09/07/2026
স্মৃতিতে সাতকানিয়া কলেজ থেকে গারাংগিয়া তরিকত
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬, দৈনিক পূর্বকোণ Dainik Purbokone
১৯৬৬ সালে বাঁশখালী বাড়ীর সামনে আব্বাজানের প্রতিষ্ঠিত বৈলছড়ী নজমুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস.এস.সি পাস করি। এসএসসি পাস করার পর আশা ছিল আগ্রাবাদ কমার্স কলেজে ভর্তি হব। বড় ভাই অভিভাবক আলহাজ্ব নুরুল ইসলাম চৌধুরী সাতকানিয়া কলেজে গভর্নিং বডির মেম্বার। অধ্যক্ষ শ্রদ্ধাভাজন আবুল খায়ের চৌধুরীর সাথে বড় ভাইয়ের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। আমাদের সময় মার্চে এসএসসি পরীক্ষা, জুনের প্রথম দিকে রেজাল্ট। অতঃপর কলেজে ভর্তি হওয়া সবকিছু নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে। এখানে সাতকানিয়া কলেজে কমার্স বিভাগে ভর্তি হয়ে হোস্টেলে থাকতাম। শিশুকাল থেকে ধর্মের সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে। সাতকানিয়া কলেজ হোস্টেলে অবস্থান নেয়ার পর সহপাঠী ছাত্ররা, ক্যান্টিনের স্টাফরা, স্থানীয় সওদাগরেরা তথা স্থানীয়ভাবে সকলের মাঝে গারাংগিয়া সুপারিনটেনডেন্ট ছাহেব হুজুর আলোচিত পরিচিত শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। একজন কামেল ব্যক্তিত্ব হিসেবে সকলের নিকট মনের গভীর থেকে অতি উচ্চ মযার্দার ব্যক্তিত্ব হিসেবে জানা।
এতে আমারও কৌতূহল জাগে গারাংগিয়া গমন করে তার সান্নিধ্য লাভ করতে। আমাদের কলেজ থেকে গারাংগিয়ার দূরত্ব হয়তো সবোর্চ্চ ৩/৪ কি.মি হবে। ঐ সময় দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটা সেকেলে পদ্ধতিতে বলা যাবে। কয়েক কি.মি হলে পায়ে হেঁটে যাতায়াত, অথবা সাইকেল বা রিকশায়। তখন ইঞ্জিনচালিত গাড়ির ব্যাপক প্রচলন ছিল না।
সচ্ছল প্রায় সব পরিবারেই সাইকেল ছিল। সাতকানিয়া কলেজে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার ছাত্র হবে। যেহেতু কর্ণফুলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত কলেজ ছিল দুইটি। প্রথম বোয়ালখালী কানুনগোপাড়া কলেজ অতঃপর এই সাতকানিয়া কলেজ। পটিয়া ও কক্সবাজার কলেজ প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও ছাত্র/অভিভাবকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে আরও সময় নেয়। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও পূণার্ঙ্গতা পেতে সময় লাগছিল। স্থানীয়দের পাশাপাশি ছাত্রদের কল্যাণে সাতকানিয়া উপজেলা সদরের প্রায় ১০/১৫ জন সওদাগর মূল ব্যবসার পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের নিমিত্তে ৫/৭ টি সাইকেল এনে দোকানের সামনে রাখে। একটার সাথে আরেকটা লাগিয়ে রেখে দেয়। স্থানীয়দের পাশাপাশি ছাত্ররা এই সব সাইকেল নিয়ে দূর যাত্রায় যাতায়াত করে। ভাড়া একবেলা বা একদিনব্যাপী আট আনা বা এক টাকা। ১৯৮০ এর দশকের আগ পর্যন্ত গারাংগিয়া হযরত বড় হুজুর (রহ.) কে গারাংগিয়া মাদ্রাসা প্রধান হিসেবে সুপারিনটেনডেন্ট ছাহেব হুজুর সম্বোধন করা হয়। হযরত ছোট হুজুর (রহ.) গারাংগিয়া মাদ্রাসার প্রধান তথা হেড মাওলানা হিসেবে আউয়াল ছাহেব হুজুর সম্বোধন করা হয়।
ফজরের নামাজ পড়ে চলে আসতাম কলেজ গেইটের বিপরীতে ক্যান্টিনে। এখানে রয়েছে ২/৩ টি ক্যান্টিন। দুপুর ও রাতের খাবার হোস্টেলের ডাইনিং রুমে। কিন্তু সকাল—বিকেলের নাস্তা ক্যান্টিনে এসে নগদ পয়সায় খেতে হয়। কলেজের ছাত্ররা ক্যান্টিনে এসে সকালের নাস্তা করত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুইটি পরোটা ২ আনা। ১ কাপ চা ১ আনা। কোন দিন অতিরিক্ত সুজির হালুয়া করলে অতিরিক্ত আরেক আনা। চা নাস্তা করার পর চলে যেতাম ৩/৪ শ’ মিটার পশ্চিমে উপজেলা সদরে। একবেলার জন্য একটি সাইকেল ভাড়া নিয়ে ১০/১২ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যেতাম গারাংগিয়া। সাইকেলগুলো থাকত নতুন চকচকে তকতকে। যৌবনকাল, উঠতি বয়স, ৩/৪ কি.মি অতিক্রম করতে মনে হয় ১০/২০ মিনিট মত সময় লাগত। ডলু নদীর পূর্বপাড়ে এক বাড়ীর পাশে সাইকেল রেখে দিতাম। তখন দেশে এখনকার মত চোর ছিল না, আইনের শাসন ছিল। কাজেই সাইকেল রেখে আসতে চিন্তিত থাকতাম না। বর্ষাকালে হলে নৌকায়, শুকনো মৌসুমে হলে পায়ে হেঁটে ডলু নদীর পশ্চিম পাড়ে হযরত বড় হুজুর কেবলা তথা সুপারিয়েন্টটেন্ট হুজুর স্বাক্ষাৎ কামনা করতে আসতাম। হযরত বড় হুজুর কেবলাকে ঘরে প্রায় একা পেতাম। যেহেতু দূর—দুরান্ত থেকে স্বাক্ষাতের জন্য লোকজন আসতে সময় লাগবে স্বাভাবিক। হযরত বড় হুজুর কেবলার পাশে বসে ধমীর্য় নানা বিষয়ে আলাপ করতাম। হুজুরও আমাকে স্বাচ্ছন্দ্যভাবে উত্তর দিতে থাকেন। কোন সময় বিরক্তি অনুভব হয়নি। ঘরে বানানো কিছু না কিছু খেতে দিতেন, সাথে এক গ্লাস পানি। হুজুরের সান্নিধ্যে কিছুটা সময় দেয়ার পর কলেজ হোস্টেলে ফিরে আসতাম।
সপ্তাহে ২/৩ বার যাওয়া হত। প্রায় ৫/৭ মাস বা কম বেশি সময়ের ব্যবধানে হযরত বড় হুজুর (রহ.)’র সাথে মোলাকাত করে ফিরে আসবার সময় ডলুনদীর পশ্চিমপাড়ে বালিয়াড়ি পার হয়ে পানিতে নামতে হবে। এমন সময় দেখতে পেলাম নদীর পূর্বপাড়ে আমার চাচাতো বোনের স্বামী মাওলানা আবদুস সালাম। তার বাড়ি লোহাগাড়া উপজেলা সদরের পূর্বপাশে। তাকে দেখে আমি বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি পানির ভিতর দিয়ে পশ্চিমপাড়ে আসলেন। আমি তাকে দেখে কৌতুহলী হই, তিনিও আমাকে দেখে কৌতূহলী হন। তিনি আমার থেকে জানতে চাইলেন কোথায় গিয়েছিলাম। আমি বললাম সুপারিয়েন্টটেন্ট ছাহেব হুজুরের সাথে মোলাকাত করতে গিয়েছিলাম। তৎক্ষণাৎ তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন আউয়াল ছাহেব হুজুরের নিকট গিয়েছিলাম কিনা। আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম কোন আওয়াল ছাহেব হুজুর। তিনি পুনঃ প্রশ্ন করলেন তুমি গারাংগিয়া মাদ্রাসায় যাওনি। আমি পুনঃ প্রশ্ন করলাম কোন গারাংগিয়া মাদ্রাসা, কোথায়। তখন তিনি আমাকে সাথে নিয়ে গারাংগিয়া মাদ্রাসার দিকে নিয়ে গেলেন। মাদ্রাসার বারান্দায় থাকতে জানালা দিয়ে হযরত ছোট হুজুর (রহ)কে দেখিয়ে আমাকে বললেন, উনি সুপারিয়েন্টটেন্ট ছাহেব হুজুরের ছোট ভাই আউয়াল ছাহেব হুজুর। তখন হয়ত সকাল ৮ টা ৯ টা হবে। হুজুর মাদ্রাসা অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন। ঐ মুহূর্তে একাই ছিলেন মনে হয়। ভগ্নিপতি আমাকে নিয়ে অফিসে প্রবেশ করলেন। আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হুজুরকে বললেন; ইনি আমার জেঠা শ্বশুর খান বাহাদুর ছাহেবের বেঠা। কলেজে পড়ি ১৬/১৭ বছরের যুবক। ছোট হুজুর (রহ.) আমাকে সম্মান করলেন। দাঁড়িয়ে মোলাকাতে হাত বাড়িয়ে দিলেন। টেবিলের উত্তরপাশে দক্ষিণমুখী হুজুরের চেয়ার। তিনি আমাকে বাম কি ডান দিকে বসতে ইশারা করলেন। চা নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করালেন আমরা উভয়কে। আমার আব্বাজানের বিষয় নিয়ে নানান আলোচনা করলেন। এরপর থেকে যতবার গারাংগিয়া যাওয়া হয় প্রথমে হযরত বড় হুজুর (রহ.)’র সাথে বাড়িতে মোলাকাত করি, অতঃপর হযরত ছোট হুজুর (রহ.)’র সাথে মোলাকাত করতে গারাংগিয়া মাদ্রাসায় যেতাম।
এভাবে যাওয়া—আসা করাকালীন সহপাঠী স্থানীয় ছাত্ররা বলছিলেন গারাংগিয়া সুপারিয়েন্টটেন্ট ছাহেব হুজুর পীর ছাহেব। তখন পীর কি, তরিকত কি, বুঝতাম না। ঐ সময় মাদ্রাসা প্রধানকে সুপারিয়েন্টটেন্ট ছাহেব, হেড মাওলানাকে আওয়াল ছাহেব বলা হত জানা বা ধারণা ছিল না। ঐ দিকে গারাংগিয়া মাদ্রাসা রয়েছে হুজুরের ভাই আউয়াল ছাহেব হুজুর গারাংগিয়া মাদ্রাসা পরিচালনা করছেন তাও আমার জানা ছিল না। ডলু নদী পার হয়ে পূর্বপাড় থেকে পশ্চিমপাড়ে আসতেই হযরত বড় হুজুর (রহ.)’র বাড়ীর দিকে আমার দৃষ্টি থাকত। এভাবে গারাংগিয়া যাওয়া—আসা করতে করতে একদিন হযরত বড় হুজুর (রহ)’র মুরীদ হয়ে যাই।
প্রায় ৬০ বছর আগের বিষয়। সাতকানিয়া কলেজ দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় আলাদা অবস্থান ছিল। যোগ্য অধ্যক্ষ, বাঘা বাঘা শিক্ষক, দেড় দুই হাজার ছাত্র নিয়ে এই কলেজের আলাদা একটি অবস্থান ছিল। কলেজ থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে ডলুনদীর পূর্বপাড় দিয়ে গারাংগিয়া মাদ্রাসার দূরত্ব সবোর্চ্চ ৩/৪ কি.মি হবে। হযরত বড় হুজুর (রহ.) মোহসেনিয়া মাদ্রাসা (হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ) থেকে ফাজিল পাস করার পর চেয়েছিলেন ভারতে গিয়ে আরও উচ্চতর ডিগ্রি নিতে। কিন্তু পিতা ইন্তেকাল করে গেছেন ছোট ছোট ভাই বোন নিয়ে অসহায় আম্মাজান। এতে আর ভারতে যাওয়া হল না। নিজ বাড়ির নিকটে ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠাতা করেন গারাংগিয়া মাদ্রাসা।
১৯৬০ এর দশকে সাতকানিয়া কলেজ থেকে গারাংগিয়া যাওয়া—আসা করতেছি। তখন উত্তরপাশে ৬০/৭০ ফুট দক্ষিণমুখী একতলা দালান ছিল। বাকি মসজিদ, খানকাহ, মাদ্রাসা, গৃহ, হোস্টেল যাবতীয় অবকাঠামো মাটির দেয়াল টিনের ছাউনী। কিন্তু গারাংগিয়া মাদ্রাসার অবস্থান ছিল দেশের এই অঞ্চলে অকল্পনীয় অসাধারণ। হযরত বড় হুজুর (রহ.) পরবতীর্ ছোট হুজুর (রহ.) খুলসিয়ত রূহানিয়তে এই মাদ্রাসা থেকে হাজার হাজার বাঘা বাঘা আলেম বের হয়েছে। তারা হযরত বড় হুজুর (রহ.)’র মুরীদ হবার সৌভাগ্য লাভ করেন। এই সব হাজার হাজার আলেম ছাত্র, মুরীদগণ থেকে যাচাই—বাছাই করে ৭৮ জনকে খেলাফত দানে ভূষিত করেন। গারাংগিয়া হুজুরেরা ৩ ভ্রাতা। তৎমধ্যে মেজো হুজুর হযরত শাহ মাওলানা হাফেজ আবদুল লতিফ (রহ.)। তাঁর ইন্তেকাল নিয়ে রয়েছে অলৌকিকত্ব। ১৯৬৭/৬৮ সাল থেকে একটানা দীর্ঘ সময় আমার গারাংগিয়া যাওয়া—আসা হয়ে আসছে।
১৯৭৭ সালে ২১ অক্টোবর আমার পীর ছাহেব কেবলা ইন্তেকাল করেন। তাঁর রয়েছে হাজার হাজার আলেম, মুরিদ ছাত্র। কিন্তু ইন্তেকালের দীর্ঘ ২৫ বছর পার হয়ে গেলেও জীবনীগ্রন্থ লেখা হয়নি। পীরজাদা শাহ মাওলানা আনওয়ারুল হক সিদ্দিকীর অতীব আগ্রহ আমাকে উদ্ভুদ্ধ করায় ২০০৩ সালে ৪৩২ পৃষ্টাব্যাপী এই মোবারক জীবনীগ্রন্থ লেখার সৌভাগ্য হয়। সবোর্চ্চ চেষ্টা করেছি যাচাই—বাছাই করে কলম ধরতে। পরপর তিনবার পুনঃপ্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থ গারাংগিয়া তরিকত পেরিয়ে আজমগড়ী সিলসিলা তো বটেই, সকল মতাদর্শের কাছে অতীব গ্রহণযোগ্য।
তরিকতের খেদমত করতে গিয়ে আরও লেখার সৌভাগ্য হয়, মক্তুবাতে হামেদী—মজিদী, আয়নায়ে দরবারে গারাংগিয়া, ওয়াইসী হয়ে আজমগড়ী সিলসিলা, সৈয়দ আবদুল বারী (রহ.) আল হাসানী ওয়াল হোসাইনী গ্রন্থ। তেওয়ারি হাটে তরিকতের ভাই আলমগীর সাহেবের সহযোগিতায় বাবে দরবারে গারাংগিয়া গেইট গারাংগিয়া তরিকতের অন্যতম প্রবেশ পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সাতকানিয়া কলেজে ১৯৬৬—১৯৭০ একটানা ৪ বছর হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করার ফলে আমার পক্ষে হযরত বড় হুজুর কেবলা, সাথে সাথে হযরত ছোট হুজুর কেবলার বারবার সুহবত লাভ করার সৌভাগ্য হয়।
হযরত বড় হুজুর কেবলা পরবতীর্তে হযরত ছোট হুজুর কেবলা চট্টগ্রাম পেরিয়ে এতদাঞ্চলে সকল মতাদর্শের নিকট শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব।
আহমদুল ইসলাম চৌধুরী
প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।