একটা নিষ্পাপ শৈশবের পুরো পৃথিবী।
এখন প্রতি রাতে টেবিলে ঢাকা খাবারের সামনে হয়তো কেউ বসে থাকবে। শিশুটি জানবে না—কোন রাজনীতি কিংবা কোনো সম্পত্তির লোভে তার বাবাকে কেড়ে নেওয়া হলো। যদি সে বুঝত, তবে হয়তো সারা বিশ্বকে চিৎকার করে বলত, "তোমরা আমাদের সব নিয়ে যাও, তাও আমার বাবার বুকটা ফিরিয়ে দাও! বিশ্বাস করো, বাবা ছাড়া আমি ঘুমাতে পারি না, আমি চুল বাঁধতে পারি না, আমি স্কুলে যেতে পারি না... দাও না চাচ্চু, মামা, ভাইয়া... আমার বাবাকে একটু ফিরিয়ে দাও!"
নিস্তব্ধ রাতে কেবল একটা নীরব প্রশ্ন বাতাসে ভেসে বেড়ায়—দেশ, রাজনীতি আর সম্পত্তির এই নির্মম খেলায় একটা নিষ্পাপ শিশুর কী অপরাধ ছিল?
Bangladesh Awami League 360 Bangladesh Awami League Sajeeb Wazed