23/06/2026
পলাশীর যুদ্ধের পর ভাইস অ্যাডমিরাল ওয়াটসন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে একটা চিঠি লেখেন। এটা ছিল পলাশীর যুদ্ধের পর কলকাতা টু লন্ডন প্রথম চিঠি। কিন্তু তিনি চিঠিটা পাঠাতে পারেন নাই। অসুস্থ হয়ে পড়ায় কালা জ্বরে ৩০ দিন পরে মারা যান।
নতুন ভাইস অ্যাডমিরাল পোকক এই চিঠি লন্ডনে পোস্ট করেন। লর্ড ক্লাইভ ও মীর জাফরের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির ধারাগুলো এই চিঠিতে আছে। যা নিম্নরূপ:
"ভাইস অ্যাডমিরাল পোকক প্রেরিত পত্র, তারিখ, ২০ আগষ্ট ১৭৫৭ ঈসায়ী, কলিকাতার অদূরে হুগলি নদীতে নোঙরকৃত টাইগারনাম্নী জাহাজ হইতে, ভাইস অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের মৃত্যুর সংবাদ সম্বলিত, যিনি জ্বরে আক্রান্ত হইয়া তৎোল্লিখিত মাসের ১৬ তারিখে ইন্তেকাল করিয়াছেন।
এবং ইহার সহিত সংযুক্ত করিতেছি উক্ত প্রয়াত ভাইস অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের একটি পত্রের প্রতিলিপি, যাহার তারিখ ১৬ জুলাই, ১৭৫৭ ঈসায়ী, কলিকাতার অদূরে কেন্টনাম্নী জাহাজ হইতে লিখিত, যাহাতে নিম্নলিখিত সংবাদসমূহ বিবৃত হইয়াছে। [এতদ্দ্বারা গেজেটভুক্ত]
কিংস ফিশারনাম্নী জাহাজের কাপিতান টবির মারফত, আমি ২৪ এপ্রিল তারিখের একটি পত্রে আপনাদিগকে সণ্ডন নগুরের শহর ও দুর্গের আত্মসমর্পণের কথা জানাইয়াছিলাম (দ্রষ্টব্য খণ্ড ২৭, পৃষ্ঠা ৪২৯), এবং সেই পত্রেই আমি উল্লেখ করিয়াছিলাম যে নবাব সোরাজা উদ দাউলা শান্তিচুক্তির শর্তাবলী পালনে কতটা অনীহা প্রকাশ করিয়াছিলেন।
যাহার ফলে নবাবের দরবারের নেতৃস্থানীয় আমলাগণ বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে তিনি ক্ষমতায় থাকাকালীন শান্তিচুক্তি তাহাদের দেশে কখনোই প্রতিষ্ঠিত হইবে না, এবং তাই তাহারা তাহাকে (নবুবকে) ক্ষমতাচ্যুত করিবার নিমিত্ত একটি জোট গঠনের প্রস্তাব করিয়াছিলেন।
প্রমুখের মধ্যে ছিলেন মীর জাফিয়ের আলি কাউন, তাহার একজন প্রধান সেনাপতি, যিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে ক্ষমতাচ্যুত করিতে প্রবলভাবে উদগ্রীব হইয়া ওঠেন এবং এই পরিকল্পনার কথা কোম্পানি বাহাদুরের কাউন্সিলের দ্বিতীয় সচিব মিষ্টার ওয়াটসকে জানান; যাহার লিখিত ২৫ ও ২৮ এপ্রিলের পত্রের মারফত কোম্পানি বাহাদুরের কমিটি এই বিষয়ে অবগত হয়, যাহা যথাসাধ্য মনোযোগসহকারে আলোচনা করা হয়।
এবং নবাবের আচরণ সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে পর্যালোচনা করিবার পর, যিনি শান্তি চুক্তির শর্তাবলী পালনে এতটাই ব্যর্থ হইয়াছিলেন যাহা তিনি এত গাম্ভীর্যপূর্ণভাবে শপথ নিয়াছিলেন যে পালন করিবেন, যে তিনি আমাদের কাশিমবাজারে একটি সেনাচৌকি স্থাপন করতে পর্যন্ত অনুমতি প্রদান করেন নাই।
