26/05/2026
বাইতুল্লাহ নিয়ে আপনার অনুভূতি কেমন!?
#যুলহিজ্জা_রাইটিং_কন্টেস্ট
#সিরিয়াল_৯
লাব্বাঈক আল্লাহুম্মা লাব্বাঈক…
লাব্বাঈক লা শারীকা লাকা লাব্বাঈক…
ইন্নাল হামদা…
তালবিয়া— এই পবিত্র শব্দগুলোর আলাদা এক ধ্বনি আছে। এমন এক ধ্বনি, যা হৃদয়ে কাঁপন ধরায়, চোখে জল আনে, শরীরে শিহরণ জাগায়। জানি না এর মাঝে কী আছে! কেমন অনুভূতি হয়! শুধু জানি, লুকানো কিছু একটা আছে। গভীর, অদ্ভুত, ব্যাখ্যাতীত কিছু।
তখনও তালবিয়ার অর্থ জানতাম না। শুধু জানতাম, হজ্বে গেলে এটা পড়তে হয়। সেই ছোট্টবেলাতেও টিভির সামনে হা করে তাকিয়ে থাকতাম। শুনতাম সেই শ্রুতিমধুর শব্দগুলো।
আমার দাদী, চাচীরা আরাফার দিন বলতেন— “আজকে কি হজ্ব দেখাইবো না?”
আমরা বিটিভি অন করে দিতাম।সেদিন হজ্বের সরাসরি সম্প্রচার হতো। দেখানো হতো দেশ-বিদেশের হাজার হাজার হাজীকে।
হাজার হাজার মাইল দূরে বসেও আমার দাদী, চাচীরা হাজীদের সাথে মুনাজাতে বসতেন। সেই অশ্রুসিক্ত মুনাজাতে হয়তো থাকত তীব্র এক চাওয়া— “মাবুদ গো, আমাদেরও একদিন তোমার শাহী দরবারে ডাইকা নিও।”
টিভিতে হজ্ব দেখা কিংবা বইয়ে হজ্ব সম্পর্কে পড়ারও আগে, হজ্বের ছবি আমি এঁকেছিলাম আব্বুর মুখে গল্প শুনে। আমাদের জন্মেরও আগে আব্বু হজ্ব করেছিলেন। দেশে ফিরে তিনি সেসব গল্প আমাদের শোনাতেন।
বিবি হাজেরার সাফা-মারওয়া পাহাড়ে পুত্রের জন্য পানির খোঁজে দৌড়, নবী ইবরাহীম আ:-এর প্রিয় জিনিস কুরবানি করার স্বপ্ন, নবী ইসমাঈল আ: বাবার স্বপ্নের কথা জেনে এক বাক্যে রাজি হয়ে যাওয়ার গল্প— এসব শুনেছি আব্বুর কোলে বসে।
নবী ইসমাঈল আ:- এর মতো আল্লাহকে খুশি করার দৃঢ় ইচ্ছা ছিল ছোট্ট মনে। তখন বুঝতাম না, কুরবানির ইতিহাসে যা ঘটেছে, তা আর কখনো ঘটবে না। তবুও একদিন হুট করেই আব্বুকে বলেছিলাম—
“আব্বু, আপনি যদি কখনো এমন স্বপ্ন দেখেন, তাহলে আমাকে কুরবানি করতে নিয়ে যাবেন।”
সুবহানাল্লাহ! শিশু মনে এত দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আমার কিছুই হবে না। কারণ আল্লাহ আমাকেও ইসমাঈল আ: এর মতো বাঁচিয়ে দেবেন।
সময় পেরোয়। শিশু থেকে বড় হই। কিন্তু মনের স্বপ্নগুলো আরও প্রগাঢ় হতে থাকে। নানী, বড় খালা-খালুও হজ্বে যান। নানীর মুখে শুনি হজ্বের অনুভূতির কথা। ইশ! প্রাণ তখন আকুলিবিকুলি করে। সত্যিই কি এত শান্তি সেখানে? মন প্রশ্ন করে,
আমি কবে যাব? আমি কবে দেখব এসব?
কখনো মন খারাপের বিষণ্ণ ঋতুতে আনমনে ভাবি— কোনো এক বৃষ্টিমুখর দিনে আমিও কাবার সামনে বসে কেঁদেকেটে মন সাফ করে ফেলব। শুধু মনে হয়, এর চেয়ে উত্তম কোনো জায়গা নেই কাঁদার জন্য। কাবার মালিকের কাছে কাঁদতে পারাটাও তো বিশাল সৌভাগ্যের ব্যাপার।
বিভিন্ন বইয়ে কিংবা আর্টিকেলে পড়ি—হজ্বে গিয়ে কারও ঈর্ষণীয় মৃত্যুর সংবাদ। তখন খুব করে দুয়া করি—
এমন রাজকীয় এক মৃত্যু যেন আমারও হয়।
আমাদেরই এক প্রতিবেশী একবার হজ্বে যান। শুনে ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। ভাবলাম, যাক! এবার তাহলে কিছুটা পরিবর্তন হবে। খুব স্টাইলিশ, ওয়েস্টার্ন চলাফেরা ছিল তার। তাই হজ্বে গিয়েছেন শুনে ভালোও লাগল, আবার ঈর্ষাও হলো। মনে হচ্ছিল, আল্লাহ, তাকেও তুমি ডেকেছ… আমার পালা কবে?
