07/04/2023
ছোটবেলায় বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সুললিত কণ্ঠে ভেসে আসে আজানের সুমধুর ধ্বনি, মনোমুগ্ধকর সেই সুরলহরি মানুষকে সুরভিত করে এক নির্মোহ আনন্দে...সেই সুললিত কন্ঠের মানুষটি আর কেউ নন
আমাদের চট্টগ্রামেরই সন্তান ক্বারি উবায়দুল্লাহ...❤️❤️❤️
১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কোদালা গ্রামে জন্ম নেন ক্বারী উবায়দুল্লাহ। তার বাবা হলেন আল্লামা শাহ মেহেরুজ্জামান ইসলামাবাদী। শৈশব-কৈশোরেই তার সুললিত কণ্ঠে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত শুনে পরিচিতজনরা মুগ্ধ হতে শুরু করেন।
ক্বারী উবায়দুল্লাহ ছোট বেলায় বাবার কাছে কায়দা পড়ার পর যোগদান করেন লালবাগ মাদরাসায় মক্তব বিভাগে। সেখানে তিনি হাফেজ্জী হুজুর (রহ) এবং শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের (রহ) কাছে পড়েছেন। শায়খুল হাদিস তাকে বোখারী শরিফ পড়িয়েছেন।
১৯৬২ সালে তিনি মাওলানা পাশ করলে শায়খুল হাদীস তাকে লালবাগ মাদরাসাতেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বোখারী শরিফ পড়ানোর দায়িত্ব দেন।
ওই বছরই মাত্র ১৮ বছর বয়সে নাজিমুদ্দিন রোডে অবস্থিত রেডিও পাকিস্তান কেন্দ্রে প্রথম কোরআন তেলাওয়াত করে ক্বারী উবায়দুল্লাহ। তার কণ্ঠে সূরা ফাতেহার তেলাওয়াত শুনে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায় বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে।
তারপর শুরু হল বাংলাদেশি মুসলমানের জীবনের এক নতুন সংস্কৃতি। সাধারণ মানুষ যেন ক্বারীর কণ্ঠে ‘ফাবিআইয়ি আলা ইরাব্বিকুমা তুকাযযিবান’-এর মতো সুরময় কোরআনের নানা ছন্দে নিজের সারা দিনটিকে রাঙিয়ে নিতে উন্মুখ হয়ে থাকত। তাই প্রতিদিন ফজর নামাজের পর রেডিওর পাশে বসে থেকে ক্বারী ওবায়দুল্লাহর কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত শুনতেন।
এরপর ১৯৬৫ সালে প্রথম চালু হওয়া পাকিস্তান টেলিভিশনেও নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করতেন ক্বারী উবায়দুল্লাহ।
একাত্তরে দেশ স্বাধীন হলে ক্বারী উবায়দুল্লাহর সমাদার বাড়ে রাষ্ট্র ও সমাজে। ফলে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ বেতারে প্রথম যে সুর ধ্বনি বেজে উঠল সেও ক্বারী উবায়দুল্লাহর কণ্ঠে ‘জালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফিহ’।
এরপর ১৯৭৫ সালে বিটিভি যার তেলাওয়াতের মাধ্যমে উদ্বোধন হল তিনিও ক্বারী উবায়দুল্লাহ। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সেই শুরুর অধিবেশন থেকে ৯ম পার্লামেন্ট পর্যন্ত আমাদের জাতীয় সংসদকেও কোরআনের মধুর সুরে মুখরিত করে রেখেছিলেন তিনি।
এদিকে ক্বারী ওবায়দুল্লাহর তেলাওয়াত শুনে অত্যন্ত বিমোহিত হতেন সৌদি বাদশাহ ফয়সাল ও খালেদ। তারা দুইবার তাকে কোরআনের শিল্পী বা ক্বারী হিসেবে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন।
ক্বারী উবায়দুল্লাহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে কুরআন তেলাওয়াত করে ব্যাপকভাবে সম্মানিত হন।
তিনি বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় বারবার প্রথম স্থান অর্জন করে বাংলাদেশের জন্য বয়ে আনেন বিরল মর্যাদা।
বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে সৌদি আরব, লিবিয়া, জর্দান, ইরাক, আরব আমিরাত, কাতার, ইরান, পাকিস্তান, ভারত, বার্মা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ ৩৩টি দেশ সফর করেছেন তিনি।
এদিকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, নিউমার্কেট, হোটেল শেরাটনসহ জাতীয় অসংখ্য স্থাপনার উদ্বোধন হয়েছে তার তেলাওয়াতের মাধ্যমে।
১৯৬২ সাল থেকে ঐতিহ্যবাহী চকবাজার শাহি মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন তিনি। অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর থেকে নামাজ পড়াতে না পারলেও তাকে নিয়মিত সম্মানী দিয়ে যাচ্ছিল মসজিদ কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে তার সুমধুর কণ্ঠে আজান ও কুরআনের তেলাওয়াত সম্প্রচারিত হত। তিনি দীর্ঘ দিন অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থ থেকেই২০ ডিসেম্বর ২০১৬ মঙ্গলবার বা'দ ঈশা ইন্তেকাল করেন।
মহান আল্লাহপাক হুজুরকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন এই দোয়াই কামনা করি।