এবং কড়া নির্দেশ দিয়াছিলেন যাহাতে এক পাউন্ড বারুদ বা গোলাও নদী দিয়ে উজানে যাইতে না পারে। এহেন গুরুতর পরিস্থিতির সহিত যুক্ত হয় তাহার গোলকুন্ডা প্রদেশের ফরাসি সেনাপতি মসিয়ে বুসিকে তাহার সর্বাধিক সংখ্যক সৈন্য লইয়া তাহার সহিত যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর নিশ্চিত সংবাদ।
যাহা আমাদের এই বিশ্বাস করার সামান্যতম কারণও দেয় নাই যে তিনি আমাদের সহিত শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখিবার কোনো অভিপ্রায় পোষণ করেন, যতদিন না তিনি মনে করেন যে তিনি আমাদিগের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিযুক্ত হইতে অক্ষম।
তাই এটি সিদ্ধান্ত লওয়া হয় যে মীর জাফিয়ের আলি কাউনের সহিত আমাদিগের সৈন্যবাহিনী যুক্ত করা সর্বোত্তম হইবে, এই পদক্ষেপটিই দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার এবং ইংরাজদিগের একটি সুদৃঢ় ও স্থায়ী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করিবার সর্বাধিক কার্যকর উপায় হিসেবে প্রতীত হয়।
এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর, আমাদিগের সেনাবাহিনী গত মাসের ১৩ তারিখে সণ্ডন নোগুর হইতে কসিম বাজার অভিমুখে যাত্রা করে; এবং কর্নেল রবার্ট ক্লাইভের সহিত যত বেশি সম্ভব ইউরোপীয় সৈন্য রাখিবার লক্ষ্যে, আমি চন্দননগরে সেনাচৌকি স্থাপন করিতে এবং তাহার সহিত এই অভিযানে একজন লেফটেন্যান্ট, ৭ জন মিডশিপম্যান এবং ৫০ জন নাবিককে গোলন্দাজ হিসেবে কাজ করিবার জন্য পাঠাইতে সম্মত হই।
আমি ২০-কামান বিশিষ্ট জাহাজটিকে হুগলির উপরে নোঙর করার নির্দেশও দিই, যাহাতে আমাদিগের যোগাযোগ ব্যবস্থা অবিচ্ছিন্ন থাকে।
১৯ জুন, কাটোয়া দুর্গ ও শহর, যাহা নদীর এই পারে অবস্থিত এবং কসিমবাজারের নিকট একটি দ্বীপের উপরিভাগে প্রতিষ্ঠিত, একটি বিশেষ বাহিনী দ্বারা দখল করিয়া লওয়া হয়। সে স্থলে সেনাবাহিনী মীর জাফিয়ের আলি কাউনের নিকট হইতে সংবাদের জন্য দুই-তিন দিন অবস্থান করে।
কাউনকে নবাবের বিরোধী জোটের সকলে সম্মত হইয়া নয়া নবাবী পদে অভিষিক্ত করিবার সিদ্ধান্ত লয়, কারণ তিনি একটি সম্মানিত বংশের লোক এবং সকল শ্রেণির মানুষের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত।
২২ তারিখে তাহারা নদী পার হন, এবং পরদিন ২৩ জুন সোরাজা উদ দাউলার সহিত এক চূড়ান্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যেখানে আমাদিগের সৈন্যবাহিনী এক সম্পূর্ণ বিজয় অর্জন করে, তাহার সেনাবাহিনীকে পলায়নে বাধ্য করে এবং তাহার শিবির দখল করে, সাথে ৫০-এর অধিক কামান ও তার সমস্ত মালপত্র দখলে লয়।
