30/08/2026
৩০ আগস্ট ২০২৬— বাংলাদেশের বিদ্যালয়গুলোতে প্লাস্টিকের ব্যবহার ও দূষণ কমিয়ে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ গড়ে তুলতে ‘প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস ম্যানুয়াল’ উদ্বোধন করেছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন - এসডো। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি-এর সহযোগিতায় তৈরি এই ম্যানুয়ালটি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য পরিবেশবিষয়ক নির্দেশিকা। পরিবেশ অধিদপ্তরের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী, শেখ ফরিদুল ইসলাম, এমপি মহোদয়ের উপস্থিতিতে ম্যানুয়ালটির উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যমকর্মী ও তরুণ প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের বিদ্যালয়গুলোতে প্লাস্টিকের ব্যবহার ও দূষণ কমিয়ে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ গড়ে তুলতে ২০২২ সাল থেকে চলমান ‘প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস’ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে আসছে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)। দেশের ৮টি বিভাগজুড়ে বাস্তবায়িত এই উদ্যোগের প্রথম ধাপে ১৬টি বিদ্যালয়কে লক্ষ্য করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে এর আওতায় আরও ৭টি বিদ্যালয় যুক্ত হয়।
ব্যাপকভাবে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের উপস্থিতিতে, বাংলাদেশে পরিবেশগত সংকট ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ কমাতে নীতিগত ও কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে এসডো। ‘প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস’ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের পরিবেশবিষয়ক জ্ঞানকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে আচরণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব জীবনাচরণে অনুপ্রাণিত করা। পাঠ্যবই ও শ্রেণিকক্ষের গণ্ডি পেরিয়ে পরিবেশ শিক্ষাকে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও কমিউনিটির মধ্যে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পর্যায়ক্রমে নিঃশেষ করাটাই এ উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে ম্যানুয়ালটি তৈরি করা হয়েছে। এতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় (MoEFCC), জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের মতামত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক সহযোগী সংগঠন ব্রেক ফ্রি ফ্রম প্লাস্টিক (BFFP) ও প্লাস্টিক সলিউশনস ফান্ড (PSF) থেকে গবেষণাভিত্তিক পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। ফলে পরিবেশ সুরক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত কার্যকর উদ্যোগ ও অভিজ্ঞতাগুলোও ম্যানুয়ালটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (EPI)-এর উদ্বেগজনক ফলাফলের সময়ে ম্যানুয়ালটি প্রকাশ করা হলো। এই সূচকে ১৭৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম। দেশের পরিবেশগত পরিস্থিতির উন্নয়নে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাই এই চিত্র তুলে ধরে।
‘প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস’ উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু প্লাস্টিক দূষণ কমানো নয়, বিদ্যালয় পর্যায়ে পরিবেশ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তোলা এবং পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তোলা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্লাস্টিক দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানানো হবে এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে উৎসাহিত করা হবে। পাশাপাশি, বিদ্যালয়গুলোতে টেকসই চর্চা চালু করা, শিক্ষার্থীদের পরিবেশ রক্ষায় নেতৃত্ব দিতে উৎসাহিত করা এবং সফল উদ্যোগগুলো দেশের অন্যান্য বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পের পরবর্তী ধাপে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বর্জ্য আলাদা করা, পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহার এবং পরিবেশ রক্ষায় নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ব্যবহারিক দক্ষতা শেখানো হবে। এর মাধ্যমে বিদ্যালয় ও দৈনন্দিন জীবনে জিরো-ওয়েস্ট চর্চা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, এমপি বলেন, “নফোর্সমেন্ট ছাড়া পরিবেশগত কাজ সফল করা সম্ভব নয়। সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। গত সপ্তাহে ইপিআর (Extended Producer Responsibility) পাস হয়েছে, তাই প্লাস্টিক উৎপাদনকারীদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। ছাত্ররা যদি স্কুল ও বাগান পরিষ্কার করে, পরিবেশের দায়িত্ব নেয়, তাহলে পরিবেশের ওপর তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কাঠ পুড়িয়ে কোনো ইটভাটা চালানো যাবে না। আমাদের মূল সমস্যা হলো, আমরা পরিবেশের চেয়ে ব্যবসায়িক লাভকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি, যা ঠিক নয়।”
এসডো-এর চেয়ারপারসন সৈয়দ মার্গুব মুর্শেদ বলেন, “পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একক কোনো উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে সরকার, বেসরকারি খাত, সুশীল সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও তরুণদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ইনচার্জ ড. ফাহমিদা খানম বলেন, “যেসব শিক্ষার্থী স্কুলে ভালো করবে, তাদের পরিবেশ অ্যাম্বাসেডর বানানো উচিত এবং পাশের স্কুলে তাদের দিয়েই প্রশিক্ষণ দেওয়ানো উচিত। কারণ বন্ধুদের কথা শিক্ষার্থীরা বেশি শোনে। ফুডপান্ডায় খাবার অর্ডার করার সময় সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক যেন না থাকে এবং প্যাকেট কাগজের হয়, এ কথা অর্ডারের সময়ই জানিয়ে দিতে হবে। পেপার ক্রাফট ব্যাগের চাহিদা আবার ফিরিয়ে আনতে হবে।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো: লুৎফর রহমান বলেন, “শিক্ষার্থীরা যদি প্রত্যেকে দায়িত্বশীল হয়ে যায়, তাহলে আমাদের অনেক পরিবেশগত সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। এই প্রোগ্রামে যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এসেছে, তারা যদি এখানকার জ্ঞান বাহিরে ছড়িয়ে দেয়, তবে তা পরিবেশ রক্ষায় ভালো ভূমিকা রাখবে। আমরা সচিবালয়ে এখন কোনো প্লাস্টিকের বোতল রাখি না, কাচের গ্লাস ব্যবহার করি”
এসডো-এর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, “তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে পরিবেশ শিক্ষাকে আরও বাস্তব ও কার্যকর করে তুলতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা দেওয়ার মাধ্যমে বিদ্যালয়গুলোতে টেকসই অভ্যাস এবং পরিবেশবিষয়ক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চাই আমরা।”
জনাব উসমান রাশেদ মুইন, ডিএমডি ও জিসিআরও, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি বলেন, “পরিবেশ সচেতনতা ও টেকসই চর্চা গড়ে তোলার উদ্যোগে সহযোগিতা করতে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের পরিবেশ রক্ষার কাজে যুক্ত করা একটি দায়িত্বশীল ও পরিবেশবান্ধব সমাজ গড়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
‘প্লাস্টিকমুক্ত ক্যাম্পাস’ প্রকল্পটি দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদি আচরণগত পরিবর্তন আনতে পারে। এই উদ্যোগে বিদ্যালয়কে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যেখানে পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃত্ব ও পরিবর্তনের মানসিকতা তৈরি হবে। তাই শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, উন্নয়ন সহযোগী এবং সুশীল সমাজের সংগঠনগুলোকে এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এসডো। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ক্যাম্পাসগুলোকে আরও পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব করে তোলাই মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।