25/03/2026
স্বীকৃতি, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও নতুন প্রেক্ষাপট: স্বাধীনতা দিবসে এক ভিন্ন বার্তা
লেখক: মঞ্জুর হোসেন ঈসা
সংগঠন: মায়ের ডাক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বাধীনতা দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়, এটি জাতির আত্মপরিচয়, সংগ্রাম এবং চেতনার এক গভীর প্রতীক। ২০২৬ সালের মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বার্তা প্রতিফলিত হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে নতুন আলোচনা ও বিশ্লেষণের জন্ম দিয়েছে।
এবারের স্বাধীনতা দিবসে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু সাহেব) তাঁর বক্তব্যে জিয়াউর রহমান-এর অবদানকে যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই মহান মুক্তিযোদ্ধা ও রাষ্ট্রনায়কের প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ধারাবাহিকতা অনেকের কাছেই একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর নেতৃত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনে জিয়াউর রহমান-এর ভূমিকা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই দুই ধারার ইতিহাসকে সমন্বিতভাবে মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই একটি ভারসাম্যপূর্ণ জাতীয় চেতনা গড়ে উঠতে পারে—এমন মতও এখন জোরালো হচ্ছে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা-এর শাসনামল এবং তার সমালোচনা, বিশেষ করে “মুজিব শতবর্ষ” উদযাপনকে কেন্দ্র করে বিপুল ব্যয় এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। সমালোচকদের মতে, বিপুল অর্থ ব্যয় সত্ত্বেও তা সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
এ প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান-এর রাজনৈতিক কৌশল ও বক্তব্য অনেকের কাছে নতুন দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে একটি সর্বজনীন জাতীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা, তা রাজনৈতিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একইভাবে খালেদা জিয়া-এর জনপ্রিয়তা ও জনসম্পৃক্ততা এখনও দেশের রাজনীতিতে একটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল জাতীয় ঈদগাহে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর একসঙ্গে নামাজ আদায়। এই ঘটনাটি অনেকের কাছে রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ও সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে প্রতিফলিত হয়েছে। দীর্ঘ ৩৬ বছর পর এমন দৃশ্য জাতির সামনে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে—যেখানে ভিন্নমত থাকলেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্য সম্ভব।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিরোধ, মতপার্থক্য ও ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। তবে সময়ের দাবি হচ্ছে—সংঘাত নয়, সমন্বয়; বিভাজন নয়, ঐক্য। স্বাধীনতার ৫৫ বছরের এই যাত্রায় জাতির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ও সহনশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবস শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়—বরং এটি ভবিষ্যতের পথনির্দেশনা নির্ধারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়কে সম্মান জানিয়ে, ভিন্নমতকে সহনশীলতার সাথে গ্রহণ করে এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে গেলেই একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।