16/08/2026
সালাহউদ্দিন আহমেদের ছেলে সাইদ ইব্রাহিম জাপানি কোম্পানির চল্লিশ হাজার কোটি টাকার দুটি ব্রিজ প্রজেক্টের লোকাল পার্টনার হবার বিষয়ে আমাদের উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে দিয়েছেন। তার ফেসবুক পোস্ট শুরু হয়েছে বাংলাদেশে বিনিয়োগের অবস্থা কতো খারাপ আর শেষ হয়েছে এনসিপি কতো খারাপ তা দিয়ে। দুটির কোনোটাই উত্থাপিত অভিযোগ (রাজনৈতিক প্রভাব ও কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট) এর ধারে কাছেও না। তাই তার পোস্টের শুরু ও শেষ নিয়ে পরে কথা বলি। এই পোস্টটি লিখতে যেয়ে ঐ জাপানি কোম্পানি সম্পর্কেও বেশ চমকপ্রদ কিছু তথ্য পেয়েছি। এটা দিয়েই শুরু করি।
১. Miyagawa Kensetsu নামের জাপানি কোম্পানিটির ওয়েবসাইট সম্পূর্ণ জাপানিতে। তাদের বাংলাদেশে ব্রিজ বানানোর জন্য একটি ওয়েবসাইট আছে কিন্তু তাতে কোনো তথ্য নেই। তাদের ক্যাপিটাল ৮০ মিলিয়ন ইয়েন বা ০.৫ মিলিয়ন ডলারের মতো এবং বার্ষিক গড় কন্সট্রাকশন ভ্যালু ৪ মিলিয়ন ডলার। তারা ওয়েবসাইটে ব্রিজ কন্সট্রাকশনের কথা লিখলেও তাদের বানানো কোনো ব্রিজ খুঁজে পাই নি। তারা মূলত পোর্ট ও কোস্ট রিলেটেড প্রজেক্ট করে। তাদের বানানো সবথেকে বড় প্রজেক্ট ২.৫ মিলিয়ন ডলারের (Hakata Port dredging project 2008, আরেক কোম্পানির সাথে যৌথভাবে)।
মজার বিষয়, যে লিঙ্কে এই প্রজেক্টটির কথা পেয়েছি, সেখানে মিয়াগাওয়াকে একটি ছোটো/মাঝারি কোম্পানি (SME) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই লিঙ্কে SME এর ব্যাখ্যা বলা হয়েছে ২ বিলিয়ন ইয়েনের কম ক্যাপিটাল ও ১৫০০ এর কম এম্পলয়ি। তাদের বর্তমানে ক্যাপিটাল ৮০ মিলিয়ন ইয়েন ও এম্পলয়ি ৩৪ জন। এই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে তারা এই কাজটি জাপানি সিনেটর ও রিপ্রেজেনটেটিভদের পলিটিকাল ইনফ্লুয়েন্সিং এর মাধ্যমে পেয়েছে। অনেকগুলো ফলোআপ রিপোর্টের লিঙ্ক পেয়েছি। কমেন্ট সেকশনে দিবো।
এই কোম্পানির যদি এর থেকে বড় কোনো প্রজেক্ট করা থাকে, তাহলে প্লিজ সেটা কমেন্টে জানান। সংশোধন করে দেবো।
এই কোম্পানিটি এখন বাংলাদেশে করতে চাচ্ছে ৩.৪ বিলিয়ন ডলারের বড় প্রজেক্ট। ফলে, আসলে সত্যিকারের স্ক্রুটিনি প্রক্রিয়াতে গেলে এই কোম্পানিটি হয়ত এই ব্রিজের কাজই পাবে না। ইন ফ্যাক্ট, এই কোম্পানির বরিশালে এই ব্রিজ বানানোর প্রস্তাব সেই ২০২০ সাল থেকেই অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটিতে আলোচনা হয়েছিলো - কিন্তু তা আর আগায় নি।
শুধু তাই নয়, ওয়েব আর্কাইভের মাধ্যমে স্টালিয়ন ক্যাপিটালের সবথেকে পুরনো ওয়েবপেজ পাওয়া যায় ২০২৫ সালের ১৮ জুন -- অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি তৈরির ৮ মাস পর। সেখানেই বলা আছে তারা এই ব্রিজ দুটি বানানোর প্রজেক্টে জাপানি কোম্পানি লোকাল পার্টনার। তারা স্টালিয়ন ক্যাপিটাল তৈরির ঠিক কয়দিনের মধ্যে এতো বড় প্রজেক্ট সিকিউর করলেন?