তাহার সহিত ৫০ জন ফরাসি সৈন্যও যোগ দিয়াছিল, যাহারা তাহার গোলন্দাজ বাহিনীকে পরিচালনা করিতেছিল; এবং সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য হিসাব অনুযায়ী, মীর জাফিয়ের আলি কাউন এবং রায় দুর্লভ প্রমুখ ইংরাজ মিত্রের নেতৃত্বাধীন সৈন্য ছাড়াই, নবাব বাহিনীর সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২০,০০০ পদাতিক।
শত্রু শিবিরে নিহতের সংখ্যা কম ছিল, কারণ তারা শুধু গোলাবর্ষণের মুখে দাঁড়াইয়াছিল। আমাদিগের পক্ষে প্রায় ১৯ জন ইউরোপীয় নিহত ও আহত হয়, এবং ৩০ জন কালো (নেটিভ) সিপাহী নিহত হয়। পরাজয়ের পর সোরাজা উদ দাউলা গোপনে সরিয়া পড়েন; তাহার সহিত তাহার প্রধানমন্ত্রী মন্টোলি এবং তার এক সেনাপতি মানিক চাঁন্দও পলায়ন করেন।
২৬ জুন, মীর জাফিয়ের আলি কাউন মুরসেডাবাড শহরে প্রবেশ করেন; এবং ৩৯তম রেজিমেন্টের কর্নেলের একটি পত্র হইতে আমরা অবগত হই যে তিনি মীর জাফিয়ের আলি কাউনকে এই প্রদেশের নবাবদের সুপ্রাচীন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করিয়াছেন; এবং বাঙ্গালাহ, বাহার ও ওরিক্সা প্রদেশের সোবেডার হিসেবে সকল শ্রেণির মানুষের পক্ষ হইতে তাহাকে যথারীতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হইয়াছে।
৩০ তারিখে, গভীর রাতে, কর্নেল ক্লাইভের লিখিত একটি পত্র আসে, যাহাতে জানানো হয় যে সোরাজা উদ দাউলাকে বন্দি করা হইয়াছে; এবং, এ মাসের ৪ তারিখে, তিনি কমিটিকে জানান যে মীর জাফিয়ের আলি কাউনের পুত্র ও তাহার দলবল কর্তৃক তাহাকে গোপনে হত্যা করা হইয়াছে।
নবাবের কোষাগার, পরীক্ষা করিয়া দেখা যায়, প্রত্যাশার তুলনায় ধন সম্পত্তি অনেক কম ছিল; তবে কর্নেল ক্লাইভ ইতিমধ্যে নিম্নোক্ত চুক্তিতে নির্ধারিত অর্থের এক-তৃতীয়াংশ পাঠাইয়া দিয়াছেন; এবং বলা হইতেছে যে আরও তৎ পরিমাণ অর্থ শীঘ্রই আসিবে যাহাতে মোট অর্ধেক পরিমাণ অর্থ ইংরাজদের নিকট হস্তান্তর সম্পন্ন হয়। বাকি অর্ধেক তিন বছরে, তিনটি বার্ষিক কিস্তিতে পরিশোধ করা হইবে।
কয়েক দিবস আগে মার্লবরো ইন্ডিয়াম্যান জাহাজ বিশাখাপত্তনম হইতে এখানে আসিয়া পৌঁছায়, এবং সংবাদ লইয়া আসে যে বিশাখাপত্তনম ২৬ জুন ফরাসিদের কাছে আত্মসমর্পণ করিয়াছে। সেথায় সেনাচৌকিতে ছিল ১৩০ জন ইউরোপীয় এবং ২০০ জন সিপাহী; এবং ফরাসিরা ৮৫০ জন ইউরোপীয় এবং ৬,০০০ সিপাহী, এবং একটি ছোট অশ্বারোহী দল লইয়া দূর্গ অবরোধ শুরু করিয়াছিল।
এক্ষণে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন, কর্নেল লর্ড ক্লাইভ, গভর্নর ড্রেক, মিস্টার ওয়াটস এবং কমিটির সাথে নয়া নবাব মীর জাফিয়ের আলী কাউনের সম্পাদিত সন্ধি উল্লেখ করিতেছি। ইহাতে মীর জাফিয়ের আলী কাউন স্বীকার করিয়াছেন:
