04/10/2026
পড়লে ভালো লাগবে।একটি গল্প।সংগৃহীত।মানুষের লেখার কত ক্ষমতা দেখেন?পড়ার পর চোখের কোনে কিছু ফিল করলে কমেন্ট করবেন?
চাকরিটা পাবার পর থেকে মন ভালো হবার কথা ছিল।প্রথম জীবনের চাকরি তাও স্কুলের প্রধান শিক্ষক!পায়ে ঠেলে দেবার মতন নয়। বি.সি.এস এ নন-ক্যাডারে আমার মতন অনেকেই হয়তো চাকরি পেয়েছেন কিন্তু কেউ ই হয়তো আমার মতন অখুশি নয়।
যখন থেকে জানতে পারলাম স্কুল টা আমাদের এলাকার ই স্কুল আর শুধু তাই নয় এ স্কুলে কেটে গেছে আমার বাল্যকাল।
কত বছর এই গ্রামে যাইনি আমি।বলতে গেলে গ্রামের পথ ও ঝাপ্সা লাগে আজকাল।সেই ইন্টারে চলে এলাম ঢাকায়।বাবা মায়ের সাথে সম্পর্ক কেবল টাকার ই ছিল।কথা হয়নি একেবারেই।বাবার অমতেই আমি ঢাকা এসেছিলাম তাই বাবাও আর জেদ করে কথা বলেনি।মা মাঝে মাঝে ছোট কাকার কাছে চিঠি দিত।মায়ের মন বলে কথা।
ভেবেছিলাম আর কখনই যাব না ওই গ্রামে।কিন্তু আল্লাহ চাইলে কি আর করার।চাকরিটাও খুব দরকার।আর এমন সম্মানের চাকরি কি করে পায়ে ঠেলি ভাবতে ভাবতেই চা হাতেই ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
কি ভাই শুনলাম মাস্টার হইছেন?ভুলে যাবেন নাকি এখন কথাটা বলেই দাঁত কেলিয়ে হেসে দিল মিজান ভাই।
মিজান ভাই ক্যাম্পাসের বাইরের দোকানে চা বিক্রি করেন বহুকাল।আমার তার প্রতি অনেক ঋণ।কত বাকি খেয়েছি তার কাছে।সে কখনই মুখ কালো করেনি
মিজান ভাই তোমায় কি করে ভুলি বলতো?তুমি এখনো ৯৫টাকা পাও
মিজান: ৯৫টাকা মাত্র?
তাহলে?
সুদে আসলে দিতে হবে মাস্টার মশাই এই বলে হেসে দিল।
মানুষগুলি হতে পারে আপন নয় তবুও উৎসাহ দেয়ার বেলায় কমতি রাখেন না।চায়ের বিল দিয়ে রুমে চলে আসলাম
২.
সাদা শার্ট কালো প্যান্ট পরে বার বার আয়নার দিকে তাকাচ্ছি।কোন ভাবেই নিজের চোখে নিজেকে শিক্ষক এর মতন লাগছেনা।প্রধান শিক্ষক ভাবলেই আমাদের নির্মল স্যার এর মুখ ভেসে আসে।বৃদ্ধ, রাগী চশমা পরা একজন লোক যে তার চোখ জোড়া দিয়েই মনে হয় সমস্ত স্কুল নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
জুতো পরতে পরতেই সেই দিনকার কথা মনে পরে গেল।তখন আমি সেভেন এ পড়ি। স্কুলের দৌড় প্রতিযোগীতায় নাম দিয়েছিলাম।জুতা লাগবে সেই বলে বাবার কাছে সে কি বায়না।বাবা মুখের উপর বলে দিলেন সময় টা তার ভালো যাচ্ছেনা। জুতো কেনার মতন পয়সা তার কাছে নেই।আর জয়ী হলেও সবোর্চ্চ পাবা একটা প্লেট। টাকা হাতে আসলে প্লেট কিনে দিব ক্ষন।
মা অবশ্য আমার মলীন মুখ না দেখতে পেরে ঘরের চাল বিক্রি করে আমায় জুতো কিনে দিয়েছিল।কিন্তু আমি তখন ১ম-২য়-৩য় কিছুই হতে পারিনি।
পারতাম ই বা কি করে!যে জুতা পরে হাটার অভ্যাস নেই তা পরে দৌড় দিতাম ই বা কি করে।খালি পায়ে দিলে পারতাম হয়তো।
৩.