একদিন মা সেই প্রতিবেশীকে রুমে ডাকলেন। তিনি জানতেন, আমি হজ্বের গল্প শুনতে ভীষণ পছন্দ করি। তাই তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন কেটেছে সেখানকার দিনগুলো?”
আমার নানী বলেছিলেন, “কী এক জায়গারে বইন! কোনো ভুখ নাই, তিয়াশ নাই, ঘুম নাই, ক্লান্তি নাই। খালি শান্তি আর শান্তি। এখন ভাবি, আরও আগে কেন গেলাম না! আমার আরও যাইতে মন চায় রে বইন। কী এক জায়গা দেইখা আসলাম… তাইজ্জব লাগে সব!”
নানীর ভেতরের সেই অনুভূতিগুলো যেন হাহাকার হয়ে বাতাসে মিশে যেত। আমি ঠিক এমন কিছু শোনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
কিন্তু প্রতিবেশীনি বললেন—
“আছে ভালোই। হোটেলে আরাম। কিন্তু বাইরে বের হলে খুব গরম। মক্কায় গরম অনেক বেশি। আবার মদীনায় একটু ঠান্ডা।”
এই ছিল তার হজ্বের অনুভূতি।
আমার মনটা হুহু করে কেঁদে উঠল। ইশ! মা যদি তাকে এই প্রশ্ন না করতেন! আমি যদি এই কথাগুলো না শুনতাম!
আমার স্বপ্নের জায়গাকে নিয়ে এমন অনুভূতি শুনতে একটুও ভালো লাগেনি। আমি তো শুনতে চেয়েছিলাম, “কী এক জায়গা! কোনো ভুখ নাই, তিয়াশ নাই, ঘুম নাই…”
দিন বাড়তে থাকে। অপেক্ষাও তীব্র হয়। রব্বে কারীমের কাছে একটাই প্রার্থনা, “মাবুদ গো, এই অধমরে তোমার ঘরে একবার ডাইকা নিও। নয়ন ভইরা তোমার ঘরখান দেইখা আমার চক্ষের তৃষ্ণা মিটাইতে চাই। বুকের ভেতর চাইপা রাখা বলতে না পারা কথাগুলা তোমার ঘরের সামনে বইলা আমি নির্ভার হইতে চাই।”
সিরাত পড়ে মক্কা-মদীনা সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছি। জায়গাগুলো চিনি না, কিন্তু কত মসজিদ, পাহাড় আর স্থানের নাম যে জানা হয়ে গেছে! খুব ইচ্ছা করে, সিরাতে বর্ণিত প্রিয় নবীজি ﷺ- এর পদধূলিতে ধন্য সব জায়গায় আমি নিজেও একদিন যাব। আল্লাহ যেন উত্তম সঙ্গী আর উত্তম সুযোগ মিলিয়ে দেন।
গত বছর আমার মা চিকিৎসার জন্য ঢাকার এক হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ১৪ তলার সিঁড়িকোঠায় তাদের ব্লকের নারীরা নামাজ পড়তেন। জায়গাটা ছিল নীরব, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
একদিন এশার নামাজের পর মা বাইরে তাকিয়ে ১৪ তলার উপর থেকে ঝলমলে ঢাকা শহর দেখছিলেন। তার কাছে খুব ভালো লাগছিল। তিনি ভাবছিলেন, “এখানেই যদি এত সুন্দর লাগে, তাহলে হজ্বে গেলে না জানি কত ভালো লাগবে!”
সেখানেই তিনি দুয়া করেছিলেন, তিনি যেন তার বড় মেয়েকে সাথে নিয়ে হজ্বে যেতে পারেন।
আমিও দুয়া করি, আমার মায়ের সাথে যেন আমি হজ্বে যেতে পারি, ইন শা আল্লাহ। আমার মা অসুস্থ। চিকিৎসা চলছে এখনো। সবার কাছে দুয়াপ্রার্থী—আল্লাহ যেন আমার মাকে নেক হায়াত দান করেন, কল্যাণকর শিফা দেন। আমরা যেন একসাথে আমাদের স্বপ্নের জায়গায় যেতে পারি।
সকলের সাথে সমস্বরে আমরাও যেন বলতে পারি—
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ،
لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ،
إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ،
لَا شَرِيكَ لَكَ
আর এবারের হজ্বে ভিডিও দেখে আনন্দে শুধু কান্না আসছে। সুবহানাল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ! ১.৮ মিলিয়ন মানুষ একইসাথে বলছে, আল্লাহ আমি হাজির। একইসাথে সবাই আল্লাহর স্তুতি গাইছে। সুবহানাল্লাহ! আমি যেতে পারিনি। কিন্তু তারা পেরেছে। তবুও আমার আনন্দ লাগছে। অবর্ণনীয় এক আনন্দ।
ইয়া রব্বি, তুমি আল গণিই, আল মুগনিই, আল ওয়াহহাব, আল ওয়াকিল।
রব্বি, তুমি এই অধমের ফরিয়াদগুলোও কবুল করে নাও প্লিজ। তোমার ঘরের সামনে বসে কেঁদেকেটে তোমার সাথে নিবিড় আলাপনের সুযোগ করে দাও। সুম্মা আমিন।
লেখা: সিরাজাম বিনতে কামাল