13/05/2026
শেখ হাসিনার সমালোচনা করা খুব সহজঃ
শেখ হাসিনা যদি আজ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকতেন, তাহলে হয়তো কায়সার হামিদকে মেয়ের চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে সাহায্যের আবেদন করতে হতো না। তিনি নিজ উদ্যোগেই “ত্রাণ তহবিল” থেকে সহায়তার চেক পাঠিয়ে দিতেন—আবেদন করারও প্রয়োজন পড়ত না।
কাজ করার সুবাদে এমন অসংখ্য মানবিক ঘটনার সাক্ষী আমি নিজে। বিশেষ করে লক্ষণীয় বিষয় হলো—যাদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে তাঁর বিরোধী ছিলেন, তাদের প্রতিও তিনি একই রকম উদার ও সহানুভূতিশীল ছিলেন।
তখন আমি উপ-প্রেস সচিব। এক সন্ধ্যায় গণভবনে গেলে প্রধানমন্ত্রী আমাকে দেখেই বললেন, “খোঁজখবর তো কিছুই রাখো না! খলিলউল্লাহ খান যে অসুস্থ, জানো?” পুরো নামে প্রথমে চিনতে পারিনি, পরে ধমক দিয়ে বললেন “অভিনেতা খলিল সাহেব।” বিষয়টি আমি জানতাম না। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি একটি বড় অঙ্কের চেক দিলেন এবং বললেন, ওনার বাসায় পৌঁছে দিতে।খলিলউল্লাহ খান বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এটা সবাই জানত। আমি জানি, এটা সংবাদ প্রকাশ হবার পরই আমাকে দলের লোকজনের গালি খেতে হবে। তাই সিনিয়র একজন কলিগকে সাথে নিয়ে ওনার বাসায় গেলাম। আমরা নিউজ করাইনি, কিন্তু কিভাবে যেন নিউজ হয়ে গেলো। যথারীতি আমাদের নামও এসেছে। আর সোস্যাল মিডিয়াতেও আমি এবং আমার কলিগ ভিলেন হয়ে গেলাম। জামাত-বিএনপি লালন-পালনকারী হয়ে গেলাম।
চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনের ঘটনাও একই রকম। ১৯৭৫–এর পর তিনি খু/নি ডালিমের ভাষণ প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—এ অভিযোগ অনেকেই তুলেছিলেন। কিন্তু যখন ব্যাংককে তাঁর চিকিৎসার জন্য পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে, শেখ হাসিনা নিজ উদ্যোগে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেন। আপত্তি উঠলে তিনি বলেছিলেন, “তার এই অতীতের আগে আরও একটা গৌরবময় অতীত আছে—দেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর অসাধারণ কাজ এবং অবদান আছে।”
গাজী মাজহারুল আনোয়ার ছিলেন বিএনপির সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবুও তিনি যখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিজে থেকে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন, শেখ হাসিনা বলেন, “তাঁর দলে যদি সমস্যা না হয়, আমার দরজা সবসময় খোলা।” মেয়ে দিঠি আনোয়ারকে নিয়ে তিনি গণভবনে আসলেন। জীবনের শেষ ইচ্ছার কথা বললেন, এবং শেষ পর্যন্ত “স্বাধীনতা পুরস্কার” পেলেন। কেবিনেটের ভেতরে আপত্তি উঠেছিল, কিন্তু শেখ হাসিনার অবস্থান ছিল স্পষ্ট—বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের গানে তাঁর অবদান রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে। “জয় বাংলা, বাংলার জয়”—এর মতো অমর গান তাঁরই লেখা। ৫ আগষ্টের পর ওনার মেয়ে দিঠিকে মিডিয়াতে বলতে শুনলাম” তারা নাকি ১৫ বছর নির্যাতিত ছিলেন। অথচ তখন শেখ হাসিনার গুনকীর্তন করে ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছিলেন।
অভিনেতা আবুল হায়াত—প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার সমালোচক হিসেবে পরিচিত— কেবিনেটে বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনিও অভিনয়ে অবদানের জন্য স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন শেখ হাসিনার হাতেই। কুদ্দুস বয়াতি, যিনি শেখ হাসিনাকে নিয়ে বহু কটূক্তি করেছেন, তিনি চিকিৎসার জন্য বড় আর্থিক সহায়তাও পেয়েছেন।
৫ আগষ্টের পর কবি হেলাল হাফিজের ফেসবুক পোস্টও দেখেছি, অথচ ওনার অসুস্থতার খবর শুনে তাঁকে গণভবনে দাওয়াত দিয়ে সকালের নাস্তা করিয়েছেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন শেখ হাসিনা। সিআরআই এর “ হাসিনাঃ এ ডটারস টেল” সিনেমাটি যিনি বানিয়েছিলেন সেই পিপলু আর খান শেখ হাসিনার সাথে গণভবনের দোতলায় এক টেবিলে ভাতও খেয়েছেন, গর্ব করে সেটা বলতেনও। শুনেছিলাম, তার চিকিৎসার জন্যও নাকি ৫০ লক্ষ টাকা পেয়েছিলেন। ৫ আগষ্টের আগে তিনিও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের লাল বিপ্লবীদের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
সংগীত শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহর কথা বলে শেষ করি। তিনি সম্ভবত মারা গিয়েছিলেন রাত ১১ টার পর, ওনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর শোক দিবো কিনা কনফিউশনে ছিলাম। তাই ভোর বেলা গণভবনে গেলাম, আমাকে দেখেই বললেন, শাহনাজ রহমতুল্লাহ’র জন্য শোক বানী দিয়েছো। আমি বললাম, আপা সেটা জানার জন্যই এসেছি। তিনি বললেন, এটার জন্য আবার জিজ্ঞেস করতে হবে কেন? আমতা আমতা করে ওনার রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রসঙ্গ তুলতেই ধমক দিয়ে বললেন, “ওনারা লিজেন্ড। কে কোন দল করে, সেটা এখানে বিষয় না।” তখনই শোকবার্তা প্রকাশের নির্দেশ দিলেন। এমনকি এটাও বলেছিলেন, ১৯৯৬ সালেও তাঁর চিকিৎসার জন্য তিনি সহায়তা করেছিলেন।
সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের ঘটনাও মনে পড়ে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি গণভবনে মিটিংয়ে আসেন। মিটিংয়ের পর মামলার কারণে অসুস্থ শরীরে কোর্টে হাজিরা দিতে কষ্ট হওয়ার কথা জানান। শেখ হাসিনা সঙ্গে সঙ্গেই আইনমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন, যেন অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ও আইনি জটিলতা দূর করা হয়। অথচ শিরিন শারমীন চৌধুরীকে কোর্টে মব করে এই আমলে জেলহাজতে যেতে হয়েছে।
এমন ঘটনা আরও অনেক বলা যায়। শেখ হাসিনার সমালোচনা করা সহজ। রাজনৈতিক বিরোধিতা করাও সহজ। কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার যে মানবিকতা, যে উদারতা, যে প্রজ্ঞা—তা ধারণ করা সহজ নয়।
Copied
Ashraful Alam Khokan