08/03/2017
সায়েন্স নেব না আর্টস? ডাক্তারি না ইঞ্জিনিয়ারিং?
আনিসুল হক
গড্ডলিকা-প্রবাহ বা গড্ডালিকা-প্রবাহ বলে একটা কথা আমরা ব্যবহার করতাম। মানে বুঝতাম, অন্ধভাবে অন্যকে অনুসরণ করা। পরে কথাটার আসল মানে অভিধান দেখে শিখে নিই। গড্ডলিকা মানে মেষ। আরো নির্দিষ্টভাবে বললে, সেই ভেড়ি, যা ভেড়ার দলের সবার আগে থাকে। সামনে যে-ভেড়াটা থাকে, তার পেছনে পেছনে সব ভেড়া চলতে থাকে, কোনো বাছবিচার ছাড়াই, সেই রকম ভাবে চলার নামই হলো গড্ডলিকা-প্রবাহ।
আমাদের ছোটবেলায় আমরা সেই রকমভাবেই চলতাম। মানে ধরো পড়ি রংপুর জিলা স্কুলের ক্লাস এইটে। যখন আমাদেরকে কেউ জিগ্যেস করত, কী হতে চাও, আমরা বলতাম, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার। এর বাইরে অন্য কিছু যে হওয়া যায়, আমাদের জানাই ছিল না। ক্লাস নাইনে উঠে আমাদেরকে তিনভাগে ভাগ করা হলো। সায়েন্স, আর্টস আর কমার্স। বিজ্ঞান, মানবিক আর বাণিজ্য। সবাই তো আর বিজ্ঞান পেল না, কেউ কেউ পেল বাণিজ্য, বাকিরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও পড়তে লাগল মানবিক শাখায়। বিজ্ঞান পড়তে গিয়ে আবারও সমস্যা। জীববিজ্ঞান নেব, নাকি কারিগরি অঙ্কন নেব? জীববিজ্ঞান নিলে ডাক্তারি পড়া যাবে, কারিগরি অঙ্কন নিলে পড়া যাবে না, তখন ইঞ্জিনিয়ারিংই পড়তে হবে।
তোমাদেরও কি এই সমস্যায় পড়তে হয়? অষ্টম শ্রেণীতেই ভাবনা এসে পড়ে, বিজ্ঞান নেব নাকি কলা নাকি বাণিজ্য? আর উচ্চমাধ্যমিকে পড়তে পড়তে কি ভাবতে হয়, কোথায় ভর্তি হব? প্রথম পছন্দ থাকে ডাক্তারি, কিংবা প্রকৌশল, তারপরে অন্যগুলো?
আমি কিছুদিন আগে গিয়েছিলাম রাজধানীর শহীদ আনোয়ার স্কুলে। সেখানে শিক্ষার্থীদের জিগ্যেস করলাম, তোমরা কী হতে চাও? প্রায় সবাই একযোগে জবাব দিল, ডাক্তার। শুনে আমি বললাম, সবাই ডাক্তার হলে রোগী হবে কে! ওদের নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা হতে লাগল। কারণ, একটা ক্লাসের সবাই তো ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পাবে না। নিশ্চয়ই বড় হয়ে তারা সবাই ডাক্তার হবেও না। তাহলে কি তারা মনখারাপ করবে?
আমার পরামর্শ হলো, সব বিষয়ই ভালো বিষয়। তোমার যেটা ভালো লাগে, সেটা পড়ো। তাতে যদি তুমি ভালো করো, তুমি জীবনে অনেক ভালো করবে। আমরা যখন স্কুলে পড়তাম, তখন আমাদের ধারণা ছিল, ‘বাংলা’য় পড়লে ভালো করা যায় না। একটা কৌতুকও প্রচলিত ছিল। চিড়িয়াখানায় বাঘের চামড়া পরে বাঘ সাজার চাকরি পেয়েছে একজন, তাকে বাঘের খাঁচায় ঢুকিয়ে দেওয়া হলো, আরেকটা বাঘ দেখে সে ভয়েই জড়সড়, তখন বাঘটা এগিয়ে এসে তার কানে কানে বলল, কী ভাই, আপনিও কি বাংলায় এমএ?
