18/07/2026
স্নেহকুমার চাকমা। ভারতবর্ষের জুম্ম জনগোষ্ঠীর একজন স্বপ্নদর্শী নেতা। তিনি অবিসংবাদিত ও সংগ্রামী জননেতা, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা, স্বদেশী আন্দোলনের নেতা। তিনি পাহাড়ি অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের সাথে অর্ন্তভূক্তির জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট থেকে ১৭ আগষ্ট এই তিন দিন পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটিতে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে রাখেন।
১৯১৪ সালে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার খবং পুজ্জি গ্রামে স্নেহকুমার চাকমা জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শ্যামচন্দ্র চাকমার পেশায় ছিলেন কৃষক এবং চাকমা বর্ণমালার শিক্ষা দিতেন। মাতা মানকুমারী ছিলেন গৃহণী এবং বস্ত্র বুননের কাজ করতেন। ১৯২৭ সালে স্নেহ কুমার চাকমা রাঙামাটির সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৩০ সালে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্কুলে প্রথম ছাত্র ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য স্কুল হতে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কৃত হন। তিনি ১৯৩২ সালে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হলে পুনঃরায় স্কুল থেকে দুই বছরের জন্য বহিষ্কৃত হন।
১৯৩৩ সালে শিক্ষা কর্মকর্তা স্যার জেনকিন্সের সহযোগিতায় জেল হতে কয়েকদিনের মুক্তিতে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেন। মেট্রিক পরীক্ষায় রাঙামাটি জেলার মধ্যে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। ১৯৩৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে এমএ ভর্তি হন। ১৯৩৭ সালে স্নেহকুমার চাকমা সরকারি চাকরির সুযোগ হলেও যোগদান করে নাই।
কলেজ জীবনে সক্রিয় রাজনীতি করার সময় তিনি চাকমা যুব সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ঘনশ্যাম দেওয়ানের সংস্পর্শে আসেন। মহেন্দ্র বড়ুয়া, চট্টগ্রাম অনুশীলন সমিতির সদস্য চারু বিকাশ দত্তসহ বৃটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের সাথে কাজ করেন। ১৯৩০ সালের শেষ দিকে চট্টগ্রামের যাত্রামোহন সেন হলে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সাথে স্নেহ কুমার চাকমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাতের পর স্নেহ কুমার চাকমা নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর ভক্ত হয়ে উঠেন। আজাদ হিন্দ ফৌজের কোহিমায় অবস্থানকাল পর্যন্ত নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সাথে স্নেহকুমার চাকমা যোগাযোগ রাখেন।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ করে স্বাধীনতার সম্ভাবনা দেখা দিলে সিমলা সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে সর্বভারতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতে রাখার অনুরোধ জানান। সেই সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে মুসলিম জনসংখ্যার হার ছিল মাত্র তিন শতাংশ। স্নেহকুমার চাকমা সিমলায় পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সাথে আলাপ করে অনুরোধ জানান। তাঁরা স্নেহময় চাকমাকে আশ্বস্ত করেন। সেসময় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভূক্ত করতে তেমন আগ্রহী ছিলেন না।
১৯৪৭ সালে ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হলে স্নেহকুমার চাকমা তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে চট্টগ্রামের রাঙামাটিতে জেলা প্রশাসকের অফিসের সামনে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট এক বেতার বার্তায় জানানো হয় সীমানা নির্ধারণ কমিটির চেয়ারম্যান স্যার সিরিল রেডক্লিফ পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত করেছেন। ২১ আগষ্ট পাকিস্তানের বেলুচ সেনাবাহিনীর রেজিমেন্ট পার্বত্য চট্টগ্রামে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করে।
স্নেহকুমার চাকমা অযৌক্তিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানে অন্তর্ভূক্ত করাকে সহজে মেনে নিতে পারেন নি। ১৯৪৭ সালের ১৯ আগস্ট আটজন সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবককে নিয়ে স্নেহকুমার চাকমা রাঙামাটি ত্যাগ করে ত্রিপুরার উদ্দেশ্য রওয়ানা দেন। ২১ আগস্ট স্নেহকুমার চাকমা সাব্রুম পৌঁছান এবং বিদ্রোহের জন্য মনস্থির করেন। এরপর বল্লভভাই প্যাটেলের সাথে সাক্ষাত করেন। বল্লভভাই প্যাটেলের পরামর্শে স্নেহকুমার চাকমা ভারতের নুতন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু স্নেহকুমার চাকমাকে কোন আশ্বাস দিতে পারেন নি।
১৯৫১ সালে স্নেহকুমার চাকমা ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সদস্য হন। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতভূক্তির স্বপ্ন চুরমার হয় গেলে স্নেহকুমার চাকমা আর নিজের জন্মস্থান পার্বত্য চট্টগ্রামে ফিরে আসেননি। তিনি ত্রিপুরায় অবস্থান নেন এবং সেখানে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ত্রিপুরায় পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার আদায় আর ধর্মীয় কাজকর্মের সাথে নিজেকে নিয়োজিত রেখে বুদ্ধ ধর্মের দর্শন ও চর্চা তথা বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ রচনা করেন।
চাকমাদের মধ্যে স্নেহকুমার চাকমা প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে দ্য টেলিস্কোপ নামে এক সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৮৭ সালের ১৮ জুলাই স্নেহকুমার চাকমা মৃত্যুবরণ করেন।
আজ স্নেহ কুমার চাকমা'র ৩৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই অবিসংবাদিত নেতার মৃত্যু দিবসে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও লাল সালাম!
#পার্বত্যচট্টগ্রাম
#পাহাড়িছাত্রপরিষদ
#পূর্ণস্বায়ত্তশাসনপ্রতিষ্ঠারলড়াইয়েআপোষহীন