Dr. Kushal Baran Chakraborty

Dr. Kushal Baran Chakraborty Assistant Professor | University of Chittagong | Public figure | Columnist

02/08/2026

নাটোরে ৭ হিন্দু পরিবারকে চাঁদার চিঠি, নেপথ্যে কথিত ‘মোহেলা বেগম’

বাংলায় শিল্পায়নের অগ্রদূত আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রবর্তমান বিশ্বে কভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস এক জাজ্জ্বল্যমান আতঙ্কের নাম। ২০১৯ ...
02/08/2026

বাংলায় শিল্পায়নের অগ্রদূত আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র

বর্তমান বিশ্বে কভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস এক জাজ্জ্বল্যমান আতঙ্কের নাম। ২০১৯ সালে যখন এ মারণব্যাধিটি মহামারীরূপে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই ব্যাধিটির সম্পূর্ণ চিকিৎসা এবং ভ্যাক্সিন আবিস্কৃত হয়নি। কিন্তু ২০২০ সালে করোনার প্রাথমিক চিকিৎসায় সবচেয়ে কার্যকরী একটি ঔষধ ছিলো হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন। ঔষধটি বহুল ব্যবহৃত একটি ম্যালেরিয়ার ওষুধ।এ ওষুধটি তৈরির পেছনে অনন্য অবদান আছে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলী গ্রামের জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের প্রতিষ্ঠানের। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যালসই ভারতে সর্বপ্রথম ক্লোরোকুইন ওষুধ তৈরি করে। এরই পরম্পরায় পরবর্তীতে আসে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন। অবশ্য যখন ক্লোরোকুইনের ধারাবাহিকতায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন আবিস্কৃত হয়, তখন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র সশরীর ছিলেন না।

বাঙালি তথা ভারতবর্ষের বিজ্ঞানের অন্যতম অগ্রনায়ক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট খুলনা জেলার রাড়ুলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন বহুভাষাবিদ, সুপণ্ডিত, সমাজসেবী ও বিদ্যোৎসাহী হরিশচন্দ্র রায় চৌধুরী এবং মাতা ভুবনমোহিনী দেবী। জমিদার পরিবারে জন্ম হলেও, তিনি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সাধারণ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। বিজ্ঞানে অনন্য অসাধারণ অবদানের জন্যে তাঁর জন্মদিনটিকে পশ্চিম বাংলায় বিজ্ঞানদিবস হিসেবে পালন করা হয়।

১৮৭৯ সালে তিনি কোলকাতার আলবার্ট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন।১৮৮২ সালে গিলক্রাইস্ট বৃত্তি নিয়ে লন্ডন থেকে বি.এস.সি পাশ করেন।১৮৮৭ সালে রসায়ন শাস্ত্রে মৌলিক গবেষণার জন্যে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি.এস.সি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল কপার ম্যাগনেসিয়াম শ্রেণীর সম্মিলিত সংযুক্তি পর্যবেক্ষণ (Conjugated Sulphates of Copper Magnesium Group: A Study of Isomorphous Mixtures and Molecular Combination)। দুই বছরের কঠোর সাধনায় তিনি এই গবেষণা কর্ম সমাপ্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হোপ পুরষ্কার লাভ করেন।এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের আগে ও পরে (India Before and After the Sepoy Mutiny) এবং ভারতবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ লিখে ভারতবর্ষ এবং ইংল্যান্ডে প্রচণ্ড সারা ফেলে দেন।

১৮৮৯ সালে কোলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়নের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করে পরাধীন ভারতবর্ষের বিজ্ঞান শিক্ষায় মন -প্রাণ সমর্পণ করেন। পরে তিনি ১৯১১ সালে বিভাগীয় প্রধান এবং অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।

নিজের বাসভবনে দেশীয় ভেষজ নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে তিনি তার গবেষণাকর্মের সূত্রপাত করেন। তাঁর এ গবেষণাস্থল থেকেই পরবর্তীকালে ১৯০১ সালে 'বেঙ্গল কেমিক্যাল এবং ফার্মাসিটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড' এর প্রতিষ্ঠা হয়। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বাংলায় প্রথম সার্থক রাসায়নিক দ্রব্য এবং ঔষধের কারখানা স্থাপন করেন। প্রতিষ্ঠানটি বাংলা তথা ভারতবর্ষে শিল্পায়নের অগ্রদূত প্রতিষ্ঠান বলা চলে। তাই বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্পায়নে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ প্রসঙ্গে নিজেই বলেছেন যে, তিনি বৈজ্ঞানিকদের দলে বৈজ্ঞানিক, ব্যবসায়ী সামাজে ব্যবসায়ী, গ্রাম সেবকদের সাথে গ্রামসেবক এবং অর্থনীতিবিদ মহলে অর্থনীতিজ্ঞ।

১৯০১ সালে "বেঙ্গল কেমিক্যাল এবং ফার্মাসিটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড" এর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বাংলায় প্রথম সার্থক রাসায়নিক দ্রব্য এবং ঔষধের কারখানা স্থাপন করেন। বেঙ্গল কেমিক্যাল নামক এ প্রতিষ্ঠানটি করোনা চিকিৎসায় প্রাথমিক পর্যায়ে শুধু ভারতবর্ষ নয়, সারা বিশ্বের অন্যতম ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিল।কারণ একমাত্র বেঙ্গল কেমিক্যালসেরই ব্যাপকভাবে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন মূলত ম্যালেরিয়ায় ওষুধ। কিন্তু ২০২০ সালে করোনা মহামারীর চিকিৎসাতে ওষুধটি ব্যবহৃত হয়। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন করোনা চিকিৎসায় ব্যাপক কার্যকর এবং ফলদায়ক বলেই, এ ওষুধটি চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মানুষের প্রাণ বাঁচাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শেষ পর্যন্ত হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নামক ম্যালেরিয়ার ওষুধটি সেসময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছিলেন।