কিন্তু আজকে আমি আমার বায়ান্ন বছর বয়সে এসে বলতে পারি, বাংলায় যারা পড়েছেন, আর ভালো করেছেন, তারা ইঞ্জিনিয়ারিং যারা পড়েছেন, তাদের চেয়ে কোনো অংশে খারাপ করেননি। ধরো, বাংলাদেশের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মানুষদের মধ্যে আমরা কাদের নাম নেব? অবশ্যই অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তিনি পড়েছেন বাংলা। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন, আর হয়েছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান, মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, তিনি পড়েছিলেন ইতিহাস। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বাংলারই ছাত্রী ছিলেন। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারও কিন্তু বাংলার ছাত্র ছিলেন।
আর আমাকে যদি বলো, আপনি কী পড়তে চান। আমি বলব, আমি সাহিত্য পড়তে চাই, দর্শন পড়তে চাই, সমাজবিজ্ঞান পড়তে চাই, ইতিহাস পড়তে চাই। পরীক্ষায় পাস করবার জন্য নয়, বরং দুনিয়াটাকে বোঝার জন্য, জানার জন্য। একজন অধ্যাপক একবার বলেছিলেন, আজকের দুনিয়ায় সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান না পড়লে শিক্ষিত হয় না। তার মানে আমি আসলে শিক্ষিত নই।
আমেরিকার একজন গবেষক গবেষণা করে বলেছেন, আমাদের সবার মধ্যে জিনিয়াস বাস করে। আমরা সবাই শেক্সপিয়ার, আইনস্টাইন বা পাবলো পিকাসো হতে পারব, সেই জিন আমাদের মধ্যে আছে। কিন্তু যিনি প্রবলভাবে সাধনা করেন, চেষ্টা করেন, পরিশ্রম করেন, খুব মনোযোগ দেন, তার জিনটাই কেবল প্রকাশিত হয়। তোমরা চাইলেই বড় বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, সাহিত্যিক কিংবা শিল্পী হতে পারবে। কিন্তু ওই বিষয়টা তোমার ভালো লাগতে হবে। তারপর সেই বিষয়ে তোমাকে প্রচ- পরিশ্রম করতে হবে।
এখন আবারও আসো আমাদের রংপুর জিলা স্কুলের ক্লাসরুমটিতে। একটা শাখায় আমরা ছিলাম ৫০জন ছাত্র। সেই ৫০জনের কেউ ক্লাসে ফার্স্ট হতো, কেউবা কোনো রকমে টেনেটুনে পাস করত। আজকে ৩৫ বছর পরে আমি বলতে পারি, আমাদের ৫০ জনের ৪৫জনই খুব ভালো করছে। যিনি ব্যবসা করেছেন, তিনি বড়লোক হয়েছেন। কেউবা শিক্ষক হয়েছেন, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ার হয়েছেন, ডাক্তার হয়েছেন ৪ কিংবা ৫ জন, আজকে আর তুমি পার্থক্য করতে পারবে না, কে ক্লাসের পরীক্ষায় ফার্স্ট হতো, আর কে দুইটা সাবজেক্টে ফেইল করত।
আমি রসিকতা করে একটা কথা বলে থাকি। তবে এটা রসিকতাই। আমি বলি, যদি তুমি ক্লাসে ফার্স্ট হও, তাহলে তুমি ডাক্তার হবে, আর যদি পরীক্ষায় ভালো না করো তাহলে হাসপাতালের মালিক হবে, তুমি যদি ভালো ছাত্র হও, তবে তুমি সচিব হবে, আর যদি খারাপ ছাত্র হও, মন্ত্রী হবে, তুমি যদি ভালো ছাত্র হও, ইঞ্জিনিয়ার হবে, যদি খারাপ ছাত্র হও, তাহলে তুমি ইঞ্জিনিয়ারিং ফারমের মালিক হয়ে ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরি দেবে। আগেই বলেছি, কথাটা রসিকতা। তবে এটা আমি জোর গলায় বলব, জীবন কাউকে খালি হাতে ফেরায় না, জীবন সবার জন্যেই সোনার মেডেল রেখে দিয়েছে, তবে ম্যারাথন দৌড়ে তোমাকে শেষ পর্যন্ত যেতে হবে, মাঝপথে দৌড় থেকে চলে যেও না।
