কুমিল্লা জিলা স্কুলের অতীত- গৌরবোজ্জ্বল বর্তমান প্রশংসনীয়। ১৮৩৭ ইংরেজীর ২০ শে জুলাই কুমিল্লা জেলা স্কুল স্থানীয় ম্যাজিষ্ট্রেট অফিসের তৎকালীন প্রধান কারণিক মি: হেনরী জর্জ লাইচেস্টার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। তখন এটা কুমিল্লা গভর্ণমেন্ট স্কুল নামে পরিচিত ছিল। ৫ জন ইউরোপীয়ান, ১ জন হিন্দু ও ৩ জন মুসলমান বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তির একটি কমিটির উপর এর পরিচালনার দায়িত্ব ন্যাস্ত ছিল। এদেশের অধিবাসীদের ইংরেজী শিক্ষায় শি
ক্ষিত করার জন্য এ বিদ্যালয় চালু করা হয়। ১৮৩৯ ইংরেজির ৬ ই মে মি: লাইচেস্টার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন। আমৃত্যু (১৮৭০) তিনি উক্ত পদে কাজ করে গেছেন।
‘ধর্মসাগর' বলে পরিচিত প্রকান্ড দীঘির পাড়ে একটা বাংলোতে প্রথম এর ক্লাশ শুরু হয়। পরবর্তীকালে সে জায়গায় সাবেকী ধরণের পাকা ভবন তৈরী করা হয়। প্রধান শিক্ষক সহ চারজন শিক্ষকদ্বারা চালু এ বিদ্যালয়ে তখন মাত্র ৩৫ জন ছাত্র ছিল। বিদ্যালয়ে পয়লা বছর কোন পরীক্ষা হয়নি এবং ১৮৩৯ ইংরেজি পর্যন্ত ছাত্রদের থেকে কোন বেতন নেয়া হয়নি। ঐ সনে ছাত্র সংখ্যা ৭৬ এ দাঁড়ায়। ক্রমশ ছাত্র সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৮৬৩ তে ৩৩ জন মুসলমানসহ মোট ছাত্রসংখ্যা ছিল ২১৩। তখন বিদ্যালয়ে কিছু সংখ্যক মগ এবং ভারতীয় খৃষ্টান পড়ুয়া ছিল।
জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার জন্য ছাত্রদের তৈরী করাই ছিল বিদ্যালয়ের প্রধান লক্ষ্য। মিঃ লাইচেস্টার এজন্য কৃতিত্বের হকদার। ১৮৫৪ ইংরেজিতে শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি নীতি পরিবর্তিত হয় । শিক্ষার ভার জনশিক্ষা দফতরের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়। ছাত্রসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে আরও একটি ক্লাশ চালু করা হয়। শিক্ষকমন্ডলীতে একজন প্রধান শিক্ষক, ৫ জন ইংরেজি শিক্ষক , একজন মাতৃভাষার পন্ডিত ও একজন মোলবী ছিলেন। প্রধান শিক্ষক মাসে দু'শো ও অন্যান্যরা মাসে বিশ থেকে ষাট টাকা করে মাইনে পেতেন।
১৮৬৩ ইংরেজিতে বিদ্যালয়ে পন্ডিতদের জন্য একটি ট্রেনিং সেকশন খোলা হয় আর এজন্য দু’টি ক্লাশ চালু হয়। অবশ্য ১৮৬৯ ইংরেজীতে ওটা চট্টগ্রামে সরিয়ে নেয়া হয়। ১৮৫৭ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে জুনিয়ার বৃত্তি পরীক্ষার স্থলে এন্ট্রান্স পরীক্ষা চালু হয়। ঐ সময় বিদ্যালয় ৪৯৩২ টাকা এক কালীন সাহায্য পেয়েছিল। ১৮৭০ সনে ছাত্র বেতন ও সরকারী সাহায্য বাবদ বিদ্যালয় পেয়েছিল মোট ৫৩৩০ টাকা পাঁচ আনা। ত্রিপুরার মহারাজা ও স্থানীয় জমিদারগণ তখন বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। ছাত্রদের জন্য তখন মহারাজা দু’টি ও রাজা সত্য চরণ ঘোষাল বছরে একটি করে বৃত্তি দিতেন।
১৮৭১ থেকে ১৫৫৮ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন যথাক্রমে বাবু উমাচরণ দাস,বাবু হরিপ্রসাদ ব্যানার্জী, বাবু জগবন্ধু ভদ্র, বাবু দ্বিজদাস দত্ত এবং মিঃ উইলিয়াম দত্ত। শিক্ষার প্রতি আগ্রহ জন সাধারণের ক্রমশ বাড়তে থাকে। ১৮৮৩ এর শেষ ভাগে ছাত্র সংখ্যা ছিল ৪০৪। ঐ সময় মুসলমান ছাত্র সংখ্যা ৬০ হতে ৭০ জন ছিল। ছাত্র সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে বিদ্যালয় গৃহের সম্প্রসারণ দরকার হয়ে পড়ে। এ সময় ৪টি নতুন কামরা তৈরী করা হয়।
