26/03/2026
হরমুজ প্রণালী না খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) প্রণালী?!
**** ****
লিখেছেন: Ahmad Ali
সাম্প্রতিক সময়ে মুহতারাম শাইখ আবু বকর মুহাম্মদ যাকারিয়া (হাফি.)-এর 'ইরানীদের তথ্যবিকৃতি' শিরোনামে একটি পোস্টে দাবি করা হয়েছে যে, বর্তমানের “হরমুজ প্রণালী”-এর প্রকৃত নাম ছিল “খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) প্রণালী” এবং পরবর্তীতে ইরানিরা ইতিহাস বিকৃত করে এর নাম পরিবর্তন করে।
বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনার দাবি রাখে; কারণ ইতিহাস ও ভূগোল—উভয় ক্ষেত্রেই প্রামাণ্যতার প্রশ্ন এখানে জড়িত।
প্রথমত,
বিশ্বমান্য ভূগোল ও ইতিহাসে প্রণালীটির স্বীকৃত নাম “হরমুজ প্রণালী” (مضيق هرمز)। এই নামটি ইরানের উপকূলবর্তী ঐতিহাসিক হরমুজ দ্বীপ ও বন্দরনগরী থেকে উদ্ভূত, যা মধ্যযুগে পারস্য উপসাগরীয় বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে সুপরিচিত ছিল।
১৩শ শতাব্দী থেকে আরবি, ফারসি ও ইউরোপীয় মানচিত্রে এই নাম সুপ্রতিষ্ঠিতভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এমনকি প্রাচীন আরবি ভৌগোলিক সাহিত্য ও ইতিহাসগ্রন্থেও “হরমুজ” (هرمز) একটি সুপরিচিত স্থাননাম হিসেবে বারবার উঠে এসেছে। ইমাম তাবারী “ناحية هرمز من سواحل بحر فارس” বলে এটিকে পারস্য উপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন; আল-মাসউদী “من ناحية هرمز” বলে পারস্য সাগর থেকে ভারত মহাসাগরে প্রবেশপথ নির্দেশ করেছেন।
একইভাবে ইবন হাওকাল, ইয়াকূত আল-হামাভী ও আল-ইদ্রিসী—সকলেই হরমুজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, দ্বীপ বা প্রবেশদ্বার হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এসব বর্ণনা একত্রে বিবেচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে,
“হরমুজ” নামটি প্রাচীনকাল থেকেই একটি প্রতিষ্ঠিত ভৌগোলিক পরিচয় বহন করে এবং সেই সূত্রেই সংশ্লিষ্ট জলপথ “হরমুজ প্রণালী” (مضيق هرمز) নামে পরিচিতি লাভ করে।
(আমার অনুসন্ধানমতে) উল্লেখযোগ্যভাবে এসব প্রাচীন আরবি ইতিহাস বা ভৌগোলিক প্রামাণ্য গ্রন্থে কোথাও ‘খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) প্রণালী’ নামে কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না; বরং সর্বত্র ‘হরমুজ’ নামটিই ধারাবাহিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা এ নামের ঐতিহাসিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রামাণ্যতাকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কিছু গবেষকের মতে, সাসানীয় যুগ (৩য়–৭ম শতাব্দী) থেকেই এ নামটি ওই অঞ্চলে প্রচলিত ছিল।
দ্বিতীয়ত,
আলোচ্য পোস্টে যে ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে—খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) ও পারস্য সেনাপতি হরমুজের দ্বন্দ্বযুদ্ধ—তা ইসলামের ইতিহাসে স্বীকৃত একটি ঘটনা। এটি সংঘটিত হয় ১২ হিজরিতে (৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে), ইরাক অঞ্চলে “যাতুস-সালাসিল” যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।
তবে এ ঘটনাস্থল ও হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। হরমুজ প্রণালী অবস্থিত ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী অঞ্চলে, পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখে; অন্যদিকে উক্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয় দক্ষিণ ইরাক ও কুয়েত সংলগ্ন এলাকায়। ফলে একটি নির্দিষ্ট স্থলযুদ্ধের ঘটনাকে একটি ভিন্ন অঞ্চলের সামুদ্রিক প্রণালীর নামকরণের সাথে যুক্ত করা ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে কতটা সংগত—সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে।
তৃতীয়ত,
প্রামাণ্য ইতিহাসগ্রন্থ—যেমন তাবারী, ইবনুল আসীর বা ইবন কাসীর—কোথাও উল্লেখ পাওয়া যায় না যে, হরমুজ প্রণালী কখনো “খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) প্রণালী” নামে পরিচিত ছিল বা মুসলিমরা এ নামে অভিহিত করেছিলেন। এসব গ্রন্থে যুদ্ধের বিবরণ থাকলেও ভৌগোলিক নামকরণ সম্পর্কে এ ধরনের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না।
চতুর্থত,
ইরানিরা প্রাসঙ্গিক ইতিহাস বিকৃত করে এ নাম পরিবর্তন করেছে—এই অভিযোগটিও প্রমাণের দাবি রাখে।
বাস্তবতা হলো, “হরমুজ” নামটি শুধু ইরানি উৎসেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং আরবি, ফারসি, লাতিন এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক নৌ-মানচিত্র—সবখানেই একই নামে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কাজেই এটিকে এককভাবে কোনো জাতির আরোপিত বিকৃতি বলা সতর্ক বিবেচনার বিষয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না,
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.) ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য বীরত্বের প্রতীক। তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে গভীর শ্রদ্ধা ও গৌরবের দাবি রাখে।
তবে সেই গৌরবকে তুলে ধরতে গিয়ে যদি ইতিহাসসম্মত নয় এমন কোনো দাবি যুক্ত করা হয়, তাহলে তা অনিচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে।
একইভাবে কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর ঐতিহাসিক বিচ্যুতি বা বিকৃতির সমালোচনা করতে হলে তা অবশ্যই সুপ্রতিষ্ঠিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতেই হওয়া প্রয়োজন—এটাই বস্তুনিষ্ঠতা ও গ্রহণযোগ্যতার দাবি।
ইরানীদের আকীদাগত ও ঐতিহাসিক নানা বিতর্ক ও বিচ্যুতি সম্পর্কে যথেষ্ট আলোচনা রয়েছে—এটিও অস্বীকারযোগ্য নয়।
তবে সেসব বিচ্যুতি খণ্ডন করতে গিয়ে যদি এমন তথ্য উপস্থাপন করা হয়, যা নিজেই ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়, তাহলে সে প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হওয়ার পরিবর্তে উল্টো দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য বলে প্রতীয়মান হবে এবং সহজেই প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।