15/05/2026
১৯৯৮ সাল। বগুড়া শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে এরুলিয়া। ৪৫০০ ফুটের একটা রানওয়ে, চারপাশে ধানক্ষেত। টার্মিনাল বলতে টিনের চাল। রাত নামলে শেয়াল ডাকে। সার্চলাইট নেই, তাই সন্ধ্যার পর এখানে শুধু অন্ধকার নামে। সেনাবাহিনীর দুই সিটার প্লেন নামতো মাসে একবার। পাইলটরা বলতো, “এটা বিমানবন্দর না, গরুর মাঠ।”
কিন্তু ২৬ বছর পর, ১২ অক্টোবর ২০২৪, রাত ৩টা ১১ মিনিটে, একই রানওয়ের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান। পাশে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড, নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব। সবার হাতে ড্রোনের মনিটর। মনিটরে ভেসে উঠছে নতুন মাস্টার প্ল্যান — ১০,৫০০ ফুট রানওয়ে, প্যারালাল ট্যাক্সিওয়ে, ক্যাট-৩ লাইটিং, আন্তর্জাতিক কার্গো টার্মিনাল, ফ্লাইং একাডেমি, বিমান বাহিনীর ফরওয়ার্ড বেস।
চেয়ারম্যান ফিসফিস করে বলেন, “এটা আর বগুড়া থাকবে না, এটা হবে নর্থের শাহজালাল।”
কেউ জানে না, এই ফিসফাসের শব্দই আগামী দিনে দিল্লি, কাঠমাণ্ডু, নেপিডোর টেবিলে কাঁপনি তুলবে। কেউ জানে না, ৩০০০ একর জমির নিচে শুধু রানওয়ে না, লুকিয়ে আছে ভূরাজনীতির নতুন রানওয়ে।
বর্তমান বগুড়া বিমানবন্দর ১০৯ একর। রানওয়ে ৪৫০০ ফুট বাই ১০০ ফুট। রাতে আলো নেই। ফায়ার স্টেশন আছে, কিন্তু পানি নেই। টার্মিনাল আছে, কিন্তু ইমিগ্রেশন নেই। ১৯৮৭ সালে বানানো হয়েছিল স্টল এয়ারক্রাফটের জন্য। উদ্দেশ্য ছিল উত্তরাঞ্চলে ভিআইপি মুভমেন্ট আর সেনামহড়া। ২০২৩ সালে এসেও চিত্র একই — সপ্তাহে একটা ফ্লাইটও না।
অথচ ২০ কিলোমিটারের মধ্যে বগুড়া শহর, শেরপুর, শাহজাহানপুর — ২৪ লাখ মানুষ। উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলা, আট কোটি মানুষ। আম, আলু, মরিচ, শস্য, তাঁত, মৃৎশিল্প — হাজার কোটি টাকার পণ্য। কিন্তু আকাশপথ শূন্য। ঢাকায় যেতে লাগে সাত ঘণ্টা। অ্যাম্বুলেন্সের রোগী মারা যায় যমুনা সেতুর জ্যামে।
এই বাস্তবতা বদলাতেই ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে একনেকে গড়ে ওঠে “বগুড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প”। বাজেট প্রাথমিক ১৮৩০ কোটি টাকা। লক্ষ্য — ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজারের পর দেশের পঞ্চম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
কিন্তু এটা শুধু ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের জন্য না। এটা হবে এভিয়েশন কমপ্লেক্স — যাত্রী, কার্গো, সামরিক, প্রশিক্ষণ — চার মাথার দানব।
নতুন মাস্টার প্ল্যানে লাগবে ৩০০০ একর জমি। বর্তমানে ১০৯ একরের সাথে যোগ হবে আরো ২৮৯১ একর। এর মধ্যে এরুলিয়া, নামুজা, গোকুল ইউনিয়নের ধানি জমি, ভিটেবাড়ি। জেলা প্রশাসন বলছে, ৮৪২টি পরিবার পড়বে অধিগ্রহণে।
কৃষক রফিকুলের তিন বিঘা জমি যাবে রানওয়ের সেন্টার লাইনে। তিনি বলেন, “জমি গেলে খাবো কি? কিন্তু টিভিতে দেখি দুবাইয়ের এয়ারপোর্ট। আমার নাতি যদি পাইলট হয়?”