মানে এমন না যে স্টালিয়ন ক্যাপিটাল এই কোম্পানিকে নিয়ে আসছে বাংলাদেশে, বরং এই কোম্পানিই অনেক বছর ধরে এই প্রজেক্টে আগ্রহী ছিলো; এখন স্টালিয়ন ক্যাপিটালকে লোকাল পার্টনার হিসেবে নিয়েছে।
এবার সাইদ ইব্রাহিমের পোস্টের দিকে আসা যাক।
২. আমাদের উত্থাপিত অভিযোগ ছিলো সাইদ ইব্রাহিমের প্রতিষ্ঠানের ইনফ্রাস্ট্রাকচার বিষয়ক বৈদেশিক বিনিয়োগের কোনো অভিজ্ঞতাই নেই -- ফলে হুট করে এতো বড় প্রজেক্টের লোকাল পার্টনার হয়ে যাওয়া সন্দেহজনক। তিনি এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কোনো বিপরীত উদাহরণ দেখান নি। প্রায় দুই বছর বয়সী স্টালিয়ন ক্যাপিটালের করা অন্য কোনো প্রজেক্টের কথাই উল্লেখ করেন নি -- ওয়েবসাইটেও নেই। তবে তিনি বৈদেশিক বিনিয়োগ সম্পর্কে তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তার এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাটা খুবই ইন্টারেস্টিং।
৩. উনি বলেছেন ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজে তিনি ও তার দল ১০০ কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক পোর্টফলিও বিনিয়োগ আনার কাজ করেছেন। এখানে ফ্রেমিংটা লক্ষ্য করুন -- শুনে মনে হবে তিনি ছিলেন বৈদেশিক বিনিয়োগ আনা সংক্রান্ত একজন গুরুত্বপূর্ণ টিম লিডার পর্যায়ের লোক। অথচ ওনার ক্যারিয়ার ট্রাজেক্টরি হিসেবে এটা ছিলো মোটামুটি এন্ট্রি লেভেলের জব। মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ব্যাচেলর্স করার পরে ২০১৬-১৭ তে ফিনান্সের উপর একটি মাস্টার্স করেন, এক বছর এবি ইনভেস্টমেন্টে চাকরি করেন, ২০১৮-১৯ এ আরেকটি মাস্টার্স করেন এবং তার পরেই তার ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজে তিন বছর চাকরি।
১০০ কোটি টাকার পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্টের ক্ষেত্রে তার এক্সাক্ট রোল কী ছিল? কত বড় ছিলো?
৪. উনি ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজে মূলত Foreign Portfolio Investment (FPI) নিয়ে কাজ করেছেন। FPI সাধারণত বিদ্যমান কোম্পানির শেয়ার, বন্ড বা অন্যান্য সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের মাধ্যমে রিটার্ন অর্জনের সঙ্গে সম্পর্কিত -- এখানে বিনিয়োগকারী সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা বা প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণে যুক্ত হন না। অন্যদিকে, FDI হলো কোনো দেশে ব্যবসা, কোম্পানি বা অবকাঠামো প্রকল্পে সরাসরি ও তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, যেখানে বিনিয়োগকারী ব্যবসার কার্যক্রম ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকেন।
দুটি বৃহৎ সেতুর মতো ফিজিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রকল্পে বিনিয়োগ একজন বিনিয়োগকারীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি (কয়েক দশক) মূলধন ও প্রকল্প-সম্পৃক্ততার বিষয়। তাই FPI ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাকে সরাসরি FDI বা বৃহৎ অবকাঠামো বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ নয়। সাধারণত FDI ও FPI দুই ধরনের বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিনিয়োগকারী, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রও আলাদা।
যেহেতু উনার ইনভেস্টমেন্ট বিষয়ক দুটি মাস্টার্স ডিগ্রি আছে, এই ফিল্ডে কাজ করেছেন, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিনান্স পড়ান; আমি নিশ্চিত উনি জানেন যে এই দুইটা এক জিনিস না। কিন্তু তাও এই দুইটা জিনিসকে এক হিসেবে একই রকম দেখিয়ে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, আমাদের যেই উত্থাপিত অভিযোগ, অর্থাৎ "এফডিয়াই বিষয়ক তার বা তার কোম্পানির কোনো অভিজ্ঞতাই নেই" তার বিপরীতে কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলো না।
৫. এবার ওনার অন্য একটি দাবি পর্যালোচনা করে দেখা যাক। স্টালিয়ন ক্যাপিটাল নাকি কেবল কন্সাল্টেন্সি পর্যায়ে যুক্ত, শুধু বিনিয়োগ আনার প্রক্রিয়াতে হেল্প করবেন। সেতু নির্মাণ বিষয়ক কোনো কাজে স্টালিয়ন ক্যাপিটাল যুক্ত হবে না।
যদি আপনারা সম্প্রতি বিজনেস স্টান্ডার্ডের নিউজ দেখেন, যেটা সাইদ ইব্রাহিম ও স্টালিয়ন ক্যাপিটাল শেয়ার করেছে, সেখানে স্টালিয়ন ক্যাপিটালকে লোকাল পার্টনার বলা হয়েছে, কেবল কনসাল্টেন্ট না। হতে পারে এটা কেবল নামকরণ (সিমান্টিক) ইস্যু। কিন্তু, আপনি স্টালিয়ন ক্যাপিটালের ওয়েবসাইটে যান এবং সেখানে ইনফ্রাস্ট্রাকচার পেজটিতে যান। সেখানে ব্রিজ সেকশনে তারা এই ডিলের কথা গর্বভরে লিখে রেখেছে। সেখান থেকে কোট করছি, "As the key local partner and investment consultant of Japan’s Miyagawa Kensetsu,...", দেখুন লোকাল পার্টনারশিপের কথা আলাদা উল্লেখ করা -- তার বিস্তৃতি কতো বড়?
তারা আরো জানাচ্ছেন: "By leveraging cutting-edge engineering, sustainable practices, and strategic expertise, Stallion Capital is not just constructing infrastructure—we are building the future of Bangladesh, driving Innovation & national development."; "Stallion offers comprehensive Engineering, Procurement, and Construction (EPC) and Turnkey services, covering all aspects of Mechanical, Electrical, and HVAC systems."