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে জুতো বেৃধে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।বুকের ভিতর ঢিপঢিপানি বেড়েই চলেছে।মা বাবা জানে আমি চাকরি পেয়েছি তবে আমার চাকরির স্থল যে গ্রামে তা বলিনি।
শুনলেই বাবা হয়তো বলতেন,ঢাকা গিয়া পড়া লেখা করে সেই তো গ্রামেই এলো।কি লাভ হলো!তাই বলিনি।
ভাবছি ওখানে গিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকবো।একমাত্র সন্তান এত কাছে জেনেও কাছে না পাওয়ার বেদনা কি আমার মা নিতে পারবে?চোখ টা ঝাপ্সা হয়ে এলো।
হেল্পার পাশে এসে বললো কই নামবেন?
আমি চমকে উঠে বলি কি?
-আরে ভাই নামবেন কই?একদম কি নিমতলা?
-না।রূপগন্জ
নামটা বলতেই বুকের ভিতর কেমন হু হু করে উঠলো।জন্মস্থান এর জন্য মনে হয় আলাদা এক মায়া কাজ করে।ঠিক মা বাবার মতন
-৭৫টাকা দেন
টাকা দিয়ে বাস এর জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি।চেনা ফসল এর জমি চোখে পরছে বার বার।গাড়ি যাচ্ছে মনে হচ্ছে আমার বুকের ঢিপঢিপানিও বেড়ে চলেছে।
গ্রামের বাসস্টান্ড এ থামতেই আমি কেমন যেন সিট এর সাথে কুকরে যাচ্ছি। ভয় আমায় আকরে ধরেছে
-কি ভাই নামেন তাড়াতাড়ি বলে হেল্পার বিরক্তি প্রকাশ করলো।
নেমে চারদিকে তাকাতেই আমার চোখের কোনে পানি জমে এলো।
মনে হচ্ছে বাবা বুঝি এই দেখে বলবে কিরে ইকবাল না?
আবার মা বুঝি এসে জড়িয়ে ধরে বলবে বাপ তুই এত পাষাণ?
স্কুলের সামনে যেতেই স্কুলের বাকি শিক্ষক আমায় ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানালেন।
আমার চেয়ে বয়সে বড়রা আমায় স্যার সম্বোধন করছেন।বেপার টা খুব ই লজ্জার।
-আমায় স্যার বলবেন না।নাম ধরে ডাকবেন প্লিস
-আহা স্যার কি বলছেন?স্যার ডাকা তো সম্মানের।আর আপনি সেটা ডিজার্ব করেন
-নাম ধরেও তো স্নেহ করা যায় তাইনা?
-আচ্ছা আচ্ছা চলুন অফিস রুমে।১২টার পর আবার স্কুলের অনুষ্ঠান শুরু হবে
-কিসের?
-বারেহ আপনাকে বরণ করবেনা ছাত্র-ছাত্রীরা
৩.
অফিস রুমে গিয়ে সব স্যারের সাথে পরিচিত হলাম।এর মাঝে আমার সময়কালীন কোন স্যার ই নেই।আমার চোখ বার বার একটি মানুষকে খুঁজে যাচ্ছে। একবার ও কি দেখা হবেনা তার সাথে!
এরই মাঝে রফিক স্যার উঠে বললেন চা খাবেন?
-জ্বী আনলে মন্দ হয়না।
রফিক স্যার চেঁচিয়ে বললেন ইউসুফ ভাই ৩কাপ চা দিয়েন তো
কথাটা শুনেই আমার ফরমাল পোষাক এর ভিতর শরীর টা ঘেমে বার বার ইনফরমাল হয়ে যাচ্ছে। মাথার উপর ফুল স্প্রিডে ঘুরে চলেছে ফ্যান।তা যেন শরীর স্পর্ষ করছেনা
৪.
নিউজপেপার পড়ার ভান করে মুখ টা আড়াল করে রেখেছি।দরজার সামনে চেনা কারো কন্ঠ স্বর।আসবো স্যার?
