07/05/2026
ইনশাআল্লাহ
আবারও সব ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে ফিরে আসবেন শেখ হাসিনা
- এম. নজরুল ইসলাম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটেছিল ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি, যা ওয়ান-ইলেভেনের অপশাসন হিসেবে চিহ্নিত। দেশি-বিদেশি এক গভীর ষড়যন্ত্রের ফসল ছিল সেটি। সেনাবাহিনীর সমর্থনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নামে ষড়যন্ত্রকারীরা ক্ষমতা দখল করেছিল। চেপে বসা সেই অপশক্তি ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার নামে মূলত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বিদায় করতে চেয়েছিল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে দুর্বল করে দিতে চেয়েছিল। সেদিনের সেই ষড়যন্ত্রেরও অন্যতম নায়ক ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার পৃষ্ঠপোষকরা।
পঁচাত্তর-পরবর্তী পটভূমিতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসা এবং আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেওয়া- দুটোই ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তাঁর প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে বহুবিধ অপকৌশল নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অদম্য মনোবল আর অবিচল লক্ষ্য থাকায় বঙ্গবন্ধু কন্যাকে কোনো ষড়যন্ত্রই আটকে রাখতে পারেনি। তিনি ফিরে এসেছিলেন এবং রাজনীতিতে তাঁর অভিষেক হয়েছিল। তবে তাঁর চলার পথ মোটেও মশৃণ ছিল না। বহু প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে তাঁকে আগাতে হয়েছে। পদে পদে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছে। পায়ে পায়ে পাথর ঠেলে শেখ হাসিনাকে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে। কিন্তু জনগণকে আস্থায় নিয়ে রাজনৈতিক কল্যাণের যে পথযাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর, তা থেকে তাঁকে বিচ্যুত করা যায়নি।
২০০৭ সালের মধ্য মার্চে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও মহাজোটপ্রধান শেখ হাসিনা নিজের চোখের চিকিৎসা করানোর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী তাঁর পুত্রবধূর অসুস্থতার খবর পেয়ে সেখানে যান। এরই মধ্যে ড. ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আওয়ামী লীগসহ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। বলা যায়, বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
গণতন্ত্র তখন রুদ্ধ। সেই চেপে বসা শাসকদের বিবেচনায় রাজনীতি তখন যেন ছিল গর্হিত অপরাধ। আর সে কারণেই রাজনীতিক পরিচয় দিতেও অনেকে কুণ্ঠিত ছিলেন তখন। পাঁচ বছরের জোট অপশাসনের সুযোগ নিয়ে চেপে বসা শাসককুল তখন রীতমতো ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। রাতারাতি সব কিছু বদলে ফেলার, রাজনীতি থেকে জঞ্জাল পরিষ্কার করার কথা তখন এমনভাবে বলা হতো, যেন রাজনীতি এক মহা-অপরাধ। রাজনীতি যেন গভীর পঙ্কে নিমজ্জমান। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনীতি ও সংগ্রামের সব ঐতিহ্য মুছে দিতে চেয়েছিল. ঠিক চব্বিশ-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের মতোই। সেই একই ধারায় ইউনূস আবারও ‘রিসেট বাটন’ টিপে ইতিহাস মুছে ফেলতে চেয়েছিল।
২০০৭ সালের ৭ মে, স্বাভাবিকভাবেই সময়টা ছিল অন্যরকম। গণতন্ত্র আর রাজনীতির জন্য সে এক গুমোট পরিস্থিতি। তত্ত্বাবধায়ক নাম নিয়ে চেপে বসা সরকারের মুখোশ সবেমাত্র উন্মোচিত হতে শুরু করে। তাদের লুকানো উদ্দেশ্যগুলো ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকে। অতীতে এ ধরনের লেবাসধারীরা যেসব কথা বলে চেয়ারে চেপে বসে, তারাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। কত যে মধুর কথা শুনিয়েছিল সেই ‘চেপে বসা’ সরকার! কী করবে তারা? রাজনীতিতে তারা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করবে। তখনই প্রশ্ন জেগেছিল মানুষের মনে, তা কী করে হয়? মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আর মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি কী করে এক লেভেলে থাকে? তখন প্রতিক্রিয়াশীল চক্র বিছায় চক্রান্তের জাল। প্রতিহিংসাপরায়ণ হয় সংকীর্ণ হীনম্মন্যতায়। একের পর এক জারি হয় ফরমান। তখন অবস্থা ছিল এমন যেন রাজনীতি করার মতো গর্হিত কাজ পৃথিবীতে আর কিছু নেই। রাজনীতিবিদদের কোনো নীতি নেই, চরিত্র নেই- এমন অপপ্রচার চলে জোরেসোরে।
