01/09/2026
শতভাগ বিদ্যুতায়নের পর নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে ছিলো বাংলাদেশ: ইউনূস সরকারের আমলে বাতিল শেখ হাসিনা সরকারের ৩১ প্রকল্প!
স্পটলাইট ডেস্ক, ঢাকা | ৩০.০৮.২০২৬
বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ-সংকটের দেশ থেকে শতভাগ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের আওতায় এনে রোল মডেল হিসবে গড়ে তুলেছিলো আওয়ামী লীগ সরকার।
বিদ্যুৎ খাতে যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ঘটেছিল, তার ধারাবাহিকতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছিল।
সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নেওয়া ৩১টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাতিল করা হয়েছিলো। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৩,২৮৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার কথা ছিল, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি নতুন বিদ্যুৎ সক্ষমতা। একই সঙ্গে এসব প্রকল্পে প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ জড়িত ছিল।
বিদ্যুৎ খাতে আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিদ্যুতের আওতায় সম্প্রসারণ। ২০০৯ সালের পর বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, গ্রিড সম্প্রসারণ এবং দুর্গম এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ শতভাগ বিদ্যুতায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়।
এই বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সম্প্রসারণের ফলে গ্রাম ও শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ে। কৃষিতে সেচ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কর্মকাণ্ডে বিদ্যুতের ব্যবহার অর্থনীতির সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে।
একই সময়ে ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছিল। সরকারি পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছিল।
শুধু প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভর না করে সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যুক্ত করার উদ্যোগও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জোরদার হয়।
২০২১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছিলেন। সরকারি Integrated Energy and Power Master Plan-এও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণকে ভবিষ্যৎ জ্বালানি কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ৩১টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য Letter of Intent বা LoI দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৩,২৮৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।
CPD-এর গবেষণা অনুযায়ী, এসব প্রকল্পে সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। এতে চীন, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগ করতে এগিয়ে এসেছিলো।
কিন্তু ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসব প্রকল্পের LoI বাতিল বা আগের প্রক্রিয়ায় আর এগিয়ে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে সিদ্ধান্তটির অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রভাব নিয়ে পরবর্তীতে প্রশ্ন ওঠে। CPD ২০২৫ সালে ৩১টি প্রকল্পের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলে, যেসব প্রকল্প বাস্তবসম্মত ও যোগ্য সেগুলো বাস্তবায়নে নেওয়া যেতে পারে এবং প্রয়োজন হলে শর্ত ও বিদ্যুতের মূল্য পুনর্নির্ধারণ বা renegotiation করা যেতে পারে।
গবেষণা সংস্থাটির হিসাবে প্রকল্পগুলো সম্মিলিতভাবে ৩,২৮৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ এবং প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
প্রকল্প বাতিলের ফলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা নিয়ে। বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিবছর বাড়ছে।
সৌরবিদ্যুৎ একদিকে আমদানি-নির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে পারে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতভাগ বিদ্যুতায়নের মাধ্যমে যে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তার ওপর দাঁড়িয়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার জন্য অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করা ছিল পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপ। সেই ধারাবাহিকতা ব্যাহত হলে এর প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; শিল্প, কৃষি, ব্যবসা, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও পড়ে।
তারা জানান, বিদ্যুতের ঘাটতি বা সরবরাহের অনিশ্চয়তা তৈরি হলে শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বাড়ে, কৃষিতে সেচ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হতে পারে এবং সাধারণ ভোক্তার জীবনেও তার প্রভাব পড়ে। তাই দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির প্রকল্পে হঠাৎ নীতিগত পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত জনগণের জন্য বাড়তি ব্যয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকারের বিদ্যুৎ খাতের সাফল্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক ছিল, ‘বিদ্যুৎবিহীন বাংলাদেশ’ থেকে ‘শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় বাংলাদেশ’-এ উত্তরণ।
শেখ হাসিনা সরকারের পরবর্তী লক্ষ্য ছিল শুধু বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বৃদ্ধি করা। ৩১টি প্রকল্প সেই বৃহত্তর ভবিষ্যৎ সক্ষমতারই একটি অংশ ছিল।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য প্রকল্পের সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
Daily Sportlight
#বিদ্যুৎ #সংকট #প্রকল্প #বাতিল #নবায়নযোগ্য