03/03/2026
কক্সবাজারের উজানটিয়ায় কয়টি অসমাপ্ত কাজ
সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, দৈনিক পূর্বকোণ Dainik Purbokone
কক্সবাজার দেশের অত্যধিক সমৃদ্ধ জেলা। এই জেলার মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর, বহুমুখী মেগাপ্রকল্প, মগনামা ৭০০ একর এরিয়া নিয়ে নৌবাহিনীর ঘাঁটি, পর্যটন, শিল্প, লবণ ও চিংড়ির প্রসিদ্ধ অঞ্চল, পাহাড়ে—পর্বতে রাবার বাগানসহ নানান বনজ ফলজে সমৃদ্ধ কক্সবাজার। এই জেলার উন্নয়নের অন্যতম রূপকার জনাব সালাহ উদ্দিন আহমদ।
গত ১২ ফেব্রুয়ারী তিনি সুষ্ঠু নির্বাচনে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারী পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁকে দেয়া হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাঁর কাছে মন্ত্রণালয় মূখ্য নয়। কক্সবাজার উন্নয়নের প্রাণপুরুষ দীর্ঘ ১৭ বছর পর ক্ষমতায় গিয়ে উন্নয়নের বাকী কাজসমূহে হাত দিবেন তা নিশ্চিত।
৮ টি উপজেলা নিয়ে কক্সবাজার জিলা। সংসদীয় আসন ৪ টি। তথা—
কক্সবাজার—১ (চকরিয়া ও পেকুয়া),
কক্সবাজার—২(কুতুবদিয়া—মহেশখালী),
কক্সবাজার—৩ (রামু—কক্সবাজার),
কক্সবাজার—৪ (উখিয়া—টেকনাফ)।
কক্সবাজারে কৃতি পুরুষ জনাব সালাহ উদ্দিন আহমদ বিশাল চকরিয়া উপজেলার পশ্চিম—উত্তর দিকে ৭ টি ইউনিয়ন নিয়ে পেকুয়া উপজেলা সৃষ্টি করেন ২৩ এপ্রিল ২০০২ সালে। পেকুয়া উপজেলার অন্যতম গ্রাম ও ইউনিয়ন উজানটিয়া। উজানটিয়াকে অনেকটা দ্বীপ বলা যায়। বস্তুতঃ বৃহত্তর চকরিয়া পশ্চিম দিকে কুতুবদিয়া চ্যানেলের নিকটে প্রায় নদী ব্যাষ্টিত ছোট ছোট দ্বীপ বলা যেতে পারে। যেমনটা উজানটিয়া, করিয়ার দিয়া, মগনামা, রাজাখালী।
উজানটিয়া অনেকটা পূর্ব—পশ্চিম লম্বা। উত্তর—দক্ষিণ ৩ কি.মি পূর্ব—পশ্চিম প্রায় ৬ কি.মি। ব্রিটিশ আমলে এক বর্ণনায় উজানটিয়া এরিয়া ৩৬০ দ্রোন তথা প্রায় ২৩০৪ একর। বর্তমান তথ্য মতে আয়তন ১৪.১৮ বর্গ কি.মি। জমির পরিমাণ ৩৫০১ একর। জনসংখ্যা ১৭,৪৯২ জন। ভোটার সংখ্যা ১২,৬৭৪ জন। জনাব সালাহ উদ্দিন আহমদ মগনামা থেকে উজানটিয়া পৃথক ইউনিয়ন করেন ২০০৩ সালে। উজানটিয়ার দক্ষিণ পাশে রয়েছে পূর্ব—পশ্চিম উজানটিয়া খাল। নামে খাল বললেও নদী বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। ব্রিটিশ পাকিস্তান আমলে এই খাল দিয়ে চট্টগ্রাম—কক্সবাজার স্টিমার চলাচল করত। সময়ে সময়ে মাতারবাড়ী করিয়ার মধ্য দিয়েও স্টিমার যেত।
১৯৮০ এর দশকে এরশাদ সরকার সমস্ত মহকুমাকে জেলায় উন্নিত করেন। তেমনিভাবে ১৯৮৪ সালে মহকুমা থেকে জেলায় উন্নিত হয় কক্সবাজার ।
১৯৬০ সালের ৩১ অক্টোবর প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়ের সাথে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস হয়। এতে কুতুবদিয়া পেকুয়া সহ বৃহত্তর চকরিয়া, বাঁশখালী, আনোয়ারা হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। এই অঞ্চলে ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ধব হয়। পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের জনপ্রিয় গভর্ণর ছিলেন আজম খান। তার রিলিপ বণ্টনসহ মানব কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ হিসেবে আজও সুনাম রয়েছে। অতঃপর আইয়ুব খান সরকার সাগর