27/08/2026
আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কৃষি
তৌফিকুর রহমান
সহকারী প্রোগ্রামার, বারটান
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে খাদ্যশস্যের ঘাটতি আমাদের দেশকে আমদানি নির্ভর করে তুলছে। যথেষ্ট ভূমি সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আমাদের খাদ্য শস্যের ঘাটতি মিটছে না। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুসারে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২.৯৬ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করেছে সরকার। এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্যটি খাদ্য ও কৃষি সংস্থার কৌশলগত কাঠামো এর সঙ্গে Four Betters নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। এ চারটি মূল স্তম্ভের একটি হলো উন্নত উৎপাদন- স্মার্ট প্রযুক্তি ও টেকসই পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করে কাঙ্ক্ষিত খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ। তাই বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য হ্রাসমান ভূমির কারণে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষি ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিই নয় বরং বীজ বপন থেকে খাদ্য গ্রহণ পর্যন্ত সকল পর্যায়ে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়া উচিত। উচ্চফলনশীল জাতের পাশাপাশি কৃষি ক্ষেত্রে প্রাচীন পদ্ধতি থেকে আধুনিক পদ্ধতির দিকে ধাবমান না হলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়।
কম্পিউটার ভিশন ও এ. আই. (AI)- এর মাধ্যমে প্রিসিশন এগ্রিকালচার- কম্পিউটার ভিশন খুব মজার একটি প্রযুক্তি। মানুষের যেমন চোখ আছে কম্পিউটারেরও তেমন চোখ থাকতে পারে। আর এই চোখ হচ্ছে ক্যামেরা। চোখ দিয়ে আমরা যেমন দেখি, বুঝতে পারি সামনে কী আছে, তেমনই ক্যামেরা দিয়ে কম্পিউটারও দেখতে পারে ও বুঝতে পারে সামনে কী আছে। আর এই বোঝার কাজটা করে দেয় মেশিন লার্নিং। একটা মানবশিশু জন্মের পর থেকে আস্তে আস্তে দেখে, শেখে কোনটা কী। কোনটা গ্লাস, কোনটা বই, কোনটা মা, কোনটা বাবা। তেমনই মেশিন লার্নিং সিস্টেমে কম্পিউটার আস্তে আস্তে শিখতে পারে কোনটা গাছ, কোনটা মাটি, কোনটা পাতা, কোনটা রোগ, কোনটা সুস্থতা। এই শেখার কাজটা করা হয় অনেক অনেক ডেটা ব্যবহার করে। যেমন কম্পিউটারকে ১০,০০০ ধানের পাতা আর ধান গাছের গোড়ার ছবি দেখিয়ে বলা হলো – "দেখো এটা ধানের পাতা আর এটা ধান গাছের গোড়া"।
কম্পিউটারও ভুল করতে করতে আস্তে আস্তে শিখে গেল কোনটা কী। এখন যদি কম্পিউটারকে বলা হয় ধানে একটু সার দাও, সে অবশ্যই গোড়ায় দেবে পাতায় দেবে না কারণ সে চেনে কোনটা পাতা আর কোনটা গোড়া। শুধু তাই নয়, পাতা দেখে রোগ চেনা শিখে গেলেও রোগ হিসেবে কীটনাশক প্রয়োগও করে দিতে পারবে। ফসল দেখে ফসলও চিনতে পারে। তাহলে কম্পিউটারকে বলে দিলে সে একজন এক্সপার্টের মতো কাজ করে দেবে। এবং সেই কাজ হবে স্বয়ংক্রিয় এবং নিরবচ্ছিন্ন। আর এখন কম্পিউটার বলতে বড় বাক্স নয়, আরডুইনো আর রাসবেরি পাই এর মতো হাতের তালুর থেকেও ছোট কম্পিউটার বর্তমানে আছে যা দিয়ে ছোট ছোট রোবট, ড্রোন তৈরি করা যায়। এসব দিয়ে সঠিক রোগ, সঠিক ফসল, সঠিক স্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এভাবেই কাজ করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই। উন্নত দেশে সারের অপচয় হয় না বা সুস্থ ধানেও কীটনাশক ব্যবহার হয় না। কারণ রোবট রোগাক্রান্ত গাছ চিনে খুঁজে বের করে সেখানেই কীটনাশক প্রয়োগ করে। কোন ফল বা ফসল হারভেস্ট করতে হবে তাও রোবট দিয়ে চিহ্নিত করে রোবট দিয়েই হারভেস্ট করা যায়। এই গেল কম্পিউটারের চোখের কাজ। কম্পিউটারের তাহলে চোখ যেমন আছে তেমন নাক-কান এসবের মতো ইন্দ্রিয় থাকলে কেমন হয়? আছেই তো।