২০০৭ সালের ৯ এপ্রিল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং জামায়াত-শিবিরের দায়ের করা হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়। বোঝাই যাচ্ছিল শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসার পথ রুদ্ধ করতেই এমনটি করা হয়েছিল।
পর্দার অন্তরালে সেনাবাহিনীর একটি অংশ এবং সুশীল সমাজের একটি অংশ কলকাঠি নাড়ছিলেন তা স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছিল। ঐ সময় নির্বাচনি প্রস্তুতি গ্রহণের কর্মযজ্ঞ থেকে সরে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্রমে দুর্নীতিবিরোধী, রাজনীতিবিরোধী, রাজনীতিতে সংস্কার আনাসহ নানা কথা বলতে শুরু করে এবং শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসতে বাধা দেওয়া হতে থাকে।
২০০৭ সালের ৭ মে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারঘোষিত জরুরি অবস্থা চলাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা শেষে শত প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে বাংলাদেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।
সে সময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা যাতে দেশে ফিরতে না পারেন সেজন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার এক অবৈধ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সব বিমান সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তারা যেন শেখ হাসিনাকে বহন না করে। শেখ হাসিনা একাধিকবার লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে ফিরেও যান। কিন্তু তিনি ছিলেন তাঁর সিদ্ধান্তে অটল, যেকোনো মূল্যে তিনি দেশে ফিরবেনই।
সাহসী শেখ হাসিনা তৎকালীন সরকারের বেআইনি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। অবৈধ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে বিশ্বব্যাপী। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে শেখ হাসিনার ঐকান্তিক দৃঢ়তা, সাহস ও গণতন্ত্রকামী দেশবাসীর চাপে তদানীন্তন তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়।
৭ মে শেখ হাসিনা ঢাকায় ফিরে এলে লাখো জনতা তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানায়। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে মিছিল শোভাযাত্রা সহকারে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবনে নিয়ে আসা হয়। দেশে ফিরে জনগণের হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় শুরু করেন নতুন সংগ্রাম।
দেশটিকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যেতে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র আজও তৎপর। ঘাপটি মেরে আছে রাজনৈতিক অপশক্তিও। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্য ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির সম্মিলিত প্রয়াস। আমরা আশাবাদী হই এ কারণেই যে, আমাদের ভরসার স্থল বঙ্গবন্ধুকন্যা। আমরা জানি ‘অন্ধের দেশে’ অভয় দেওয়ার জন্য একজন শেখ হাসিনা আছেন, যাঁর দীপ্র কণ্ঠ আমাদের প্রাণিত করে।
দেশে আজ সেই ওয়ান-ইলেভেনের মতো একই ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে। অভ্যুত্থানের নামে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংসলীলা ও অগ্নিসন্ত্রাস করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। ড. ইউনূস নিজেই স্বীকার করেছেন, কয়েক বছর ধরে 'মেটিকুলাসলি ডিজাইন' করা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে আটকাতে শত শত মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। সেই একই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের খত দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু ষড়যন্ত্র ক্ষণস্থায়ী। সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। ২০০৭ সালের ৭ মে’র মতো পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও বীরদর্পে ফিরে আসবেন দেশের মাটিতে। জনজোয়ারে ভেসে যাবে সব ষড়যন্ত্র।
লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক