16/06/2026
স্ত্রী তালাকের কাগজে সই না করলে কি তালাক হবে না?
একজন আইনের লোক হিসেবে আমি প্রায়ই এমন একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হই—“স্বামী তালাক দিয়েছে, কিন্তু স্ত্রী তো তালাকের কাগজে সই করেনি। তাহলে কি তালাক কার্যকর হবে?” দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিষয়টি নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, স্ত্রীর সই ছাড়া তালাকের কোনো আইনি মূল্য নেই। কিন্তু বাংলাদেশের প্রচলিত আইন বিষয়টিকে এভাবে দেখে না।
বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ ও তালাক সংক্রান্ত বিষয়ে স্বামী যদি তার স্ত্রীকে তালাক দিতে চান, তাহলে তাকে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। শুধু মুখে তালাক উচ্চারণ করলেই আইনি দৃষ্টিতে সবকিছু সম্পন্ন হয়ে যায় না। স্বামীকে লিখিতভাবে তালাকের নোটিশ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করতে হয় এবং একই সঙ্গে স্ত্রীর কাছেও সেই নোটিশের একটি কপি পাঠাতে হয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইনে কোথাও বলা নেই যে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য স্ত্রীর সই বা সম্মতি বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ স্ত্রী যদি তালাকের কাগজে সই না করেন, নোটিশ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান, কিংবা তালাক মেনে নিতে না চান, তবুও আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তালাক কার্যকর হতে পারে। অনেকেই মনে করেন, “আমি সই করিনি, তাই তালাক হয়নি”—এই ধারণা পরবর্তীতে বড় ধরনের আইনি জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে স্বামী ইচ্ছামতো যেকোনোভাবে তালাক দিতে পারবেন। আইন নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি নোটিশ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ না করা হয় বা আইনি বিধান লঙ্ঘন করা হয়, তাহলে বিভিন্ন ধরনের আইনি প্রশ্ন ও জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কারও মুখের কথার ওপর নির্ভর না করে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।
আমি সবসময় একটি কথা বলি—আইন আবেগ দিয়ে চলে না, আইন চলে বিধান ও প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। তাই “স্ত্রী সই করেনি, তাই তালাক হয়নি” অথবা “শুধু মুখে তিনবার তালাক বললেই সব শেষ”—এই ধরনের ধারণাগুলো আইনগত বাস্তবতার সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সচেতন থাকুন, আইন জানুন এবং গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সঠিক আইনি পরামর্শ গ্রহণ করুন। কারণ একটি ভুল ধারণা কখনো কখনো বহু বছরের পারিবারিক ও আইনি জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।