বাংলা ২৫ অগ্রহায়ণ ১৩৩৯ এবং ইংরেজি ডিসেম্বর ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ৭০তম জন্মবার্ষিকী উৎসব। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লিখিত অভিভাষণে প্রফুল্লচন্দ্র রায় সম্প্ররকে যা বলেন তা খুবই গুরুত্ববহ এবং রবীন্দ্রনাথের মানপত্রেই দীপ্ত প্রতিভাসিত হয়ে ওঠে এক নিঃস্বার্থ, কর্মযোগী বিজ্ঞানীর আত্মস্বরূপ ; যে কথাগুলি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রকে জানতে বর্তমানকালেও আমাদের জন্যে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন:

“আমরা দুজনে সহযাত্রী।
কালের তরীতে আমরা প্রায় এক ঘাটে এসে পৌঁচেছি। কর্মের ব্রতেও বিধাতা আমাদের কিছু মিল ঘটিয়েছেন।
আমি প্রফুল্লচন্দ্রকে তাঁর সেই আসনে অভিবাদন জানাই, যে আসনে প্রতিষ্ঠিত থেকে তিনি তাঁর ছাত্রের চিত্তকে উদ্বোধিত করেছেন -
কেবলমাত্র তাকে জ্ঞান দেন নি, নিজেকে দিয়েছেন, যে দানের প্রভাবে ছাত্র নিজেকেই পেয়েছে।

বস্তুজগতে প্রচ্ছন্ন শক্তিকে উদ্‌ঘাটিত করেন বৈজ্ঞানিক, আচার্য প্রফুল্ল তার চেয়ে গভীরে প্রবেশ করেছেন, কত যুবকের মনোলোকে
ব্যক্ত করেচেন তার গুহাহিত অনভিব্যক্ত দৃষ্টিশক্তি, বিচারশক্তি, বোধশক্তি। সংসারে জ্ঞানতপস্বী দুর্লভ নয়, কিন্তু মানুষের মনের
মধ্যে চরিত্রের ক্রিয়া প্রভাবে তাকে ক্রিয়াবান করতে পারেন এমন মনীষী সংসারে কদাচ দেখতে পাওয়া যায়।
উপনিষদে কথিত আছে, যিনি এক তিনি বললেন, আমি বহু হব। সৃষ্টির মূলে এই আত্মবিসর্জনের ইচ্ছা। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের সৃষ্টিও
সেই ইচ্ছার নিয়মে। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে তিনি বহু হয়েচেন, নিজের চিত্তকে সঞ্জীবিত করেচেন বহু চিত্তের মধ্যে। নিজেকে
অকৃপণভাবে সম্পূর্ণ দান না করলে এ কখনো সম্ভব হোত না। এই যে আত্মদানমূলক সৃষ্টিশক্তি ও দৈবীশক্তি। আচার্যর এই শক্তির
মহিমা জরাগ্রস্ত হবে না। তরুণের হৃদয়ে হৃদয়ে নবনবোন্মেষশালিনী বুদ্ধির মধ্য দিয়ে তা দূরকালে প্রসারিত হবে। দুঃসাধ্য
অধ্যবসায়ে জয় করবে নব নব জ্ঞানের সম্পদ। আচার্য্য নিজের জয়কীর্ত্তি নিজে স্থাপন করেছেন উদ্যমশীল জীবনের ক্ষেত্রে, পাথর
দিয়ে নয় -প্রেম দিয়ে। আমরাও তাঁর জয়ধ্বনি করি।

প্রথম বয়সে তাঁর প্রতিভা বিদ্যাবিতানে মুকুলিত হয়েছিল ; আজ তাঁর সেই প্রতিভার প্রফুল্লতা নানা দলবিকাশ করে দেশের হৃদয়ের মধ্যে উদ্বারিত হোলো। সেই লোককান্ত প্রতিভা আজ অর্ঘ্যরূপে ভারতের বেদীমূলে নিবেদিত। ভারতবর্ষ তাকে গ্রহণ করেছেন, সে
তাঁর কণ্ঠমালায় ভূষণরূপে নিত্য হয়ে রইল। ভারতের আশীর্বাদের সঙ্গে আজ আমাদের সাধুবাদ মিলিত হয়ে তাঁর মাহাত্ম্য
উদঘোষণ করুক।”

(রবীন্দ্র রচনাবলী : অষ্টাদশ খণ্ড, প্রবন্ধ ব্যক্তিপ্রসঙ্গ, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, পৃ. ৯৮-৯৯)

১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র মারকিউরাস নাইট্রাইট (HgNO2) আবিষ্কার করেন যা বিশ্বব্যাপী আলোড়নের সৃষ্টি করে। এটি তাঁর অন্যতম প্রধান আবিষ্কার। তিনি মোট ১২টি যৌগিক লবণ এবং ৫টি থায়োএস্টার আবিষ্কার করেন।এছাড়া জৈব ও অজৈব রসায়ন নিয়ে কয়েকটি গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছেন৷ তিনি আরেকজন বাঙালি বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর সাথেও যৌথভাবে কাজ করেছেন। ছাত্র হিসেবে তাঁর কাছ থেকে সরাসরি শিক্ষালাভ করেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহা, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্রচন্দ্র ঘোষ, কুদরত-ই-খুদার মত বিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানীরা।

বিজ্ঞানে বহু মৌলিক আবিষ্কারের কারণে বাংলা এবং ভারতে তাঁর সমসাময়িক প্রায় সকল বিজ্ঞান সভার সভাপতিত্ব করেন।বিশুদ্ধ বিজ্ঞান বিশেষ করে রসায়ন শাস্ত্র ছাড়াও তিনি বহু সামাজিক সমস্যায় আমাদের করণীয়, বর্জনীয় বিষয় নিয়ে লিখে গিয়েছিলেন আমৃত্যু। বিজ্ঞান, অর্থনৈতিক, সমাজভাবনা,সাহিত্য, শিল্প,শিক্ষা, আত্মবিক্ষা, রাজনীতি, রবীন্দ্রনাথ, প্রকৃতি ও পরিবেশ ; কি নেই তাঁর লেখায়। এককথায়, তিনি এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর গবেষণার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তিরূপে ধরা হয়, প্রাচীন ভারতে হিন্দুদের বিজ্ঞান সাধনার ইতিহাসের গ্রন্থ - 'হিস্ট্র অব হিন্দু কেমিস্ট্রি (দুই খণ্ডে) ' এ অমূল্য গ্রন্থটি। একবুক বিস্ময় নিয়ে এ বইটি পড়লাম। ১৯০২ সালে তিনি এ বইটির প্রথম খণ্ড প্রকাশ করেন। কিন্তু আজও সে বই আমাদের হাতের সীমানার বাইরে! এ সকল প্রাচীন গৌরবের তথ্য জানিনা বলেই, আমরা বাঙালিরা দিনে দিনে হতচ্ছাড়া, লক্ষ্মীছাড়া হয়ে যাচ্ছি। আমাদের প্রাচীন গৌরব যদি সঠিকভাবে না জানি, তবে আমাদের মধ্যে স্বাভিমান, আত্মশ্লাঘাবোধ কখনই জাগবে না।