সেন্সর ও কৃষি প্রযুক্তি- বিভিন্ন ধরনের সেন্সর-ই কম্পিউটারের ইন্দ্রিয়। উপরে আলোচিত ক্যামেরাও এক ধরনের সেন্সর, অপটিক্যাল সেন্সর। আরও কিছু সেন্সর কৃষিতে ভূমিকা রাখে, যেমন আর্দ্রতা মাপার জন্য হিউমিডিটি সেন্সর। মাটি বা বাতাসের আর্দ্রতা কম্পিউটারকে বোঝানোর জন্য এই সেন্সর। কম্পিউটার যদি পাম্প চালু করতে পারে, বন্ধ করতে পারে তাহলে তার জানার দরকার কখন চালু করতে হবে বা বন্ধ করতে হবে। এভাবে পানি সম্পদেরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। এই নির্ধারণটাই করে সেন্সর দিয়ে। আর্দ্রতা হ্রাস বৃদ্ধি ফসল সংরক্ষণের সাথেও জড়িত। মাছের পুকুরে সেচের পাম্পের সাথে একটা পিএইচ সেন্সর লাগিয়ে দিলেও পিএইচ এর ওপর নির্ভর করে পাম্প চালু বা বন্ধ হবে।
ড্রোন এবং রোভার প্রযুক্তি ও কৃষি- ড্রোন ব্যবহার করে কৃষি কাজ বিভিন্ন দেশে এখন অনেক জনপ্রিয়। এর কারণ সহজ ও দ্রুত উপায়ে বীজ, সার, সেচ ও কীটনাশক প্রয়োগ। ফসল নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও কম এবং কর্মদক্ষতাও বেশি। দুর্গম স্থানে বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত ড্রোন এবং রোভার দিয়ে করা সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূল এলাকায় ভাসমান কৃষিতে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার অভাবনীয় পরিবর্তন আনতে পারে। ড্রোন ব্যবহার করে কৃষি ক্ষেত্রে সার্ভিলেন্স এর কাজও করা যায়। চীনে ড্রোন একটি নিত্যব্যবহার্য কৃষি উপকরণে পরিণত হয়েছে। রোভার হচ্ছে মানববিহীন রিমোট কন্ট্রোল বা স্বয়ংক্রিয় গাড়ি যা সহজে উঁচুনিচু স্থানে চলতে পারে। কৃষিতে রোভার ব্যবহার করে ফসল সংগ্রহ করা যায়। এআই ব্যবহার করে রোভারকে পাকা ফল চিনিয়ে দিলে এবং রোবোটিক আর্ম লাগিয়ে দিলে সে একাই ফল তুলে আনতে পারবে। এছাড়াও রোভারে বিভিন্ন মেকানিক্যাল ইকুইপমেন্টস লাগিয়ে দিলে এবং অ্যালগরিদম সেট করে দিলে সে দ্রুত কৃষি কাজ করে দিতে পারবে।
জি.আই.এস. প্রযুক্তি ও কৃষি- স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা। সহজ কথায়, এটি এমন একটি প্রযুক্তি যা মানচিত্র এবং বিভিন্ন ডাটা বা উপাত্ত ব্যবহার করে মাটির গুণাগুণ, আবহাওয়া এবং ফসলের অবস্থা বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে। এর ফলে সামগ্রিকভাবে কৃষি উৎপাদন পর্যবেক্ষণ, প্লাবনের পরিমাণ, ক্ষতির পরিমাণ বিশ্লেষণ করা সম্ভব। এর সাথে মেশিন লার্নিং যুক্ত থাকায় সম্ভাবনা ভিত্তিক অনুমান প্রদান করা যায়। যেমন এ বছর বোরো ধানের উৎপাদন কেমন হতে পারে বা বন্যায় কী পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে তা স্যাটেলাইট ছবি এবং ডেটার মাধ্যমে অনুমান করা যায়। এর ফলে নীতি নির্ধারণ পর্যায়েও সুবিধা পাওয়া যায়। আমদানি রপ্তানির আগাম হিসাব করে ফেলা যায়। শুধু তাই নয় খরা বা ভাইরাসজনিত মহামারী চিহ্নিত করে সে অনুসারে সরকারি পর্যায়ে ব্যবস্থা নিতেও এই প্রযুক্তি সাহায্য করতে পারে।