সরকার বলছে, ক্ষতিপূরণ তিন গুণ। সাথে পুনর্বাসন প্লট। সাথে এয়ারপোর্টে চাকরির কোটা।
কিন্তু কেউ জানে না, এই ৩০০০ একর শুধু রানওয়ে না। ডিফেন্স এনালিস্টরা বলছেন, এটা ডুয়েল ইউজ — বাণিজ্যিক নামে সামরিক গভীরতা। কারণ নতুন রানওয়ে ১০,৫০০ ফুট। বোয়িং ৭৭৭, এয়ারবাস এ৩৫০, সি-১৩০জে, এমনকি এয়ারবাস এ৪০০এমও নামতে পারবে।
১০,৫০০ ফুট মানে ভারতের শিলিগুড়ি করিডর থেকে ১৮ মিনিটের ফ্লাইট টাইম। মানে নেপাল, ভুটান, সেভেন সিস্টার্সের কার্গো হাব। কেউ জানে না, এই রানওয়ের ছায়া কতদূর যাবে।
ফেজ-ওয়ান, ২০২৫ থেকে ২০২৭ — জমি অধিগ্রহণ, মাটি ভরাট, নতুন রানওয়ে ৯০০০ ফুট বাই ১৫০ ফুট, পিসিএন-৭০, ক্যাট-৩ লাইটিং, আইএলএস। টার্মিনাল ১.২ লাখ বর্গফুট। পিক আওয়ারে ১২০০ যাত্রী।
ফেজ-টু, ২০২৮ থেকে ২০৩০ — রানওয়ে বর্ধিত হয়ে ১০,৫০০ ফুট, প্যারালাল ট্যাক্সিওয়ে, কার্গো টার্মিনাল ৫০,০০০ টন, কোল্ড স্টোরেজ।
ফেজ-থ্রি, ২০৩১ থেকে ২০৩৫ — দ্বিতীয় রানওয়ে, এমআরও হ্যাঙ্গার, ফ্লাইট একাডেমি, ২০টি ট্রেইনার এয়ারক্রাফট, বিমান বাহিনীর ফরওয়ার্ড অপারেটিং বেস।
বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, “ঢাকার চেয়ে আধুনিক হবে। শাহজালালের থার্ড টার্মিনালে যা আছে, এখানে তার সাথে থাকবে সামরিক স্ট্র্যাটেজি।”
কারণ বগুড়া বসে আছে চিকেন নেকের ১১০ কিলোমিটার দক্ষিণে। চীন-বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল-ভুটান ইকোনমিক করিডরের সেন্টারে। কেউ জানে না, এই রানওয়ে একদিন “এয়ার সিল্ক রুট” হবে কিনা।
মাস্টারপ্ল্যানের সবচেয়ে চমক — ইমিগ্রেশন আর বাণিজ্যিক সংযোগ। ঢাকা থেকে বগুড়া ৩৫ মিনিট। চট্টগ্রাম থেকে বগুড়া এক ঘণ্টা। কলকাতা থেকে বগুড়া ৪৫ মিনিট। কাঠমাণ্ডু থেকে বগুড়া ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট।
কার্গোতে উত্তরাঞ্চলের ১.২ লাখ টন সবজি, ৮০ হাজার টন আম, ৪০ হাজার টন আলু — দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপে যাবে ছয় ঘণ্টায়।
সামরিক দিকেও পরিকল্পনা বিশাল। বিমান বাহিনীর এফ-৭, মিগ, সি-১৩০, এমআই-১৭ — সব বসবে। রিফুয়েলিং, রিয়ার্মিং, দুর্যোগে লাইফলাইন।
প্রশিক্ষণে বাংলাদেশ ফ্লাইট একাডেমি উইং — বছরে ২০০ পাইলট, বিদেশি ক্যাডেট।
প্রতিরক্ষা সচিব বলেন, “যমুনার পূর্বে আমাদের কোনো ফাইটার বেস নেই। যুদ্ধ লাগলে ঢাকা থেকে উড়ে আসতে ১২ মিনিট লাগে। বগুড়া হলে দুই মিনিট।”
কেউ জানে না, এই দুই মিনিট একদিন সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি হবে কিনা।
বগুড়ার মাটি পলি, বালি, পানি। রানওয়ে বানাতে লাগবে সয়েল স্ট্যাবিলাইজেশন। ৪ মিটার ডিপ সিমেন্ট ট্রিটমেন্ট। তার উপর ১.২ মিটার পেভমেন্ট। পিসিএন-৭০ মানে বোয়িং ট্রিপল সেভেন নামলেও দেবে যাবে না।