বাংলায় রসায়নের চর্চার আকাঙ্ক্ষায় তিনি ১৯২৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দুইলক্ষ টাকা দান করেছিলেন। সেই সময়ের দুইলক্ষ টাকা আজ হয়ত তা কয়েকশো কোটি টাকা হবে। সারা জীবনব্যাপী বাংলা মায়ের সেবা করেছেন ; বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তো বটেই সাথে সাথে ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি এবং রাজনীতি সহ সকল ক্ষেত্রে । আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ৭৫ বছর বয়সে অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেওয়ার পরও আট বছর বেঁচে ছিলেন। সে সময়ে তিনি থাকতেন, কোলকাতার বিজ্ঞান কলেজের একটি ছোট কক্ষে। শেষ জীবনে তাঁর স্মৃতি শক্তি অনেকটা লোপ পেয়েছিল; স্পষ্ট করে কথা বলতে পারতেন না। এমন কি নিজের বিছানা ছেড়ে উঠে বসতেও পারতেন না। কয়েকজন ছাত্র তাঁকে দেখাশোনা করত।তাদেরই একজনের হাতে মাথা রেখে তিনি ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন মাত্র ৮৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আজ বলতে খুব খারাপ লাগছে যে, তাঁর মাতৃভূমি বাংলাদেশে তিনি তাঁর যোগ্য সম্মান পেয়েছেন এ বিষয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। দেশ এবং জাতির জন্য এত মহৎকর্মের পরেও কেন তিনি তাঁর মাতৃভূমি বাংলাদেশে অবহেলিত। যে মহান ব্যক্তি এদেশে বিজ্ঞান প্রযুক্তির অগ্রনায়ক, তাঁর নামে কি দেশে কোন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। দেশের এতোগুলো বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটিরও নামকরণ হতে পারত তাঁর নামে। অন্ততপক্ষে কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেরও তো নামকরণ করা যেত। কিন্তু হয়নি, এটাই বাস্তবতা। এখানেই কবি নিরব। শুধুমাত্র মুখেমুখেই অমরকাব্য লিখি চলছি আমরা। তাই তিতা হলেও সত্য যে, যতদিন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের মত জ্ঞানবিজ্ঞান সাধকেরা তাঁদের যোগ্যসম্মান না পেয়ে, অবহেলার ধুলোতে পরে থাকবে; ততোদিন এ জাতি, এ দেশ প্রকৃত অর্থে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। নতুন প্রজন্মের সকলকে আহ্বান করব আচার্যের জীবনী এবং রচনাবলী পাঠের, তাহলে কিছুটা হলেও তাঁর অপরিশোধ্য ঋণ শোধ হবে।

ড. কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী

02/08/2026
বৈদিক 'হোতা' শব্দবাংলাভাষায় সংবাদপত্র,গণমাধ্যম সহ আমরা নিজেরাও অজ্ঞানতাবশত প্রতিনিয়ত একটি শব্দ আমাদের যাপিত জীবনে ব্যবহা...
02/08/2026

বৈদিক 'হোতা' শব্দ

বাংলাভাষায় সংবাদপত্র,গণমাধ্যম সহ আমরা নিজেরাও অজ্ঞানতাবশত প্রতিনিয়ত একটি শব্দ আমাদের যাপিত জীবনে ব্যবহার করি, শব্দটি হলো 'হোতা'। হোতা শব্দের প্রধান অর্থ হল, আহ্বানকারী। তিনি কি আহ্বান করেন? তিনি যজ্ঞের আহ্বান করেন এবং যজ্ঞপুরুষ ভগবানকে আহ্বান করেন। আবার ঋগ্বেদের প্রথম মন্ত্রেই অগ্নিরূপ পরমেশ্বরকে হোতা বলে সম্বোধন করে তাঁর কাছে ধনরত্নের কামনা করা হয়েছে। এ অনন্ত ধনরত্ন কোন জাগতিক ধনরত্ন নয়, এ ধন হলো যোগ্য অধিকারী সাধকের মুক্তি।

অগ্নিমীলে পুরােহিতং
যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্।
হােতারং রত্নধাতমম্।।
(ঋগ্বেদ সংহিতা:১.১.১)

"আমি যজ্ঞের পুরােহিত, দেবগণের আহ্বানকারী, ঋত্বিক, প্রভূতপরিমাণ রত্নের ধারণকারী এবং দাতা দীপ্তিমান অগ্নিদেবকে স্তুতি করি।"

বৈদিক যজ্ঞে হোতার মহিমা অপরিসীম। হোতার দক্ষ নেতৃত্বেই সকল যজ্ঞ সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করা হয়। কোন যজ্ঞ সমাধা করতে ষোলজন ঋত্বিকের প্রয়োজন। এ ঋত্বিকের মধ্যে সর্বপ্রথম এবং সর্বপ্রধান হলেন হোতা। বৈদিক এ ষোলজন ঋত্বিক চার প্রকারের বা চারটি গণের।এ চারটি গণ হলেন: হােতৃগণ, উদগাতৃগণ, অধ্বর্যুগণ ও ব্রহ্মাগণ। এর মধ্যে হোতৃগণের চারজন যজ্ঞে ঋগ্বেদীয় মন্ত্রপাঠ করেন। উদগাতৃগণের চারজন উদগাতা, যজ্ঞে বীণা ও বাদ্যযন্ত্রাদি সহযোগে সামগান করেন। অধ্বর্যুগণের অন্তর্ভুক্ত চারজন অধ্বর্যু, যজ্ঞে আহুতি দিয়ে যজ্ঞকর্ম বা পৌরহিত্য সুসম্পন্ন করেন। সর্বশেষ ব্রহ্মাগণের অন্তর্ভুক্ত চারজন ব্রহ্মা, যজ্ঞের সকল বিষয় সুনিপুণভাবে সমাধা হচ্ছে কিনা তা দর্শন করেন। এ যজ্ঞে এ ষোলজন ঋত্বিকের প্রত্যেকেরই স্বতন্ত্র ভূমিকা রয়েছে। বেদাঙ্গে এ ষোড়শ ঋত্বিকের প্রত্যেকের আলাদা আলাদাভাবে নামকরণ করা হয়েছে।

