08/08/2026
জনগণের ভাষা VS Technical Language
একই কথা, শুধু একজন বোঝে মানুষ, আরেকজন বোঝে PowerPoint!
আমাদের দেশে সমস্যার অভাব নেই।
তবে সমস্যার চেয়েও বড় সমস্যা হলো, সমস্যাটা জনগণকে এমন ভাষায় বোঝানো হয় যে, সমস্যা শেষে নিজেই নিজের পরিচয় ভুলে যায়!
ধরুন, বাজার থেকে আপনি এক প্যাকেট বিস্কুট কিনলেন। খুলে দেখলেন, বিস্কুটের চেয়ে বাতাস বেশি।
আপনি বললেন,
“ভাই, প্যাকেটে মাল কম কেন?”
Technical Language বলল,
“The observed net content may have been influenced by permissible process variation subject to applicable metrological tolerance.”
আপনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“ভাই, আমি বিস্কুট কিনেছি। IELTS দিতে আসিনি।”
জনগণের ভাষা খুবই বেয়াদব
কারণ জনগণের ভাষা সরাসরি কথা বলে।
জনগণ জিজ্ঞেস করে,
“পানিটা খাওয়া যাবে তো?”
আমরা বলি,
“Sample-এর physicochemical and microbiological parameters applicable standard-এর specified limit-এর মধ্যে পাওয়া গেছে।”
জনগণ আবার জিজ্ঞেস করে,
“মানে?”
“Compliant.”
“মানে?”
“সন্তোষজনক।”
“ভাই, খাওয়া যাবে?”
“জি।”
জনগণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“এই ‘জি’ কথাটা প্রথমে বললে সরকারের কত কালি বাঁচত!”
Technical Language-এর একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে
সে ছোট কথাকে বড় করতে পারে।
জনগণ বলে,
“তেলে ভেজাল আছে।”
Technical Language বলে,
“প্রাপ্ত পরীক্ষণ ফলাফলের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট নমুনার এক বা একাধিক নির্ধারিত গুণগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মানের সঙ্গে অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হয়েছে।”
জনগণ বলে,
“তার মানে ভেজাল?”
Technical Language ঘামতে শুরু করে।
“বিষয়টি এভাবে সরলীকরণ করা সমীচীন হবে না।”
জনগণ বলে,
“তাহলে তেলটা খাব?”
Technical Language এবার ফাইল খোঁজে।
জনগণ আসলে বিজ্ঞানবিরোধী নয়
আমরা অনেক সময় ভুল করি এখানে।
ভাবি, কঠিন ভাষায় বললেই কথার ওজন বাড়ে।
“Risk-based surveillance mechanism”,
“Conformity assessment framework”,
“Regulatory compliance ecosystem”,
“Post-market surveillance”…
সবই দরকারি শব্দ। বিশেষজ্ঞের টেবিলে এগুলোর প্রয়োজন আছে।
কিন্তু রহিম চাচা বাজারে দাঁড়িয়ে “post-market surveillance” কিনতে যান না।
তিনি জানতে চান,
“যে জিনিসটা কিনছি, এটা ঠিক আছে তো?”
রহিম চাচা ISO-এর clause নম্বর না জানলেও একটা জিনিস খুব ভালো বোঝেন:
এক কেজি বলে ৯০০ গ্রাম দিলে তিনি ঠকেছেন।
এই জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ লাগে না।
ধরুন, টেলিভিশনে টক শো চলছে
উপস্থাপক প্রশ্ন করলেন,
“বাজারে খারাপ পণ্য থাকলে আপনারা কী করেন?”
একজন বিজ্ঞ কর্মকর্তা উত্তর দিলেন,
“আমরা prevailing regulatory framework-এর আওতায় risk-based market surveillance পরিচালনার পাশাপাশি conformity assessment এবং enforcement mechanism strengthen করছি।”
টিভির সামনে বসা কুদ্দুস মিয়া স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“লোকটা কি বলল?”
স্ত্রী বললেন,
“মনে হয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।”
কুদ্দুস মিয়া বললেন,
“তাহলে ‘ব্যবস্থা নিচ্ছি’ বললেই তো হতো!”
সবচেয়ে মজার শব্দ: “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা”
সরকারি ভাষার এক অমর সৃষ্টি।
চিঠিতে লেখা হয়,
“প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।”
কী ব্যবস্থা? কে নেবে? কখন নেবে? নেওয়ার পরে কী হবে? এসব প্রশ্ন করা অসৌজন্য।
কারণ “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” এমন এক রহস্যময় প্রাণী, যাকে সবাই চেনে কিন্তু কেউ কোনোদিন চোখে দেখেনি।
জনগণের ভাষা অবশ্য এত ভদ্র নয়।
তারা বলে,
“কাজটা কবে হবে?”
এই একটি প্রশ্নের কাছে হাজার শব্দের Technical Language মাঝে মাঝে বড় অসহায়!
তবে Technical Language-কে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যাবে না
কারণ বিজ্ঞান, আইন, মান, পরীক্ষা, আদালত, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সুনির্দিষ্ট পরিভাষা দরকার।
সমস্যা Technical Language-এ নয়।
সমস্যা হলো, কোন ঘরে কোন ভাষায় কথা বলতে হয়, সেটা ভুলে যাওয়া।
ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলছেন?
Technical Language ব্যবহার করুন।
আদালতে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দিচ্ছেন?
নির্ভুল terminology ব্যবহার করুন।
আন্তর্জাতিক বৈঠক?
Standard terminology ব্যবহার করুন।
কিন্তু বাজারের একজন মা যদি জিজ্ঞেস করেন,
“এই দুধটা আমার বাচ্চাকে খাওয়ানো নিরাপদ তো?”
তখন তাঁকে Codex-এর ইতিহাস শোনানোর দরকার নেই।
প্রথমে বলুন,
“পরীক্ষায় এই নমুনায় নির্ধারিত মানের বাইরে এই সমস্যাটি পাওয়া গেছে। তাই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
তারপর প্রয়োজন হলে বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করুন।
কারণ তথ্য যত বড়ই হোক, মানুষ না বুঝলে যোগাযোগটা ছোটই থেকে যায়।
আসল সংকট ভাষার নয়, দূরত্বের
রাষ্ট্র বলে,
“Stakeholder engagement বৃদ্ধি করা হবে।”
জনগণ বলে,
“আমাদের কথাটা শুনবেন?”
রাষ্ট্র বলে,
“Consumer awareness enhancement প্রয়োজন।”
জনগণ বলে,
“সহজ করে বুঝিয়ে বলেন।”
রাষ্ট্র বলে,
“Non-compliant economic operators-এর বিরুদ্ধে enforcement action…”
জনগণ বলে,
“অন্যায় করলে ব্যবস্থা নিন।”
খেয়াল করলে দেখা যাবে, দুই পক্ষ প্রায় একই কথাই বলছে।
পার্থক্য শুধু এই যে,
এক পক্ষ কথা বলে অভিধান সঙ্গে নিয়ে, আরেক পক্ষ কথা বলে জীবন সঙ্গে নিয়ে।
তাই ভাষারও মান নিয়ন্ত্রণ দরকার
আমরা খাদ্যের মান দেখি।
ওজনের মান দেখি।
পণ্যের মান দেখি।
কিন্তু কথার মানও দেখা দরকার।
একটি ভালো সরকারি বক্তব্যের তিনটি পরীক্ষা থাকা উচিত:
মানুষ বুঝল কি?
মানুষ বিশ্বাস করল কি?
মানুষ জানল, এখন তার কী করা উচিত?
তিনটির উত্তর যদি “না” হয়, তাহলে বক্তব্য technically শতভাগ correct হলেও communication পরীক্ষায় সে ফেল।
কারণ জনগণকে মুগ্ধ করার জন্য কথা বলা হয় না। জনগণকে বোঝানোর জন্য কথা বলা হয়।
Technical Language প্রয়োজন নির্ভুলতার জন্য।
জনগণের ভাষা প্রয়োজন বিশ্বাসের জন্য।
দুটোর মধ্যে যুদ্ধ লাগানোর দরকার নেই।
বরং বিজ্ঞানের সত্যকে মানুষের ভাষায় পৌঁছে দেওয়াটাই দক্ষতা।
কারণ শেষ পর্যন্ত একজন নাগরিকের প্রশ্ন খুব সাধারণ:
“আমার জন্য এর মানে কী?”
আর সেই প্রশ্নের উত্তর যদি আমরা এমনভাবে দিই যে উত্তর বুঝতে আবার একজন বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করতে হয়, তাহলে সমস্যা জনগণের শিক্ষায় নয়, আমাদের যোগাযোগে।
রাষ্ট্রের ভাষা তখনই সফল,
যখন তা ফাইলের কর্মকর্তা, ল্যাবের বিজ্ঞানী আর বাজারের সাধারণ মানুষ, তিনজনকেই একই সত্য বোঝাতে পারে।
কারণ কঠিন কথা বলে জ্ঞানী প্রমাণ করা যায়,
কিন্তু কঠিন কথাকে সহজ করে বলতেই জ্ঞান লাগে।
আর জনগণ যে ভাষা বোঝে না, সেই ভাষায় জনসেবা করলে সেবাটা শেষ পর্যন্ত ফাইলেই থাকে, জনগণের কাছে পৌঁছায় না।
Copied from Arafat Sarker