তবে আজকের দুনিয়ায় ভালো ছাত্র হওয়া ভালো। পরীক্ষার ভালো ফলের দাম আছে। আগেকার দিনে ধরো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্কুলে মন বসাতে পারতেন না, পড়া শেষই করতে পারেননি, আইনস্টাইন কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় ফেইল করেছিলেন। কিন্তু আজকের দুনিয়ায় ধরো হুমায়ূন আহমেদ, তিনি কিন্তু মাধ্যমিক পরীক্ষায় বোর্ডে স্টান্ড করেছিলেন, ফার্স্ট কিংবা সেকেন্ড হয়েছিলেন। কিংবা ধরো, আইনস্টাইনের বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করেন বাংলাদেশের এম. জাহিদ হাসান। তিনি ভাইল ফারমিয়ন কণা আবিষ্কার করেছেন, যা বিজ্ঞানীরা আশি বছর ধরে খুঁজছেন। এই জাহিদ হাসান কিন্তু ঢাকার গভ. বয়েজ স্কুল থেকে মাধ্যমিকে সেকেন্ড আর উচ্চমাধ্যমিকে ফার্স্ট হয়েছিলেন। কাজেই আমরা বলব, পড়াশুনা ভালো করে করো, ভালো ফলের দরকার আছে।
আর বারবার করে বলব, পাওলো কোয়েলহোর লেখা আলকেমিস্ট বইয়ের সেই গল্পটা। একটা ছেলে গেল পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তির প্রাসাদে , উপদেশ নেবার জন্য। জ্ঞানী ব্যক্তি বললেন, তুমি পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখো, তবে একটা শর্ত, তোমাকে আমি একটা চামচ দিচ্ছি, চামচে তেল থাকবে, পুরো বাড়ি ঘুরবে, কিন্তু চামচ থেকে যেন তেল পড়ে না যায়। ছেলেটি পুরো বাড়ি ঘুরে এসে বলল, আমি বাড়িটা ঘুরেছি, আমাকে উপদেশ দিন। জ্ঞানী ব্যক্তি বললেন, বলো তো, পাশের ঘরে কী আছে। ছেলেটা বলতে পারল না। সে বলল, আমি সারাক্ষণ চামচের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তাই বলতে পারব না, কোন ঘরে কী আছে। জ্ঞানী ব্যক্তি বললেন, আবার যাও, চামচও থাকবে, তেলও থাকবে, চামচ থেকে তেল পড়তেও পারবে না, আর তোমাকে বলতে হবে, কোন ঘরে কী আছে। ছেলেটা পুরো বাড়ি ঘুরতে লাগল আবারও। পাশে ঘরে হরিণ আছে, আরেক ঘরে সুন্দর ছবি, আরেক ঘরে কার্পেট। সে এসে বলল, এবার আমি বলতে পারব, কোন ঘরে কী আছে। জ্ঞানী ব্যক্তি বললেন, তোমার চামচের তেল কোথায়। ছেলেটি তাকিয়ে দেখল, চামচ থেকে তেল পড়ে গেছে। জ্ঞানী ব্যক্তি বললেন, এটাই তোমার প্রতি আমার উপদেশ। আমাদের চামচ থেকে তেল পড়তে পারবে না, কিন্তু আমরা আমাদের চারপাশে যা কিছু আনন্দের, যা কিছু উপভোগের, যা কিছু শিক্ষার, তার সব কিছু দেখব, শিখব, উপভোগ করব।
আমরাও পরীক্ষার ফল ভালো করব, আবার প্রচুর বই পড়ব, বাইরের বই, সংস্কৃতিচর্চা করব, গান গাইব, নাচব, নাটক-বিতর্ক-আবৃত্তি করব, খেলাধুলা করব, প্রকৃতি-পরিবেশ-বিজ্ঞান ক্লাব করব। এসবের মধ্য দিয়েই আমরা একসময় বুঝে নেব, আমার কী ভালো লাগে। বিজ্ঞান নাকি সাহিত্য। নাকি বাণিজ্য। আজকাল খুব বাণিজ্য পড়ার ঝোঁক এসেছে। কিন্তু সবার বাণিজ্য পড়ার দরকার নেই। বিজ্ঞান পড়লেও শুধু ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার কিংবা কম্পিউটারবিদ হওয়ার সাধনা করার দরকার নেই। মৌলিক বিজ্ঞানও পড়তে পারো। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান পড়ে তুমি বড় বিজ্ঞানী হতে পারবে। ধরো একটা বিষয় আছে, ভূগোল। আমাদের ভালো ভূগোলবিদ খুব দরকার। পৃথিবীতে ভূগোলবিদের সম্মানও আছে, সম্মানীও তারা ভালো পান। কিংবা ধরো কেউ পারসী পড়ল, পারস্য-সাহিত্য অনুবাদ করল, তাতে আমরা সবাই কত উপকৃত হব!