তস্যর্ত্বিজঃ।।
চত্বারস্ ত্রিপুরুষাঃ।।
তস্য তস্যোত্তরে ত্রয়ঃ।।
হােতা মৈত্রাবরুণােঽচ্ছাবাকো গ্রাবস্তুদ্ অধ্বর্যুঃ প্রতিপ্রস্থাতা নেষ্টোন্নেতা ব্রহ্মা ব্রাহ্মণাচ্ছংস্যাগ্মীধ্রঃ
পােতােদ্ গাতা প্রস্তোতা প্রতিহর্তা সুব্রহ্মণ্য ইতি ।।
(আলায়ন-শ্রৌতসূত্র: ৪.১.৪-৭)

চারজন ঋত্বিকের প্রত্যেকেই তিনজন করে সহকারী থাকতেন এবং প্রত্যেক চারজনে এক একটি গণ রচনা করতেন। যেমন:হােতৃগণ, উদগাতৃগণ, অধ্বর্যুগণ ও ব্রহ্মাগণ।

হােতৃগণ :হােতা, মৈত্রাবরুণ, অচ্ছাবাক এবং গ্রাবস্তুৎ।
উদগাতৃগণ: উদগাতা, প্রস্তোতা, প্রতিহর্তা এবং সুব্রহ্মণ্য।
অর্ধ্বর্যুগণ: অধ্বর্যু, প্রতিপ্রস্থাতা, নেষ্টা এবং উন্নেতা। ব্রহ্মাগণ: ব্রহ্মা, ব্রাহ্মাণাচ্ছংসী, পােতা এবং আগ্নীধ্র।

হােতা, পোতা, নেষ্টা, অগ্নীধ্র, প্রশাস্তৃ, অধ্বর্যু এবং ব্রহ্মা -এ ঋত্বিকদের নাম ঋগ্বেদ সংহিতার দ্বিতীয় মণ্ডলে পাওয়া যায়।

তবাগ্নে হােত্রং তব পােত্রমৃত্বিয়ং
তব নেষ্ট্রং ত্বমগ্নিদৃতায়তঃ।
তব প্রশাস্ত্রং ত্বমধ্বরীয়সি
ব্রহ্মা চাসি গৃহপতিশ্চ নাে দমে।।
(ঋগ্বেদ সংহিতা:২.১.২)

যজ্ঞানুষ্ঠানে প্রধান ঋত্বিক হােতাই একাধারে দেবতাদের আহ্বান করতেন এবং দেবতাদের উদ্দেশ্যে আহুতি নিজে প্রদান করতেন বা অর্ধ্বযুকে আহুতি প্রদানে নির্দেশনা দিতেন। হােতৃশব্দের 'হ্বে'-ধাতুর দুটি অর্থের ব্যুৎপত্তি পাওয়া যায়। প্রথমত আহ্বান করা এবং দ্বিতীয়ত আহুতিপ্রদান করা। তবে আহ্বানার্থক অর্থেই শব্দটি বেশী প্রয়োগ করা হয়। যাঙ্কের নিরুক্ত গ্রন্থে ঋগ্বেদের একটি মন্ত্রের (১.১৬৪.১) ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে:
"হােতুঃ হ্বাতব্যস্য"(৪.২৬.২)। অর্থাৎ আহ্বানার্থক 'হ্বে' ধাতু থেকেই হােতৃ শব্দটি নিষ্পন্ন।

ষোলজন ঋত্বিকের প্রধানকে বলা হয় হোতা। তাই হোতা অত্যন্ত পবিত্র এবং সম্মানিত একটি শব্দ। কিন্তু আমরা বর্তমানে নিজেদের অজ্ঞাতসারে হোতা শব্দটিকে ব্যবহারিক জীবনে নেতিবাচক অর্থে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যবহার করছি। কেউ চুরি, ডাকাতি বা ছিনতাই করে ধরা পরলে, আমরা অবলীলায় সেই চোর,ডাকাত এবং ছিনতাইকারীর নেতাকে হোতা বলে সম্বোধন করে ফেলি। আমরা বলি, "চোরের হোতা, ডাকাতের হোতা বা ছিনতাইকারীচক্রের হোতা পুলিশের হাটে আটক হয়েছে, দেশের প্রশাসনের কাছে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই"। কোন দেশদ্রোহী রাজাকার প্রসঙ্গে আমরা বলি যে, "রাজাকারের হোতা অমুখ ব্যক্তিকে ১৯৭১ সালের গণহত্যার কারণে দেশের যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল যুদ্ধাপরাধীদের হোতা হিসেবে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে"। কোন শিশু একটু দুষ্ট হলে, আমরা বলি, "এই ছেলেটাই হলো দুষ্টের হোতা, সে অন্যদের দুষ্টামি করতে প্ররোচিত করছে"।বাংলা ভাষায় কেউ কোন কিছুর নেতৃত্বস্থানীয় বা প্রধান হলেই, তাকে হোতা সম্মোধন করা করা হয়। বৈদিক যজ্ঞের ষোলজন ঋত্বিকের প্রধান এবং সর্বোচ্চ সম্মানিত হোতা শব্দটি কখনই নেতিবাচক শব্দ হিসেবে প্রয়োগ করা উচিতনয়। কিন্তু আমরা নেতিবাচক অর্থে নেতিবাচক শব্দের সাথে যুক্ত করে প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে চলছি।বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক, পরিতাপের এবং নিন্দনীয়।