স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম- পশুপালন থেকে শুরু করে মাছ চাষ সকল স্থানে স্মার্ট মনিটরিং এর ব্যবহার করলে উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোগ বা বিক্রয় পর্যন্ত কর্মদক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়। স্মার্ট মনিটরিং অবজেক্ট ডিটেকশন এবং প্যাটার্ন বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্ষতিকারক পাখি, পতঙ্গ, পোকা ডিটেক্ট করে তা তাড়ানোর মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়। পশুপালনে পশু বা পাখির স্বাস্থ্য এবং সার্বিক অবস্থা ক্যামেরার মাধ্যমে দূর থেকে মনিটরিং করা যায়। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা স্মার্ট মনিটরিং সহজে আইডেন্টিফাই করতে পারে এবং এলার্ম এর মাধ্যমে জানাতে পারে। দূর থেকে মোবাইলে সেই নোটিফিকেশন পাঠিয়ে কৃষকের দৃষ্টিগোচর করাতে পারে। বিভিন্ন ধরনের হেলথ ট্যাগ বা ডিভাইস পাওয়া যাচ্ছে এখন যা গবাদি পশু বা হাঁস মুরগির দেহে স্থায়ীভাবে লাগিয়ে রেখে দূর থেকে মনিটরিং করা যায়।
এসব হেলথ ডিভাইসের প্রাণীর দেহের স্বাস্থ্যগত অবস্থার ডেটা নিরবচ্ছিন্নভাবে সংগ্রহ করে এবং ক্লাউডে জমা রাখে। কোনো অস্বাভাবিক ডেটার মান দেখতে পেলে সেটা পর্যবেক্ষকের বা কৃষকের মোবাইলে নোটিফিকেশন আকারে পাঠিয়ে দিতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ডিভাইসটি সবসময় তাপমাত্রা মাপে। যদি স্বাভাবিকের থেকে বেশি তাপমাত্রা পায় তাহলে সেটা সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিফাই করবে।
মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন- বাজার ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে পণ্যের প্রাপ্ততা নিশ্চিত করতে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ভিত্তিক বিপণন অনেক ক্ষেত্রে দেশেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে সরকারি উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। ক্লাউড ভিত্তিক সেবা চালু থাকলে দাম ও প্রাপ্ততার ওঠানামা উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে নিশ্চিত করা যায়। সিন্ডিকেটের অপচেষ্টা রুখে দেওয়া সম্ভব। জিপিএস লোকেশন ভিত্তিক বাজার, চাষি, ফার্মারের তথ্য, মজুদ ও দামের বিষয়ে সরাসরি আপডেট দেওয়ার ব্যাবেস্থা থাকলে কৃষি পণ্যের বণ্টন সহজ হবে এবং পোস্ট প্রোডাকশন লস কমে আসবে। বর্তমানে মোবাইল ও ইন্টারনেট কৃষক পর্যায়েও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। এই দিকটা বিবেচনা করে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ভিত্তিক প্রযুক্তির উত্তরণ ঘটাতে হবে এবং এর সর্বোচ্চ সুযোগ নিতে হবে। বাংলাদেশে গৃহীত কৃষি প্রযুক্তির উদ্যোগের মধ্যে এই দিকটিতেই বেশি অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কৃষিকে আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তর সহজ না হলেও অবশ্যকরণীয়। আমাদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো আছে, এর সাথে দরকার প্রযুক্তির সংযোজন। যেমন পাম্প আছে এর সাথে দরকার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বিনিয়োগ দরকার, দরকার কৃষককে হাতে কলমে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সাক্ষরতা অর্জন করতে হবে। প্রযুক্তিকে ভয় নয় বরং একে সম্ভাবনার উৎস মনে করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে প্রারম্ভিক পর্যায়ে খরচ বেশি হলেও পরবর্তীতে তা অনেক কমে যায় এবং কর্মদক্ষতা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এজন্য শুরুতে দরকার সরকারি সাহায্য। স্তিমিত কৃষি বিপ্লব প্রযুক্তির ছোঁয়ায় জেগে উঠুক এই আমাদের প্রার্থনা।
-ফলিত পুষ্টি বার্তা, জুলাই '২৬ সংখ্যা হতে সংগৃহীত।