কেবলই একটা কন্সাল্টেন্সি ফার্মের জন্য একটু বেশিই ইঞ্জিনিয়ারিং হয়ে গেলো না? উনি তার স্টাটাসে McKinsey, BCG এর উদাহরণ দিয়ে বললেন তারা নাকি সেরকমই একটা প্রতিষ্ঠান। McKinsey, BCG এর মতো প্রতিষ্ঠান কী Engineering, Procurement, and Construction (EPC) and Turnkey services এর কাজ করে? অবশ্য হতে পারে তারা হয়ত এই পার্টিকুলার প্রজেক্টে কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং সাইড দেখবে না, কেবল কন্সাল্টেন্সিই করবে।
এই ওয়েবপেজে তারা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিল্ডে "প্রুভেন ট্র্যাক রেকর্ড" এর কথাও লিখেছেন। সেটার কথা নাহয় তোলাই থাকলো।
৬. এই সেতুর বিষয়ে আগে এপ্রুভাল না পাওয়া একটি অনভিজ্ঞ কোম্পানি, অনভিজ্ঞ লোকাল পার্টনারের সাহায্যে এখন সেতু বিভাগের সাথে ব্রিজ বানানোর বিষয়ে আলাপ আলোচনা করছে। একটু অবাক করার মতোন না? কিন্তু সাইদ ইব্রাহিম আমাদের বিশ্বাস করতে বলছেন, যেহেতু তার পিতা, বাংলাদেশের সবথেকে পাওয়ারফুল মন্ত্রী (অনেকের মতে সবথেকে পাওয়ারফুল ব্যক্তি/ ডি-ফ্যাক্টো প্রধানমন্ত্রী) সালাহউদ্দিন আহমেদ যেহেতু সেতু বিভাগের দায়িত্বে না, তাই এখানে কোনো কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট/ রাজনৈতিক প্রভাব নেই। এরকম কোনো রাজনৈতিক প্রভাব হয়ত ছিলো না ওনার বিবিসিতে ডিরেক্টর হতেও। তিনি যেহেতু বলেছেন, আপনারাও বিশ্বাস করে নেন। হয়ত আমরা শুনবো সালাহউদ্দিন আহমেদ একনেকে এই বিষয়ক বৈঠকেও আলোচনায় অংশ নেয়া থেকেও বিরত থাকবেন।
৭. এবার একটু ওনার পোস্টের শুরুতে যাই। শুরুতে বিশ্বব্যাঙ্কের ২০২০ সালের ব্যবসা পরিচালনা সহজতা সূচকের (Ease of doing business index) এর একটা রেফারেন্স দিয়েছেন। এই সূচকটা এতোটাই ত্রুটিপূর্ণ (flawed) যে বিশ্বব্যাঙ্ক নিজেই এই ইন্ডেক্সটা ২০২১ সালে বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ, এতে এথিকাল ব্রিচ ও ডাটা ভায়োলেশন ছিলো এবং র্যাঙ্কিং পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ ছিলো। এর মানে এই না যে বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য খুব ভালো দেশ। কিন্তু, একজন তথাকথিত অভিজ্ঞ বিদেশী বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনান্স শিক্ষক কি এই সূচকের বাতিল হয়ে যাওয়ার খবর ও কারণ জানতেন না? জানলে কি উনি পোস্টের কন্টেক্স দেয়ার মতো অন্য কোনো উদাহরণ পেলেন না? ওনার উচিত যেই এআই দিয়ে পোস্ট লেখান, সেগুলোর আউটপুটকে একটু সতর্কতার সাথে ম্যানুয়ালি চেক করা।
উনি পোস্ট শেষ করেছেন ওনার একগাদা ব্যক্তিগত ফ্রাস্ট্রেশন ঝেড়ে। এক গ্লাস "এনসিপি খারাপ" এর মধ্যে এক টেবিল চামচ "দেশের উন্নয়ন (ও অন্যরা উন্নয়নবিরোধী)", এক টেবিল চামচ "দেশের ভালো করাই কী আমার অপরাধ?", ও এক চা চামচ "পরিবারের ত্যাগ" মিশিয়ে শেষ করেছেন। একসাথে এই কথাগুলো শুনলে আমাদের একজন মেগালোম্যানিয়াক ডিক্টেটরের কথা বলার স্টাইলটা মনে পড়ে যায়। এমনিতে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও প্রফেশনালের থেকে আমরা টু দ্যা পয়েন্ট এবং অব্জেক্টিভ কথাবার্তা আশা করি। অবশ্য বাংলাদেশের ট্রাডিশনাল সফল রাজনীতিবীদ হতে চাইলে এপ্রোচ ঠিকই আছে।
আমার আগের পোস্ট সোশাল মিডিয়াতে তুমুল আলোচনা তুললেও এখনো একটা মেইনস্ট্রিম মিডিয়াও এই নিয়ে কোনো রিপোর্টিং বা ইনভেস্টিগেশন, কোনো বিশেষজ্ঞ মতামত নেয়ার প্রয়োজনবোধ করে নি -- অন্তত আমার চোখ পরে নি। কেবল প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের বাংলাভিশন এই বিষয়ে রাশেদ খানের মন্তব্য কোট করেছে দেখলাম। এই ইস্যুর রাজনৈতিক প্রভাবহীনতা এবং কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্টের অভাব এতোটাই প্রবল।
রিলেভেন্ট লিঙ্কগুলো কমেন্টে দিচ্ছি। আমার কোনো ফ্যাকচুয়াল ভুল হলে কমেন্টে ধরিয়ে দিলে উপকৃত হবো।
Istiak H.Akib
পোস্ট থেকে নেয়া
Copy post