ড.কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী

শিক্ষাগুরুর ঋণযার থেকে শিক্ষা লাভ করা হয়, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত। মানুষের প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শিক্ষায় নতুন নতুন ভা...
01/08/2026

শিক্ষাগুরুর ঋণ

যার থেকে শিক্ষা লাভ করা হয়, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকা উচিত। মানুষের প্রতিনিয়ত নতুন নতুন শিক্ষায় নতুন নতুন ভাবে জন্ম হয়। শিক্ষার কোন স্থান, কাল বা পাত্র নেই। সকল স্থানেই, সকল কালেই এবং যে কোন ব্যক্তির থেকেই শিক্ষা লাভ করা যায়।শিক্ষাগুরু শিক্ষকের সাথে কোন প্রকার দুর্ব্যবহার বা অকৃতজ্ঞতা করতে নেই। কথাগুলো শাস্ত্রে বহুকাল থেকেই প্রচলিত থাকলেও, সমাজে এর খুব একটা প্রতিফলন দেখতে পাই না। অকৃতজ্ঞতা বর্তমানে একটি রোগে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে সমাজে। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তো বিষয়টি একটি ভয়াবহ রোগে পরিণত হয়েছে। ফেইসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ যাদের থেকে প্রতিনিয়ত শেখে, সুযোগ পেলে তাদেরই সামান্যতম অসম্মান করতে দ্বিধাবোধ করে না। বিষয়টি দুঃখজনক এবং ভয়াবহ। এই কারণে বিদ্যাও তাদের আত্তীকরণ হয় না। প্রতিনিয়ত যা শেখে, তাই আবার ভুলে যায়। বিদ্যা সাময়িক লাভ হয়, কিন্তু সে বিদ্যা দেহের মধ্যে পরিপুষ্ট হয় না। অত্রিসংহিতায় বলা হয়েছে, কোন শিক্ষা গুরু যদি শিষ্যকে এক অক্ষরের শিক্ষা প্রদান করেন, তবে তার প্রতি আমৃত্যু কৃতজ্ঞ থাকতে হয়। শ্লোকটি অত্রিসংহিতার সাথে সাথে চাণক্য শ্লোকেও পাওয়া যায়। অর্থাৎ শিক্ষাগুরুর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার বিষয়টি শাস্ত্রের একাধিক স্থানেই রয়েছে।বাল্যকালে মায়ের দুধপানের ঋণ যেমন কোনদিন শোধ হয় না; পিতার পরিপোষণের ঋণ যেমন পরিশোধ হয় না ; ঠিক তেমনি শিক্ষা গুরুর শিক্ষার ঋণ কখনো পরিশোধ হয় না। জগতে এমন কোন দ্রব্য নেই, যে গুরুর শিক্ষার সমমূল্য হিসেবে তা শিক্ষা গুরুকে প্রদান করে ঋণমুক্তি লাভ করা যায়।

একমপ্যক্ষরং যস্তু গুরুঃ শিষ্যে নিবেদয়েৎ।
পৃথিব্যাং নাস্তি তদ্‌দ্রব্যং যদ্দত্ত্বা হ্যনৃণী ভবেং ॥
একাক্ষরং প্রদাতারং যো গুরুং নাভিমন্যতে ।
শুনাং যোনিশতং গত্বা চাণ্ডালেষ্বপি জায়তে ॥
(অত্রিসংহিতা: ৯-১০)

"গুরু যদি শিষ্যকে এক অক্ষরও শিখিয়ে থাকেন, তথাপি, পৃথিবীতে এমন কোন দ্রব্য নেই, যা সেই শিক্ষা গুরুকে অর্পণ করে শিষ্য ঋণমুক্ত হতে পারে। একাক্ষরের শিক্ষা গুরুকেও যে ব্যক্তি সম্মানিত করে না, সে শতবার কুকুর হয়ে জন্ম গ্রহণ করে, পরবর্তীতে চণ্ডালত্ব প্রাপ্ত হয় বা পতিত হয়।"

একাক্ষর শিক্ষা প্রদানকারী গুরুকেও যে ব্যক্তি সম্মানিত করে না, অত্রিসংহিতায় তাকে তীব্রভাবে নিন্দা জানানো হয়েছে। সাথে এটাও বলা হয়েছে, সেই অকৃতজ্ঞ অপরাধী ব্যক্তি শতবার কুকুর জন্ম লাভ করে পরবর্তীতে চণ্ডালত্ব প্রাপ্ত হয়। এখানে চণ্ডাল বলতে কোন জাতপাত বোঝানো হয়নি। শ্লোকে চণ্ডাল বলতে পতিত ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। শিক্ষা গুরুর প্রতি কৃতজ্ঞতাকারী সেই চণ্ডাল ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র কর্মানুসারে চতুর্বর্ণের যে কোন বর্ণের হতে পারে।

ড. শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী

আচার্য-উপাধ্যায়-ঋত্বিকবর্তমানে গুরুকে কেন্দ্র করে গুরুবাদী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্ত নেই। এই গুরুবাদীদের অধিকাংশ প্রতিষ্...
31/07/2026

আচার্য-উপাধ্যায়-ঋত্বিক

বর্তমানে গুরুকে কেন্দ্র করে গুরুবাদী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্ত নেই। এই গুরুবাদীদের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই বেদ-বেদান্তের চর্চা হয় না। এরা শুধু গুরুর কিছু মতাদর্শের উপরেই আবর্তিত হয়। বর্তমানকালের গুরু এবং গুরুর সুবিধাবাদী অনুসারীরা পবিত্র গুরুদীক্ষার বিষয়টিকে একটি ব্যবসায় পরিণত করেছে। অন্ধ বা সুবিধাভোগী অনুসারীদের কাঁধে ভর করে কোন মতে একটু প্রতিষ্ঠা পেলেই হল। তবেই গুরু ব্যবসা জমজমাট। গুরু নামধারী অনেক ব্যক্তিদের বিভিন্ন প্রকারের সুবিধা নিতে বৈদিক বা শাস্ত্রীয় বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে ব্যবহার করতে ইদানীং দেখা যায়। ধর্ম বা বেদ-বেদান্ত নয়, সরাসরি বা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করাই থাকে তাদের অন্যতম লক্ষ্য। সেই ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে কয়েকটি কথা বলা প্রয়োজন। বর্তমানে গুরুবাচক শব্দ হিসেবে আচার্য, উপাধ্যায়, গুরু এবং ঋত্বিক শব্দগুলো সমার্থক শব্দ হিসেবে প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হলেও, শব্দগুলোর মধ্যে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। শব্দগুলো সম্পূর্ণভাবে এক নয়। সর্বোপরি একটি বিষয় সর্বাগ্রে মাথায় রাখা প্রয়োজন যে, বর্তমানে শিষ্যের কানে কয়েকটি সংস্কৃত শব্দের মন্ত্র প্রদানকারী গুরু এবং প্রাচীনকালের গুরু এক নয়। এদের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। প্রাচীনকালে ছিল গুরুমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা। সেই শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যা শিক্ষার জন্য প্রত্যেকেরই গুরুগৃহে গিয়ে শিক্ষা লাভ করতে হত। অষ্টম থেকে দ্বাদশ বছরের মধ্যেই সাধারণত গুরুগৃহে শিক্ষা লাভের জন্য যেতেই হত। কারণ সকলকেই নুন্যতম দ্বাদশ বছরের মত শিক্ষা লাভ করে পঁচিশ বছর বয়সে গৃহে ফিরে আসতে হত। এরপরে বিবাহ করে গার্হস্থ জীবন শুরু করতে হত। সেই প্রাচীন গুরুগণ শিষ্যকে ৬৪ বিদ্যায় ধীরেধীরে পারদর্শী করে তুলতেন। কিন্তু বর্তমানের গুরুগণ শিষ্যদের কানে কানে একটি মন্ত্র দিয়ে গুরুর দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। তাই বর্তমানকালের এবং প্রাচীনকালের গুরুগণ একই নয়। তবে এদের গুরু শব্দটির নামগত সাদৃশ্য রয়েছে । বর্তমানের গুরুদের আচার্য বলা হয়। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে, আচার্য শুধুমাত্র তাকেই বলা হয় যিনি বিনামূল্যে অবৈতনিকভাবে শিষ্যকে বৈদিক শিক্ষা প্রদান করেন। মনুসংহিতায় আচার্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, যে গুরু শিষ্যকে উপনয়ন প্রদান করে দ্বিতীয় জন্ম প্রদান করেন; যিনি শিষ্যকে গৃহ্যসূত্র, ধর্মসূত্র, শৌতসূত্র শুল্বসূত্র নামক চারপ্রকারের কল্পসূত্রে শিক্ষা প্রদান করেন; যিনি শিষ্যকে রহস্যবিদ্যা বেদান্তের শিক্ষা প্রদান করেন এবং সাধ্যমত বৈদিক শিক্ষা প্রদান করেন সেই নির্লোভ মহত্তম ব্যক্তিকেই আচার্য বলা হয়। এ প্রসঙ্গে মনুসংহিতায় বলা হয়েছে:

উপনীয় তু যঃ শিষ্যং বেদমধ্যাপয়েদ্দ্বিজঃ ।
সকল্পং সরহস্যঞ্চ তমাচার্যং প্রচক্ষতে ॥
(মনুসংহিতা:২.১৪০)

"যে দ্বিজ শিষ্যকে উপনয়ন প্রদান করে উপনীত করে কল্প ও রহস্য সহ বেদ অধ্যয়ন করান, তাঁকে আচার্য বলা হয়।"

শিষ্য যথাযথ বৈদিক জ্ঞান লাভ করুক, এ ছাড়া আচার্যের শিষ্যের কাছে কিছুই প্রত্যাশা করে না। শিষ্যের কোনদিন সাধ্য নেই যে, আচার্যের ঋণ পরিশোধ করতে পারে । কিন্তু বর্তমানকালের আচার্য দাবি করা সকলে না হলেও, অনেক গুরুদের বৈদিক শিক্ষা প্রদানে সাধ্য বা ইচ্ছা দেখা যায় না। পক্ষান্তরে তাদের অনেকেরউ দৃষ্টি থাকে, ধনী ব্যবসায়ী শিষ্যদের পকেটের দিকে। ইনিয়ে বিনিয়ে বিভিন্ন ছদ্মবেশে তারা সেই ধনী শিষ্যদের পকেট খালি করার কৌশল বা অজুহাত খুঁজে বেড়ায়। এমনও অনেক গুরু এবং প্রতিনিধিগণ রয়েছে, যারা প্রচার করে যে, প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে গৃহে খাবার থাক বা না থাক; আচার্য বা গুরুর নামে নিয়মিত টাকা সঞ্চয় করে রাখতে হবে। সেই টাকাটা গুরুর পরিপালনের জন্য। বিষয়টি অত্যন্ত হাস্যকর। শাস্ত্রে গুরুকে তাঁর শিষ্যদের পরিপালন করতে বলা হয়েছে। শিষ্যের সাধ্য নেই গুরুকে পরিপালন করে। শিষ্যের কখনো সাধ্য নেই যে, সে গুরুর বৈদিক জ্ঞান প্রদানেত ঋণ শোধ করতে পারে। তবে এই নব্য গুরুপন্থী ব্যবসায়ীগণ শিষ্যদের পকেট কাঁটতে একটি বৈদিক দৃষ্টান্তকে উপস্থাপন করেন। তা হল, বৈদিক যুগে শিষ্য ভিক্ষা সংগ্রহ করে প্রথমে গুরুকে সমর্পণ করত, তবে নিজে গ্রহণ করত।প্রাচীনকালের শিক্ষা ব্যবস্থা যেহেতু অবৈতনিক ছিল, তাই সকল গুরুগৃহে না হলেও অধিকাংশ গুরুগৃহে শিষ্যকে প্রতিদিন গৃহস্থ গৃহে গিয়ে অন্ন সংগ্রহ করতে হত। শিষ্যদের খাওয়া দাওয়া যেহেতু গুরুগৃহেই করতে হত, তাই শিষ্যকে অন্ন সংগ্রহ করে প্রথমে গুরুকেই সমর্পণ করতে হত। যেহেতু গুরু একাধারে গুরুগৃহকালীন সময়ের প্রধান অভিভাবক এবং বিদ্যাদাতা। তাই ভিক্ষা সংগ্রহের পরে গুরুর উদ্দেশ্যে সমর্পিত হত। পঁচিশ বছর বয়সে যখন গুরুগৃহের শিক্ষা সমাপন হয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হত। শুধুমাত্র সেই সমাবর্তন অনুষ্ঠানেই গুরু শিষ্যের থেকে যৎসামান্য গুরুদক্ষিণা গ্রহণ করতেন। প্রাচীন সেই গুরুগৃহকালীন গুরু-শিষ্যের উদাহরণ দেখিয়ে বর্তমান কালের কয়েকটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক গুরুবাদী প্রতিষ্ঠানের গুরু এবং গুরুর প্রতিনিধিগণ গুরু প্রণামী এবং গুরু পরিপালনের কথা বলে শিষ্যের কাছে প্রতিদিন নগদ অর্থ প্রদান করতে আদেশ করে। যা একজন গুরুর কর্ম নয়। শিষ্যও কথামত গুরু নামক ইষ্টের নামে টাকা সঞ্চয় করে রাখে। পরবর্তীতে গুরুর বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। এক্ষেত্রে এই নব্যগুরুগণ যদি এভাবে নির্দেশনা দিতেন যে, প্রতিদিন গুরুর নামে সাধ্যমত টাকা সঞ্চয় করে মাসের শেষে সেই টাকা আশেপাশের গরীব দুঃখী অসহায় মানুষদের মাঝে বিতরণ করে দিতে হবে। তাহলেও বিষয়টি কিছুটা যৌক্তিক হত। কিন্তু তা না বলে, গুরু যদি সেই সকল সঞ্চিত টাকা মাসের শেষে অথবা বছরের শেষে নিজের বাড়িতে পাঠাতে নির্দেশনা প্রদান করেন; তখন গুরুর নির্লোভ মহত্তম বিষয়টি কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।

