15/08/2026
‘আমি মেজর ডালিম বলছি’ বইটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। বুঝতে চেষ্টা করেছি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে মেজর ডালিমের মূল্যায়ন কি? ব্যক্তি শেখ মুজিবকে তিনি কিভাবে দেখতেন? ডালিম বঙ্গবন্ধুকে চাচা বলে ডাকতেন। শেখ কামাল সবসময় মেজর ডালিমকে ডাকতেন ‘বস’ বলে। ৩২ নম্বর বাড়িতে মেজর ডালিম ও তার স্ত্রী নিম্মীর যাতায়াত ছিল। ১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে মেজর ডালিমের খালাতো বোন তাহমিনার বিয়ের অনুষ্ঠান ছিলো ঢাকা লেডিস ক্লাবে। সেখানে নিম্মীর ছোটো ভাই বাপ্পি কানাডা থেকে এসে উপস্থিত হয়েছিলো। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগের গাজী গোলাম মোস্তফার পরিবারও দাওয়াতি ছিলো। তার ছেলে বসেছিলো বাপ্পির পেছনের চেয়ারে। পেছন থেকে বাপ্পির চুল টেনে দুষ্টুমি করলো। বাপ্পি রেগে গিয়ে বললো কে চুল টানে? গাজীর ছেলে হেসে জানালো পরখ করে দেখছি নকল কি না। বেয়াদপ ছেলে বের করে দেবো এখান থেকে- বাপ্পির এই কথায় ঘটনা বড় হয়ে ঝগড়া বেধে গেলো।
পরে ঘটনাটি শুনে গাজী সশস্ত্র সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে এসে লেডিস ক্লাব থেকে ডালিমকে উঠিয়ে নিতে গেলে নিম্মি ও খালাম্মা সঙ্গে যান। কিছু পথ ঘুরে সেই গাড়ি যায় ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে, মিথ্যে অভিযোগ নিয়ে। কিন্তু আসল ঘটনা এসপি মাহবুবের কাছে শুনে বঙ্গবন্ধু উল্টো গাজীর ওপর ক্ষেপে যান। ‘হারামজাদা করছস কি। মাপ চা নিম্মী ও ডালিমের কাছে’। বঙ্গবন্ধুর এই গর্জনে গাজী মাপ চাইলেও নিম্মী তাকে মাপ করেনি। উল্টো বঙ্গবন্ধুর ওপর রাগ ঝাড়েন। বঙ্গবন্ধু তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন তুই আমার মেয়ে। এসময় শেখ রেহানা ও শেখ কামালও তাকে শান্ত করতে পারছিলেন না। বঙ্গবন্ধু গাজীকে বলেছিলেন ‘তুই ডালিমের সাথে গিয়ে বিয়ের বাকী কণ্যা সম্প্রদান অনুষ্ঠানে সহযোগিতা কর’। সেটিতেও ডালিম রাজি হননি। এসব এভাবেই ডালিম তার বইতেই লিখেছেন।
আরেকটি ঘটনা
ডালিমের সেনাবাহিনীর চাকরি যখন চলে যায় তখন বঙ্গবন্ধু নূর ও ডালিমকে বাসায় ডেকে বলেছিলেন, ‘দ্যাখ আমার করার কিছুই ছিলোনা। নেহায়েত অপারগ হয়েই তোদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হইছে। জানি মনক্ষুন্ন হইছস তোরা। হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমি তোদের জন্য কিছু একটা করতে চাই। বিদেশে দূতাবাসে চাকরি করতে চাইলে ব্যবস্থা করে দিতে পারি। আর যদি ব্যবসা করতে চাস। শেখ নাসেরকে বলে ব্যবস্থা করে দিতে পারি। ওর সাথে ব্যবসা করতে পারবি’। ডালিম বলেছিলেন, চাচা লাগবেনা এসব, আপনি শুধু দোয়া কইরেন। এসব ঘটনা মেজর ডালিমের বইতেই লেখা। আরও লেখা আছে, ‘চাকরিচ্যুতির পর ৩২ নম্বর বাড়িতে গেলে শেখ রেহানা ও শেখ কামাল কেমন যেনো বিব্রত হয়ে পড়েছিলো। পরিবেশটা হালকা করার জন্য আমি বলেছিলাম কি কামাল তোমার বিয়েতে দাওয়াত পাবোতো? কামাল বলেছিলো কি বলেন বস, আমি নিজে গিয়ে আপনাকে আর নিম্মী ভাবীকে দাওয়াত করে আসবো।’
বইয়ের এই বর্ননাগুলো পর্যবেক্ষণ করেছি। প্রশ্ন জেগেছে মেজর ডালিম তার বইতে ব্যক্তি শেখ মুজিবের সমালোচনা করতে পারেননি একটুও। সমালোচনা করার মতো কিছু ছিলোও না। তার প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। ব্যক্তি শেখ মুজিবের হৃদয় ছিলো আকাশের মতো বিশাল।
তবে বঙ্গবন্ধুর শাসন ব্যবস্থার যুক্তিহীন সমালোচনা করেছেন বইটিতে। আর আমার কাছে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় মনে হয়। তুচ্ছ একটি ঘটনা নিয়ে মেজর ডালিম বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে জড়িত হলেন। তার পুরো পরিবারকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হলো। যে বাড়িতে কতোবার গেছেন এই হত্যাকারীরা। তাদের একটুও দ্বিধা হলো না।
আর যে গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলেকে নিয়ে ঘটনার সুত্রপাত সেই গোলাম মোস্তফা ও তার ছেলেকে স্পর্শও করলেন না কেনো?
অথচ হত্যা করা হলো শিশু রাসেলকেও। শেখ মনি তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, সেরনিয়াবাত তার শিশুপুত্রকেও দুই বাড়িতে গিয়ে মারা হলো।
যার প্রতি এতো আক্রোশ তাকে কিছু না করে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারসহ আরও দুই পরিবার বুলেটে ঝাঁঝরা করা হলো
এর ব্যাখ্যা কি?