তীরবতীর্ এলাকায় বৃহৎ আকারের বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে। সাথে জায়গায় জায়গায় বর্ষাকালে বৃষ্টির পানির বের হয়ে যাওয়ার জন্য সুইচ গেইটও নির্মাণ করে দেয়। ফলে সম্পদের মূল্য দ্রুত বেড়ে যায়। ধান চাষে ব্যাপক ফলন হয়। যেহেতু বাহির থেকে লবণাক্ত পানি আসা বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৭২ সাল থেকে বাঁশখালী বৈলছড়ী গ্রামের বাড়ি থেকে আমাদের উজানটিয়া পারিবারিক এস্টেটে যাতায়াত হয়ে আসছে। সাথে রাজাখালী ত আছেই। তখন ছিল অবর্ণনীয় প্রতিকূল যোগাযোগ ব্যবস্থা।
সেই বৈলছড়ী থেকে গুনাগরী তথা হতে সাতকানিয়া ডলুব্রীজ সেখান হতে রিক্সায় আরাকান মহাসড়ক, কাঠের বাসে চকরিয়া, রিক্সায় ভাটাখালী খাল, নৌকায় পার হয়ে জীপ বেবি টেক্সী স্টেশন, এখান থেকে লক্কর চক্কর চাঁদের গাড়ি করে ইলশিয়া বা ঢেমুশিয়া। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে উজানটিয়া নদী পার হয়ে আবার হেঁটে উজানটিয়া আমাদের এস্টেটের কাছারীতে পৌঁছতে ন্যূনতম ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লাগত। অথবা বাঁশখালী বৈলছড়ী থেকে ইঞ্জিনবিহীন সাম্পানে জোয়ার ভাটার উপর নির্ভরশীল হয়ে উজানটিয়া যাওয়া—আসা হত।
উজানটিয়াসহ সারা দেশে স্থল যোগাযোগ পর্যায়ক্রমে উন্নতি লাভ করতে থাকে। ছোট ছোট খাল চড়ার উপর ব্রীজ এবং মাটি কেটে গ্রাম্য রাস্তাও পর্যায়ক্রমে উন্নতি লাভ করে ১৯৮০ এর দশকে বলা যাবে। এতেও উজানটিয়ার সাথে সাথে স্থল যোগাযোগ শুরু হয়েছে বলা যাবে না। ১৯৭০ এর দশকে উজানটিয়ার মানুষ স্টিমারে অথবা ইঞ্জিন বোটে চট্টগ্রাম শহরে যাতায়াত করত। তেমনি কক্সবাজার যাতায়াত করত ইঞ্জিন বোট যোগে। তা ১৯৮০ দশকেও ছিল বলা যাবে। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ২০ বছরও স্থল যোগাযোগ উন্নতি লাভ করেনি। এতে মনে করি অন্যতম কারণ উজানটিয়ার অবস্থান বৃহত্তর চকরিয়ার একদম পশ্চিম দক্ষিণ কোণায়। উজানটিয়া নদীর দক্ষিণ পাড়ে মাতারবাড়ী ধলঘাট দ্বীপ। যা মহেশখালী উপজেলার আওতায়। উজানটিয়া—মগনামা—রাজাখালী এক ইউনিয়ন।
১৯৭৩ সালে রাজাখালীকে ভাগ করে পৃথক ইউনিয়ন করা হয়। জনদরদী জনাব সালাহ উদ্দিন আহমদের প্রচেষ্টায় ২০০২ সালের ২৩ এপ্রিল উজানটিয়া—মগনামা পৃথক পৃথক ইউনিয়ন হয়ে যায়।
১৯৯১ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়। বিএনপি লাভ করে ১৪০ আসন এবং আওয়ামীলীগ লাভ করে ৮৮ আসন। বিএনপি সরকার গঠন করে। মাত্র ২ মাসের ব্যবধানে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল স্মরণাতীতকালের ঘূর্ণিঝড় সাথে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস হয়। এতে বৃহত্তর চকরিয়া পশ্চিমাংশ বাঁশখালী কুতুবদিয়া মাদারবাড়ী ধলঘাট আনোয়ারা পশ্চিম পটিয়া চট্টগ্রাম মহানগরী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাজার হাজার নর—নারী মারা যায়। গবাদি পশু কত হাজার মারা যায় তা অজানা। মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অধিকাংশ ঘর—বাড়ি ধুলিসাৎ হয়ে যায়। উজানটিয়াতেও শত শত মানুষ মারা যায়। আমাদের পাড়ায়ও ৮৮ জন মানুষ মারা যায়। চট্টগ্রামের নন্দনকানন টিএনটি টাওয়ার ভেঙ্গে যাওয়ায় টেলি যোগাযোগ বন্ধ থাকে। স্যাটেলাইট ব্যবস্থা চালু