যিনি বিনে পয়সায় শিষ্যকে বেদের শিক্ষা প্রদান করেন, তাঁকে আচার্য বলা হয়। বিপরীতে যিনি অর্থের বিনিময়ে বা জীবিকার তাগিদে শিষ্যকে বেদের অংশমাত্র বা ষড়বেদাঙ্গ শিষ্যকে অধ্যয়ন করান, তাঁকে উপাধ্যায় বলা হয়। শিক্ষা, কল্প, নিরুক্ত, ব্যাকরণ, ছন্দ এবং জ্যোতিষ এ ছয়টিকে বেদাঙ্গ বলা হয়। উপাধ্যায়কে আমরা বর্তমান কালের বিদ্যালয়ে, মহাবিদ্যালয় অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে তুলনা করতে পারি। যারা মাসিক বেতন গ্রহণ করে শিষ্য বা ছাত্রদের বিদ্যা প্রদান করেন।

একদেশন্তু বেদস্য বেদাঙ্গান্যপি বা পুনঃ ।
যোহধ্যাপয়তি বৃত্ত্যর্থমুপাধ্যায়ঃ স উচ্যতে ॥
(মনুসংহিতা:২.১৪১)

"যিনি জীবিকার জন্য বেদের অংশমাত্র বা বেদাঙ্গ শিষ্যকে অধ্যয়ন করান, তাঁকে উপাধ্যায় বলা হয়।"

আমরা যে গুরু নিয়ে এত আলোচনা করছি সেই গুরুর সংজ্ঞা এবং কর্তব্য মনুসংহিতায় সুস্পষ্টভাবে দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, বৈদিক বিধানানুযায়ী শিষ্যকে গভাধানাদি কর্ম করেন এবং শিষ্যকে অন্নদ্বারা প্রতিপালন করেন, তাঁকেই গুরু বলা হয়। শাস্ত্রে গুরুকে তাঁর অধিকারী শিষ্যকে অন্নদ্বারা প্রতিপালন করতে বলা হয়েছে। অথচ বর্তমানে আমরা দেখি, সম্পূর্ণ ভিন্নতা। গুরু শিষ্যকে অন্নদ্বারা প্রতিপালন করা দূরে থাক, বরং উল্টো শিষ্য বা আরও নির্দিষ্ট করে বললে ধনী শিষ্যকে বিভিন্ন প্রকারের লোভ এবং ভয়ের আবর্তে ফেলে পকেট খালি করার চেষ্টা করে।

নিষেকাদীনি কমাণি যঃ করোতি যথাবিধি ।
সম্ভাবয়তি চান্নেন স বিপ্রো গুরুরুচ্যতে ॥
(মনুসংহিতা:২.১৪২)

"যিনি নিয়মানুসারে শিষ্যকে গভাধানাদি কর্ম করেন এবং অন্নদ্বারা প্রতিপালন করেন, সেই বিপ্রকে গুরু বলা হয়।"

যিনি প্রার্থীত হয়ে কল্যাণের জন্য তার হয়ে অগ্ন্যাধান, পাকযজ্ঞ ও অগ্নিষ্টোমাদি সকল যজ্ঞ সুনিপুণভাবে যিনি সম্পন্ন করেন, তাঁকে শাস্ত্রে ঋত্বিক্ বলা হয়। ঋত্বিক সকল যজ্ঞ সমাধা করেন।ঋগ্বেদীয় আলায়ন শ্রৌতসূত্র অনুসারে একটি যজ্ঞ করতে ষোলজন ঋত্বিকের প্রয়োজন। বৈদিক এ ষোলজন ঋত্বিক চার প্রকারের বা চারটি গণের।এ চারটি গণ হলেন: হােতৃগণ, উদগাতৃগণ, অধ্বর্যুগণ ও ব্রহ্মাগণ। এর মধ্যে হোতৃগণের চারজন যজ্ঞে ঋগ্বেদীয় মন্ত্রপাঠ করেন। উদগাতৃগণের চারজন উদগাতা, যজ্ঞে বীণা ও বাদ্যযন্ত্রাদি সহযোগে সামগান করেন। অধ্বর্যুগণের অন্তর্ভুক্ত চারজন অধ্বর্যু, যজ্ঞে আহুতি দিয়ে যজ্ঞকর্ম বা পৌরহিত্য সুসম্পন্ন করেন। সর্বশেষ ব্রহ্মাগণের অন্তর্ভুক্ত চারজন ব্রহ্মা, যজ্ঞের সকল বিষয় সুনিপুণভাবে সমাধা হচ্ছে কিনা তা দর্শন করেন। এ যজ্ঞে এ ষোলজন ঋত্বিকের প্রত্যেকেরই স্বতন্ত্র ভূমিকা রয়েছে। বেদাঙ্গে এ ষোড়শ ঋত্বিকের প্রত্যেকের আলাদা আলাদাভাবে নামকরণ করা হয়েছে।