পাখির ঝুঁকি আছে। পাশে করতোয়া, বার্ড স্ট্রাইক জোন। তাই বসবে এভিয়ান রাডার, লেজার, সাউন্ড ক্যানন।
টার্মিনালে বসবে ই-গেট, সিটিপিএস, বায়োমেট্রিক ইমিগ্রেশন। পরামর্শক — বুয়েট, এমআইএসটি, কোরিয়ান এয়ারপোর্ট কর্পোরেশন।
কেউ জানে না, ২০২৭ সালে উদ্বোধনের দিন আকাশে কি থাকবে — উদ্বোধনী ফ্লাইওভার, নাকি থান্ডারস্টর্ম।
বেবিচকের হিসাব — নির্মাণে ১২ হাজার চাকরি। অপারেশনে ৪ হাজার সরাসরি, ৪০ হাজার পরোক্ষ। উত্তরাঞ্চলের জিডিপিতে ১.২% থেকে ২% বুস্ট। ১০ বছরে ৩ বিলিয়ন ডলার ভ্যালু অ্যাড।
টুরিজম — মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, শেরপুর বিশ্ব ঐতিহ্য — এক ঘণ্টায় ঢাকা থেকে টুরিস্ট। কৃষিতে কার্গো কস্ট ৪০% কমবে। আমের কেজিতে ২০ টাকা বেশি পাবে চাষী।
কিন্তু খরচও বিশাল। ফেজ-ওয়ান ৪৯০০ কোটি। ফেজ-টু ৬৯৩০ কোটি। ফান্ডিং — জিওবি ৬০%, জাইকা ৩০%, এক্সিম ব্যাংক ১০%।
কেউ জানে না, ঋণের সুদ গুনতে গিয়ে লাভ থাকবে কিনা। আবার কেউ জানে, রানওয়ে না হলে লস আরো বেশি।
এরুলিয়ার ধানক্ষেতে পুঁতেছে লাল ফ্ল্যাগ। সার্ভে টিম লিখেছে — “RWY-09 Threshold”। ১০০ মিটার দূরে কৃষক রফিকুল দাঁড়িয়ে। হাতে দলিল, চোখে পানি। পাশে তার নাতি, ক্লাস টেনের ছেলে। মোবাইলে দেখাচ্ছে — “দাদা, এই দেখো এমিরেটসের প্লেন। এটা নামবে আমাদের এখানে।”
রফিকুল হাসে, আবার কাঁদে।
ঠিক তখনই ঢাকা সচিবালয়ে বাজে এনক্রিপ্টেড ফোন। ওপাশে বিদেশি ডিফেন্স অ্যাটাশে। গলা নামিয়ে বলে, “Excellency, we noticed your new runway length. It’s strategic. We hope it’s only a commercial.”
সচিব পাঁচ সেকেন্ড চুপ। তারপর বলেন, “আপনি কি আমাদের সংবিধান পড়েছেন? প্রতিরক্ষা আমাদের দায়িত্ব। বাণিজ্য আমাদের অধিকার। দুটোই করবো, কারো অনুমতি নিয়ে না।”
ফোন রাখেন। সামনে ফাইল। ফাইলের নাম — “Bogura FOB Fighter Deployment Roadmap”। নিচে নোট — “Phase-1 complete হলে after F-7 BGS squadron. Phase-2 তে MRCA।”
তিনি সই করেন না। ফাইলটা লকারে রাখেন। কারণ কেউ জানে না, কালকের বাংলাদেশ কি চাইবে — শুধু যাত্রী, নাকি পাহারা।
শুধু জানে, পদ্মার উত্তরে আজ একটা নতুন রানওয়ে জন্ম নিচ্ছে। এই রানওয়ের শেষ মাথায় লেখা নেই ঢাকা বা দিল্লি। লেখা আছে একটাই শব্দ — বাংলাদেশ।
আর সেই শব্দটার পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে ৩০০০ একর জমি, ১০,৫০০ ফুট কংক্রিট, আর ১৭ কোটি মানুষের স্বপ্ন।
কেউ জানে না, এই স্বপ্ন আকাশ ছোঁবে, নাকি ভূরাজনীতির মেঘে ঢাকা পড়বে। কিন্তু রফিকুলের নাতি জানে — সে পাইলট হবে। এই রানওয়ে থেকেই উড়বে।
ভবিষ্যৎ................
- Rayhan