ঐ সময় মুহসীন ফান্ড হতে বিদ্যালয় বছরে ৮০০ টাকা পেত। তা থেকে একজন ফার্সী শিক্ষকের বেতন, মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি ও যে সকল মুসলমান ছাত্র বেতন দানে অপারগ তাদের সাহায্য দেয়া হত। কালক্রমে খেলাধুলার প্রতি ঝোঁক বেড়ে যায়। ফলে ১৮৮৫ সালে একজন শরীরচর্চা শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়।
১৫৫৮ থেকে ১৯০৭ পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠা ও যোগ্যতার সাথে যেসব প্রধান শিক্ষক কাজ করে গেছেন এরা হলেন বাবু কৈলাশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, সূর্য কুমার রায় ও বাবু চিন্তা হরণ চক্রবর্তী । তাদের আমলে বিদ্যালয় নানাদিক দিয়ে উন্নত হয়। ১৯০১ ইংরেজীতে ৪ জন ছাত্র নিয়ে ‘ই’ ক্লাশ খোলা হয়। জরীপ শিক্ষাদান এ ক্লাশের লক্ষ্য ছিল। এর স্থান দেয়ার জন্য ৪১২৫ টাকা ব্যয়ে একটা ধহহবী তৈরী করা হয়। ১৮৯৬ এ একজন ড্রইং শিক্ষক এবং ১৯০২ এ একজন বিজ্ঞান শিক্ষক নিয়োগ করা হয়।
এন্ট্রান্স পরীক্ষার ফল বরাবরই ভাল ছিল। একটি ছাত্র ১৯০০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ২য় এবং ১৯০১ সালে ৮ম স্থান অধিকার করে। পরবর্তী বার বছর প্রধান শিক্ষকতা করলেন বাবু রাম মোহন মিত্র, বাবু অভয় চরণ দাস, বাবু শরৎ চন্দ্র বসু ও খান সাহেব ওয়াহিদুন নবী। ১৯১৫ সালের ৩রা মার্চ বিকাল পাঁচটায় বাড়ী ফেরার পথে বাবু শরৎ চন্দ্র বসু কতিপয় দুষ্কৃতিকারী কর্তৃক নিহত হলেন। বিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটা বড় দুর্ভাগ্য জনক কথা। ১৯১৩ সালে বিদ্যালয়ে ছাত্র বেতন ছিল এক টাকা আট আনা থেকে তিন টাকা। ১ম ও ২য় শ্রেণি ১৯০৯ সালে ৩য় শ্রেণি ১৯১৭ সালে এবং চতুর্থ শ্রেণি ১৯৬২ সালে তুলে দেয়া হয়।
১৯১১ সালের ৪৪ জন ছাত্রের বাসের উপযোগী হিন্দু হোষ্টেল নির্মাণ করা হয়। একজন শিক্ষকের উপর এর পরিচালনার ভার ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি মাসে বিশ টাকা করে পেতেন। ছাত্র সংখ্যা বাড়তির ফলে দু’বছর পরে একজন ইংরেজির শিক্ষক ও একজন আরবীর শিক্ষক নিয়োগ করা হয়। ৫ জন মুসলমানসহ তখন শিক্ষক সংখ্যা ছিল ১৯ জন। ঐ বছর ৭৫৮ টাকা ব্যয়ে একটা টিনের শেড তৈরী করা হয়। স্কুল লাইব্রেরী পরিচালনার জন্য ১৯১৯ সালে একজন শিক্ষককে মাসিক ২০ টাকা করে ভাতা দেয়া হয়।
বাবু রসিক চরণ বসু নামে একজন ড্রিল শিক্ষকের আগ্রহে ১৯২০ সালে বিদ্যালয়ে প্রথম স্কাউট ট্রুপ গঠন করা হয়। পরবর্তী দু’দশক যারা বিদ্যালয় তরণীর কর্ণধার ছিলেন, এরা হলেন রায় সাহেব জ্যোতিষ মুখার্জী, বাবু উপেন্দ্র চন্দ্র গ্রহ এবং মৌলভী আবদুল মান্নান সাহেব। বিদ্যালয়ের জন্য ঐ সময়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । অসহযোগ আন্দোলনে তখন বাংলার আকাশ বাতাস মুখরিত হয়েছিল। বিদ্যালয় সে অবস্থা কাটিয়ে উঠেছিল সাফল্যের সাথে।