হওয়ায় বিশ্বব্যাপী প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ব্যাপক প্রচার পায়। এতে আরবলীগ সৌদি আরব জাতিসংঘের অধীনে সেবা কার্যক্রমসহ বিশ্বের নামকরা দাতা সংস্থাগুলো এখানকার ক্ষতিগ্রস্থের উন্নয়নে ঝাপিয়ে পড়ে। কেউ নির্মাণ করে দেয় সাইক্লো সেন্টার, কেউ করে দেয় বৃহৎ আকারের বেড়িবাঁধ। তেমনিভাবে মগনামা হয়ে উজানটিয়ার পশ্চিম দিকে পূর্বপাড়ে আগের চেয়ে কয়েকগুণ বড় করে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে দেয় ১৯৯৩ সালের দিকে। কিন্তু দীর্ঘ ৩০ বছর পার হয়ে গেলেও পানি উন্নয়ন বোড তহবিলের অভাবে যথাযথ মেরামত সংস্কার করেছে বলতে পারি না। উজুহাত একটায় ফান্ডের অভাব।
১৯৯০ এর দশক থেকে উজানটিয়ার সাথে পর্যায়ক্রমে সড়ক যোগাযোগ উন্নতি হতে থাকে। যেহেতু উজানটিয়ার পূর্বপাশে মাতামুহুরী নদী প্রবাহিত কাজেই এদিকে যাতায়াত ব্যবস্থা প্রতিকূল। ফলে উজানটিয়ার স্থলযোগাযোগ মগনামা হয়ে যায়।
অপরদিকে জনদরদী জনাব সালাহ উদ্দিন আহমদ বিশাল চকরিয়া উপজেলার পশ্চিম—উত্তর ভাগ নিয়ে পৃথক একটি পেকুয়া উপজেলা গঠন করেন। এই পেকুয়া ছিল কবির মিয়ার বাজার এবং কবির মিয়ার পিতা গুরা মিয়া চৌধুরীর নামে (জি.এম.সি) হাই স্কুল। কিন্তু পেকুয়ারই কৃতি পুরুষ জনাব সালাহ উদ্দিন আহমদের একক প্রচেষ্টায় আজ পেকুয়া উপজেলা সদর উপজেলা হিসেবে যাবতীয় অবকাঠামো নিমার্ণ হয়ে গেছে। এর সুফল উজানটিয়াবাসীও ভোগ করতেছে।
উজানটিয়াবাসীর তিনটা বড় সমস্যা রয়েছে গেছে।
১. উজানটিয়ার দক্ষিণ পাশে বেড়িবাঁধের অবস্থা খুবই নাজুক:
এখানে ব্লক পেলে বেড়িবাঁধ রক্ষা করা অপরিহার্য। বিগত প্রায় ২০/৩০ বছর বা তারও আগে থেকে উজানটিয়ার পূর্বপাশে বদরখালী সংলগ্ন নদীতে চর জমতে থাকে। এই চর বছর বছর বড় হতে হতে মাতামুহুরী নদীর ে¯্রাত দক্ষিণ দিকে না গিয়ে পশ্চিম দিকে উজানটিয়া খালের দিকে প্রবাহিত হয়ে কুতুবদিয়া চ্যানেলে পতিত হচ্ছে। গত ৮/১০ বছর যাবত উজানটিয়া খালের ধারণ ক্ষমতা বহুগুণ বেশি মাতামুহুরী নদীর ে¯্রাত হওয়ায় পশ্চিম উজানটিয়া ও পূর্ব উজানটিয়া বেড়িবাঁধ ভয়াবহ ভাঙ্গনের কবলে পড়ে।
পশ্চিম উজানটিয়ায় এলাকার ঘর—বাড়ি সম্পদ রক্ষায় পারিবারিকভাবে বহু লক্ষ টাকা খরচ করা হয় বেড়িবাঁধ রক্ষার জন্য। তারপরও এই ভাঙ্গন টেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মেরামতও যথাযথ নয়। এখানে ব্লক পেলে জনগণের জানমাল রক্ষা করা অতীব প্রয়োজন।
২. মাতারবাড়ী—উজানটিয়া ব্রীজসহ সংযোগ সড়ক নির্মাণ:
উজানটিয়া বৃহত্তর চকরিয়ার একদম শেষপ্রান্তে। পশ্চিম উজানটিয়া করিমদাদ মিয়ার ঘাট থেকে মাতারবাড়ী একটি ব্রীজ সময়ের দাবী। এই ব্রীজটি জনগণের বহুবিধ কল্যাণে আসবে।
৩. করিমদাদ মিয়া ঘাট থেকে কাটাখালী পর্যন্ত সড়কের উন্নয়ন:
উজানটিয়া করিমদাদ মিয়া ঘাট থেকে কাটাখালী ৭/৮ কি.মি সংলগ্ন সড়কটি পুরো উজানটিয়া ও দক্ষিণ মগনামার জনকল্যাণে উন্নয়ন করা খুবই প্রয়োজন। প্রতিদিন যাতায়াত করতেছে হাজারও মানুষ। চলাচল করতেছে ছোট বড় বিভিন্নমানের যানবাহন।
আশা করব, কক্সবাজারের কৃতি পুরুষ জনাব সালাহ উদ্দিন আহমদের মাধ্যমে উজানটিয়ার এ তিনটি বড় বড় সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।
আহমদুল ইসলাম চৌধুরী প্রাবন্ধিক,গবেষক,কলামিস্ট।