তস্যর্ত্বিজঃ।।
চত্বারস্ ত্রিপুরুষাঃ।।
তস্য তস্যোত্তরে ত্রয়ঃ।।
হােতা মৈত্রাবরুণােঽচ্ছাবাকো গ্রাবস্তুদ্ অধ্বর্যুঃ প্রতিপ্রস্থাতা নেষ্টোন্নেতা ব্রহ্মা ব্রাহ্মণাচ্ছংস্যাগ্মীধ্রঃ
পােতােদ্ গাতা প্রস্তোতা প্রতিহর্তা সুব্রহ্মণ্য ইতি ।।
(আলায়ন-শ্রৌতসূত্র: ৪.১.৪-৭)

চারজন ঋত্বিকের প্রত্যেকেই তিনজন করে সহকারী থাকতেন এবং প্রত্যেক চারজনে এক একটি গণ রচনা করতেন। যেমন:হােতৃগণ, উদগাতৃগণ, অধ্বর্যুগণ ও ব্রহ্মাগণ।

হােতৃগণ :হােতা, মৈত্রাবরুণ, অচ্ছাবাক এবং গ্রাবস্তুৎ।
উদগাতৃগণ: উদগাতা, প্রস্তোতা, প্রতিহর্তা এবং সুব্রহ্মণ্য।
অর্ধ্বর্যুগণ: অধ্বর্যু, প্রতিপ্রস্থাতা, নেষ্টা এবং উন্নেতা। ব্রহ্মাগণ: ব্রহ্মা, ব্রাহ্মাণাচ্ছংসী, পােতা এবং আগ্নীধ্র।

কিন্তু বর্তমানে বঙ্গদেশে ইদানীং দেখা যাচ্ছে ঋত্বিক নামে অনেক স্বয়ং গুরু হয়ে যাচ্ছেন অথবা গুরুর প্রতিনিধি হয়ে গুরুর নামে দীক্ষা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। অথচ শাস্ত্রে ঋত্বিক তাকেই বলা হয়েছে, যিনি যজমানের পক্ষে অগ্ন্যাধান, পাকযজ্ঞ ও অগ্নিষ্টোমাদি যাগ-যজ্ঞ সুসম্পাদিত করেন। বৈদিক যুগের যাগযজ্ঞ সুসম্পন্নকারী ঋত্বিক এবং বর্তমানকালের দেববিগ্রহাদির অর্চনাকারী পুরোহিত অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে মনুসংহিতায় বলা হয়েছে:

অগ্ন্যাধেয়ং পাকযজ্ঞানগ্নিষ্টোমাদিকান্ মত্থান্ ।
যঃ করোতি বৃতো যস্য তস্যর্ত্বিগিহোচ্যতে ॥
(মনুসংহিতা:২.১৪৩)

"যিনি প্রার্থীত হয়ে অর্থাৎ শাস্ত্রী বিধি অনুসারে যাঁকে বরণ করা হয়েছে, সেই ব্যক্তি যখন কারো কল্যাণের জন্য তার হয়ে অগ্ন্যাধান, পাকযজ্ঞ ও অগ্নিষ্টোমাদি যজ্ঞ করেন, তাঁকে শাস্ত্রে ঋত্বিক্ বলে অবিহিত করা হয়।"

যখন গুরু অহৈতুকী কৃপা করে, শিষ্যকে বিনে পয়সায় বেদমন্ত্রের শিক্ষা প্রদান করেন। গুরু বেদের অধ্যাপনের দ্বারা শিষ্যের উভয় কর্ণকে বৈদিক জ্ঞানে আচ্ছাদিত করে তোলেন। তখন সেই মহান উপকার বৈদিক জ্ঞানদাতা গুরুকে একইসাথে মাতা এবং পিতা নামে অবিহিত। এমন কল্যাণকর বৈদিক শিক্ষার গুরুকে একই সাথে পিতামাতা বলে অবিহিত করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গুরু গর্ভধারিণী মাতার মত শিষ্যকে দ্বিতীয় জন্ম প্রদান করেন, তাই তাঁকে মাতা বলা হয়েছে। সদগুরু শিষ্যকে নিজের গৃহে রেখে অথবা বৈদিক জ্ঞান দ্বারা পিতার মত পরিপালন বা পরিপোষণ করেন, তাই তাঁকে পিতা বলা হয়েছে। সকল গুরুকেই পিতামাতা বলা হয় না। যে সকল গুরুর মধ্যে শিষ্যকে দ্বিতীয় জন্ম প্রদান করার অথবা পরিপোষণ করার সাধ্য রয়েছে ; শুধু সে সকল গুরুকেই পিতামাতা তুল্য বলা হয়েছে। বেদ অধিগত হলেও, কখনো তাঁর অপকার করতে নেই। মনুসংহিতায় বলা হয়েছে:

য আবৃণোত্যবিতথং ব্ৰহ্মণা শ্রবণাবুভৌ
স মাতা স পিতা জ্ঞেয়স্তং ন দ্রুহোৎ কদাচন।।
(মনুসংহিতা:২.১৪৪)

"যিনি যথার্থভাবে বেদমন্ত্রের অধ্যাপনের দ্বারা শিষ্যের উভয় কর্ণ আচ্ছাদিত করেন; সেই মহান উপকার একাধারে মাতা এবং পিতা নামে অবিহিত। বেদ অধিগত হলেও, কখনো তাঁর অপকার করবে না।"

ড.কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী

Address

Hanoi

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Dr. Kushal Baran Chakraborty posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Organization

Send a message to Dr. Kushal Baran Chakraborty:

Shortcuts

Share