তাহলে আমার বলার কথাটা আমি অল্প কথায় গুছিয়ে বলি।
১. সব সাবজেক্টই ভালো সাবজেক্ট। যদি তুমি ভালোভাবে পড়ো।
২. ভালো ফলের দরকার আছে।
৩. কিন্তু শুধু ভালো ফল করলে চলবে না। তোমাকে প্রচুর বাইরের বই পড়তে হবে, সংস্কৃতি চর্চা করতে হবে, খেলাধুলা করতে হবে আর সংগঠন করতে হবে।উন্নত বিশ্বের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তোমাকে যখন ভর্তি করতে চাইবে, তখন কেবল তোমার ফল দেখবে না, তুমি আর কী কী করো, সংস্কৃতি বা সমাজসেবা, সেটাও খুব করে দেখবে।
৪. তবে বিজ্ঞান নাও কিংবা মানবিক, কিংবা বাণিজ্য, ভালো ফল করো কিংবা খারাপ, জীবনে কেউই খারাপ করবে না। যদি তুমি একাগ্রতার সঙ্গে কোনো একটা কাজ করো, পরবর্তী জীবনে সাফল্য পাবেই।
বিল গেটসের দুটো উক্তি প্রচলিত আছে। এক. আমি হার্ভার্ডে তিনটা পরীক্ষায় ফেইল করেছিলাম। আমার এক বন্ধু সবগুলো পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিল। আমার সেই বন্ধুটি এখন মাইক্রোসফটে সফটঅয়ার ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি করে। দুই. ছোটবেলা থেকেই আমার ছিল অনেক স্বপ্ন। আর এসব স্বপ্ন আমি পেয়েছিলাম বই থেকে। আমার অফিস ঘরে আছে বই, আমার শোবার ঘরে আছে বই, আমি যখন গাড়িতে উঠি আমার সঙ্গে থাকে বই, আমি যখন প্লেনে উঠি আমার সঙ্গে থাকে বই।
আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রকৌশলীদের একজন, ঢাকার ছেলে এফ আর খান কী বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, একজন প্রযুক্তিবিদের আপন প্রযুক্তিতে হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তাকে অবশ্যই জীবনকে উপভোগ করতে পারতে হবে। আর জীবন হলো, শিল্প, সঙ্গীত, নাটক-- আর সবচেয়ে বড় কথা, জীবন হলো মানুষ।
আচ্ছা আমি দুটো কবিতার কিছু লাইন দিয়ে শেষ করি। কবি আল মাহমুদের কবিতা-- তোমরা যখন শিখছ পড়া মানুষ হওয়ার জন্য, আমি না হয় পাখিই হব, পাখির মতো বন্য। আর রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, মা যদি হও রাজি, বড় হয়ে আমি হব খেয়াঘাটের মাঝি।
আমি বলি, তোমরা যদি পাখি হও, কিংবা খেয়াঘাটের মাঝি হও, মানে প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখো, মানুষকে ভালোবাসতে শেখো, তোমরা ডাক্তারই হও কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হও, কিংবা না হও, তোমরা সুন্দর মানুষ হবে। এই পৃথিবীর এখন সুন্দর মানুষ দরকার সবচেয়ে বেশি।
সংগ্রহীত