-হ্যা ইউসুফ ভাই আসুন এই বলে রফিক স্যার আমায় বললেন স্যার উনি আমাদের স্কুলের সবচেয়ে পুরোনো কর্মচারী। কেরানীর কাজ করে।খুব ই সৎ মানুষ। ৬মাস পরে আর হয়তো চাকরি করবেন না।তবে আমরা ভেবেছি তাকে আমরা রেখে দিব।
ইউসুফ ভাই এই আমাদের নতুন প্রধান শিক্ষক।যাকে দেখার জন্য আজ সকাল সকাল এসেছেন।
চায়ের কাপ নিয়ে আমার সামনে জনাব ইয়ুসুফ বললেন নিন স্যার চা
আমি কাঁপা হাতে মুখের উপর থেকে পেপার টা নামিয়ে তার দিকে তাকালাম।
কি অদ্ভুত!দেখার পর ই তার হাতের চায়ে ভর্তি কাপ ঠক ঠক করে কাঁপছে।ফরমাল পোষাকে মোড়ানো মানুষটিকে চিনতে তার ভুল হয়নি।
ইউসুফ সাহেব কাঁপা গলায় বললেন নিন স্যার চা।
আমি চা হাতে নেয়া মাত্রই উনি তড়িঘড়ি করে বাইরে যেতে নিলেন
আমি পিছন থেকে বললাম স্যার দাড়ান
ইউসুফ সাহেব থমকে দাড়ালেন
অফিসরুম ভর্তি সব স্যার রা উঠে বললেন ওনাকে কাকা,বা ভাই বলুন।স্যার বলছেন কেন?
আমি চোখ মুছে ইউসুফ সাহেবের কাছে গিয়ে বললাম স্যার তো সম্মানের।সেই সম্মান যদি আমি আমার বাবাকেই না দিতে পারি তাহলে আর কি ই বা হলো?
ইউসুফ সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে।
সবাই আমার কথা শুনে অবাক হয়ে দাড়িয়ে বললো বাবা?
আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললাম এখনো কি পরিচয় দিতে দিবেনা আমায়?এখনো কি লজ্জা পাও বাবা?
বাবা অনবরত কেঁদেই চলেছে।আগে কখনো ই এই কঠিন মানুষটিকে আমি এভাবে কাঁদতে দেখিনি।
বাবাকে নিয়ে এসে আমার চেয়ারে অনেকটা জোর করেই বসালাম।সবাইকে বললাম বসতে।
রুমের সবাই কেমন স্তব্ধ হয়ে আছে।
আমি হেসে বললাম উনি আমার বাবা।মোঃ ইউসুফ আলি।আমার প্রথম শিক্ষক উনি।যখন এই স্কুলে পড়তাম বাবা তখন পিয়ন ছিল।আমাকে নিয়ে ক্লাসমেট রা হাসাহাসি করবে তাই বাবা আমায় তার পরিচয় দিতে বারন করতেন বহুবার।
আমার খারাপ লাগতো বাবা তার চেয়ে কমবয়সী ছেলেমেয়েদের ও স্যার-ম্যাডাম বলতেন।স্কুলের পিয়ন বলে কেউ তাকে মিনিমান সম্মান দিয়েও কথা বলতোনা।বাবাকে বলতাম চাকরি ছেড়ে দিতে সেই নিয়েই বাবার সাথে আমার রাগ-অভিমান।বাবা তার ছেলেকে ছাড়া থাকতে পারলেও সখ এর চাকরি ছাড়তে পারেনি।তাই আজ কতকাল পর এই চাকরির কারনে আমার বাবাকে ফিরে পেয়েছি।
আপনাদের কাছে আমার আবেদন বাবা যে কয়দিন আছেন সে আমার চেয়ারেই বসবেন।
সবাই স্তব্ধ হয়ে আছে।চায়ের কাপ টা বাবার সামনে ধরে বললাম নিন স্যার চা
বাবা কেন যেন বাচ্চা ছেলেদের মতন কাঁদছেন আর বলছেন যখন শুনছিলাম নতুন স্যারের নাম আমার ছেলের নামে তখনো ভাবিনি সে আমার ছেলেই হবে।তাকে দেখার জন্য সারারাত ঘুমাইনি।অফিসরুম ভর্তি সবাই তাদের চোখ মুছছেন।আমি অবাক হয়ে ভাবছি আমায় হয়তো প্রধান শিক্ষক হিসেবে মানাচ্ছেনা।না হলে নির্মল স্যার যেখানে হাজার বকা দিয়েও কারো চোখে জল আনতে পারতোনা আর সেখানে আমি কিছু না বলেই কেন সবার চোখ ভর্তি জল?
সংগৃহীত