বিদ্যালয় লাইব্রেরীতে বইয়ের সংখ্যা ক্রমশই বাড়তে থাকে। বাংলা সরকারের ছাঁটাইয়ের দরুণ বইয়ের জন্য মুঞ্জুরী কমিয়ে একশত টাকা করা হয় এবং ১৯৩৩ সালে লাইব্রেরীয়ানের পদ তুলে দেয়া হয়। ১৯১০ সালে নামাজের যে ঘর তোলা হয়েছিল, সত্তর বছর পরে মৌঃ মোঃ ফয়েজ সাহেবের উদ্যোগে তার দেয়াল ও ভিটি পাকা করা হয়। মিঃ জে.এম. বটমলী যখন জনশিক্ষার ডিরেক্টর ছিলেন তখন মাঠের উত্তর দিকে একটি দ্বিতল ভবনের প্ল্যান তৈরী করা হয়েছিল এবং সরকারের নিকট দাখিল করা হয়েছিল। ১৯৬৯ ইং ঐ প্ল্যান বাস্তবায়নের কাজ শেষ হয়েছে।
দেশ বিভাগের পর বিদ্যালয়ের সুনাম আরও বাড়তে থাকে।এর কৃতিত্ব যাদের তাঁরা হলেন ইন্দু ভূষণ বড়ুয়া, মিঃ মোঃ শরীফ, মৌলভী জিয়া উদ্দিন আহমদ, মিঃ সৈয়দ হাফিজুর রহমান, মিঃ আবুল হাছান ও মিঃ আবদুর রশীদ। ১৯৬০ সালে বিদ্যালয় পাইলট সেকেন্ডারী স্কুলের অন্তর্ভূক্ত হয়। শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ মোতাবেক বিদ্যালয়ে নানা গ্রুপ চালুর প্রয়োজন দেখা দেয়। জনাব রশীদ সাহেব ১৯৬১ সালে পাইলট স্কীম সম্বন্ধে ট্রেনিং লাভের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গেলেন। স্কুলের উন্নয়নমূলক কাজ তিনি বিদেশে যাওয়ার আগে শুরু করেছিলেন। তাঁর বিদেশে অবস্থানকালে স্কুলের দায়িত্বভার ন্যাস্ত ছিল তৎকালীন সহকারী প্রধান শিক্ষক জনাব নূর আহমদ খান সাহেবের উপর। তাঁর বিশেষ আগ্রহে ১৯৬২ সালে বিদ্যালয়ে কারিগরী শাখা চালু হয়। ঐ বছরই এজন্য একজন শিক্ষক নিযুক্ত হন এবং একটি Workshop তৈরী করা হয়। বিজ্ঞান শিক্ষার সুবিধের জন্য একটি একতলা ভবন তৈরী করা হয়।
জনাব রশীদ সাহেব যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসার কয়েকমাস পরেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৯৬৩ ইংরেজির ফেব্রুয়ারী মাসে ইন্তেকাল করেন। অতঃপর প্রধান শিক্ষক হয়ে এলেন জনাব তাসাদ্দুক লোহানী সাহেব। তাঁর আমলে কারিগরী শাখার আরও উন্নতি বিধান করা হয়। বাণিজ্য বিভাগ চালু করা হয়। ফের্ড ফাউন্ডেশন থেকে এ শাখার জন্য টাইপ রাইটার পাওয়া যায়।
১৯৬৪ সালে বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ, ৭ম, ও ৮ম শ্রেণিতে একটি করিয়া সেকশন খোলা হয়। এজন্য ৪ জন ইংরেজি শিক্ষক, একজন আরবী শিক্ষক, একজন মাতৃভাষার শিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। ৩ জন এম,এল, এস, এস এ সময় নিয়োগ করা হয়। জনাব লোহানী সাহেব ১৯৬৬ সালে পাবনা জিলা স্কুলে বদলী হয়ে চলে যান। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন জনাব নুর আহমদ খান সাহেব। বিদ্যালয়ের সর্বোতোমুখী উন্নয়ন তাঁর দিনের কাজ ও রাতের স্বপ্ন ছিল। বিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফলাফল আশাতীত রূপ ভাল। Extra Curricular activities এ বিদ্যালয়ের সাফল্য কোন মতেই কম নয়। তিনি বিদ্যালয়ের উন্নতির জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন। তা স্বীকৃতি পেয়েছে কুমিল্লা বোর্ডের সেরা প্রধান শিক্ষক ও তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কর্তৃক প্রদেশের সেরা প্রধান শিক্ষক হিসেবে পুরস্কার প্রাপ্তির মাধ্যমে। কুমিল্লা বোর্ডের প্রতিষ্ঠা কাল থেকে এ বিদ্যালয় এস,এস,সি পরীক্ষায় বরাবর সর্বোচ্চ স্থান পেয়েছে। জনাব নুর আহমদ খান সাহেব তাঁর ৬০ বছর বয়স পূরণ হলে পর ১৯৭২ সনের মে মাসে অবসর গ্রহণ করেন।