১. নবাব সোরাজা উদ দাউলার সহিত কোম্পানি বাহাদুরের সম্পাদিত চুক্তি ও সন্ধি, আমি স্বীকার ও গ্রহণ করি।
২. ইংরেজদের শত্রুরাই আমাদিগের শত্রু, তাহারা ইউরোপীয় হোক বা অন্য কেহ।
৩. বাঙ্গালাহ, বাহার ও ওরিক্সা প্রদেশে ফরাসিদের যে সকল পণ্য ও কুঠি আছে, তাহা ইংরাজদের হাতে অর্পণ করা হইবে, এবং এই প্রদেশসমূহে ফরাসিদের আর কখনো কুঠি বা বসতি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হইবে না।
৪. কলিকাতা দখলের কারণে কোম্পানির যে ক্ষতি হইয়াছে এবং তাহাদের কুঠিগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য যে ব্যয় হইয়াছে, তাহা পূরণের নিমিত্ত আমি এক কোটি রুপি প্রদান করিব।
৫. কলিকাতা দখলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ইংরাজ অধিবাসীদের ক্ষতি পূরণের নিমিত্ত আমি ৫০ লক্ষ রুপি প্রদান করিব।
৬. জেন্টু (হিন্দু), মুসলমান প্রভৃতির যে ক্ষতি হইয়াছে, তাহা পূরণের নিমিত্ত আমি ২০ লক্ষ রুপি প্রদান করিব।
৭. কলিকাতার আর্মেনিয়ান অধিবাসীদিগের যে ক্ষতি হইয়াছে, তাহা পূরণের নিমিত্ত আমি ৭ লক্ষ রুপি প্রদান করিব। এই অনুদানের বণ্টন অ্যাডমিরাল, কর্নেল ও কমিটির সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করিবে।
৮. কলিকাতার চারিপ্বার্শে মারাঠা খাল-এর অভ্যন্তরে অবস্থিত ভূমি (যাহা বর্তমানে অন্য জমিদারদিগের অধিকারে রহিয়াছে), এবং খালের বাহিরে চারিপ্বার্শে ৬০০ গজ পর্যন্ত ভূমি, আমি সম্পূর্ণরূপে কোম্পানিকে অর্পণ করিব।
৯. কলিকাতার দক্ষিণে কুলপি পর্যন্ত বিস্তৃত ভূমির জমিদারি কোম্পানি বাহাদুরের হাতে এবং তাহাদের শাসন ও আদেশের অধীনে থাকিবে। তৎ অঞ্চলের প্রতিটি জেলার প্রচলিত খাজনা ইংরাজদিগের মাধ্যমে রাজকোষে পরিশোধ করা হইবে।
১০. যখনই আমি কোন কারণে কোম্পানি বাহাদুরের সৈন্যবাহিনীর সহায়তা প্রার্থনা করিব, তাহাদের বেতন ও ব্যয় আমার দ্বারা পরিশোধ করা হইবে।
১১. হুগলি হইতে নিম্নাঞ্চলে, আমি নদীর তীরে কোনো নতুন দুর্গ নির্মাণ করিব না।
১২. যত দ্রুত আমি তিন প্রদেশের সুবাহডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হব, আমি অবিলম্বে উপরোক্ত শর্তাবলী পালন করব।
রমজান মাসের চাঁন্দের ১৫ তারিখ, বর্তমান সম্রাটের রাজত্বের চতুর্থ বছরে স্বাক্ষরিত।
স্বহস্তে লিখিত:
"আল্লাহ ও তাহার নবীকে স্বাক্ষ্য রাখিয়া, আমি শপথ করিতেছি, যতদিন আমার দেহে প্রাণ আছে - আমি এহি চুক্তির শর্তাবলী পালন করিব।"
— মীর মাহমুদ জাফিয়ের কাউন বাহাদুর,
সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর মোঘলের গোলাম।