04/10/2019
ধরুন, কোন এক প্রচন্ড গা পুড়িয়ে দেয়া প্রখর রোদের দুপুরে আপনি কোন একটি মরুভূমির উপর দিয়ে হাটছেন। চারিদিকে যেখানেই দুচোখ মেলে আপনি তাকাচ্ছেন, শুধু মরুভূমির পর মরুভূমি। আপনি হাটছেন আর হাটছেন, রোদের তাপে মরুভূমির বালির তাপমাত্রা ততই বেড়ে যাচ্ছে। ভ্যাপসা গরমে আপনার রক্ত পর্যন্ত পানি হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রচন্ড তৃষ্ণায় আপনার মনে হচ্ছে, কোন আস্ত একটা নদী সামনে পেলেও আপনি হয়তো তার পানি পান করে পুরো নদীটাকেই পানিশূণ্য করে ফেলবেন। কিন্তু একটা ফোটার সন্ধানও কোথাও নেই...
ঘন্টাখানেক হাটবার পর যখন আপনি প্রচন্ড ক্লান্তিতে ঠিকভাবে দুচোখের পাতা মেলে সামনে দেখতে পর্যন্ত পারছেন না, ঠিক তখনই আপনার ঘোলাটে দৃষ্টিতে ধরা পড়লো দূরে একটি মরিচা ধরা নলকূপ দেখা যাচ্ছে। আপনি বেশ ভালভাবেই জানেন, গ্রীষ্মের গরমের মরুভূমির দুপুরের সূর্য্যের এই প্রখর তাপে সেই নলকূপের পানির স্তর হয়তো এতটাই নিচে নেমে গিয়েছে, যে একটি ফোটা পানি হয়তো আপনি সেখানে গিয়ে পাবেন না।
কিন্তু আপনি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী। পৃথিবীর সবার উপর আপনার বিশ্বাসের ভিত সেরকম শক্ত হবার সুযোগ না পেলেও সৃষ্টিকর্তায় আপনি অগাধ বিশ্বাস রাখেন। সে বিশ্বাসের উপর ভর করেই হয়তো আপনি সে নলকূপের দিকে এগিয়ে গেলেন...
এগিয়ে যাবার পর আপনি আরো অবাক করার মত একটি ব্যাপার দেখতে পেলেন। এই অবাক ব্যাপারটি আপনার সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসটুকু আরো বাড়িয়ে দিলো। আপনি যা দেখতে পেলেন তা হচ্ছে, মরিচা ধরা নলকূপটির পাশেই একটি পানি ভর্তি বোতল রাখা রয়েছে। সে বোতলের পাশেই রয়েছে একটি চিরকুট রাখা। আর সে চিরকুটে খুব সুন্দর হাতের লিখায় একটি বার্তা লিখা রয়েছে...
বার্তাটি অনেকটা এরকম
"বোতলে যে পানিটুকু আছে, সেটুকু নলকূপ থেকে পানি তোলার জন্যে ব্যবহার করুন এবং অবশ্যই বোতলের সবটুকু পানি ব্যবহার করতে হবে। নতুবা নলকূপ থেকে পানি উত্তলন সম্ভব হবে না। নলকূপের পানি ব্যবহারের পর বোতলটি আবার পানি দ্বারা পূর্ণ করে পূর্বের অবস্থায় রেখে দিন" ।
আপনি যদি আপনার জীবনে এরকম একটি পরিস্থিতিতে পড়েন, তবে এরকম একটি চিরকুট দেখার পর আপনার মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি দ্বিধা কাজ করবে। সে দ্বিধাটি হলো "বোতলের পানিটুকু ব্যবহার করে কী আসলেই পানি নলকূপ থেকে উঠবে? নাকি চিরকুটের কথামত কাজ করতে গিয়ে আপনার সেই এক বোতল পানিটুকুও হারাতে হবে?" ।
ঠিক এমন একটি পরিস্থিতিতে আপনার ভূমিকা মূলত কী হবে? নিজের উপর বিশ্বাস রেখে বোতলের পানিটুকু সাবাড় করে ফেলা? নাকি চিরকুটটি যিনি লিখে গিয়েছেন , তার উপর বিশ্বাস করে পুরো বোতলের পানিটুকু নলকূপের ভেতরে ফেলে দেয়া...? 🙂
জীবন প্রায় সময় আমাদের সাথে এরকম একটি খেলা খেলে থাকে। যে খেলায় আমাদের কাউকে না কাউকে বিশ্বাস করে নিতে হয়...
এই মূহুর্তে আপনি যে দালানের ছাদের নিচে বসে এই পোস্টটি পড়ছেন, আপনি আপনার অবচেতনমনেই সেই দালানের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারকে বিশ্বাস করে নিয়েছেন যে "এই বিল্ডিংটা মাথার উপর ভেঙ্গে পড়ার কোন সম্ভাবনা নেই"... অথচ কে সেই সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, আপনি হয়তো তাকে চেনেনও না... ।
কাল সকাল ৯ টার আগে আপনি যে লোকাল বাসে হুড়মুড় করে হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে পড়বেন, আপনি তখনও অবচেতন মনে বিশ্বাস করে নেবেন যে "এই বাসের ড্রাইভার কোন এক্সিডেন্ট ছাড়াই আপনাকে আপনার গন্তব্যস্থলে পৌছে দেবে"... অথচ আপনি যখন বাস থেকে নেমে যাবেন, তখনও আপনার ভীড়ের ধাক্কায় ড্রাইভারের চেহারাটি পর্যন্ত দেখার সুযোগ হবে না।
কখনো যদি সেই অচেনা ড্রাইভারটি আপনার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে ব্যর্থ হয়ে কোন একটি খাদে বাসটিকে ফেলেই দেয়, তবে একদল মানুষ আপনার রক্তাক্ত শরীরটাকে দ্রুত কোন একটি হসপিটালের ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে গিয়ে রেখে আসবে নতুন আরেক বিশ্বাসের উপর ভর করে। এবারের বিশ্বাস করা ব্যক্তিটি হচ্ছেন একজন ডাক্তার। যে ডাক্তার আপনার চিকিৎসা করার জন্যে স্টেথোস্কোপ গলায় নিয়ে আপনার সামনে এসে দাঁড়াবে, আর যাকে হয়তো আপনি তখন আপনার জীবনে প্রথমবারের মত দেখবেন...
নলকূপের সামনের সেই বোতলটি হাতে নিয়ে দ্বিধান্বিত হবার মত এ ধরনের পরিস্থিতির সময়ে আমাদের হাতে তখন কেবল একটি অপশনই থাকে। আর সেটি হচ্ছে, যেকোন একজনকে বিশ্বাস করা...
আপনি যদি নিজের উপর বিশ্বাস রাখেন, তবে সে পানিটুকু কখনোই আপনি নলকূপে ঢালতে চাইবেন না। আর যদি আল্লাহর উপর ভরসা রেখে সেই চিরকুট লিখা ব্যক্তিটির উপর বিশ্বাস রাখেন, তাহলে হয়তো সেই মরিচা পড়া নলকূপটিই আপনাকে পর্যাপ্ত পানি দিয়ে আপনার জীবন রক্ষা করবে। সেই সাথে আপনাকে পাক পবিত্র হবার সুযোগটিও দেবে...
পানি পেয়ে যখন আপনার চোখের ক্লান্তি এক নিমেশে দূর হবে, তখন হয়তো চিরকুটের অপরপ্রান্তে মরুভূমির একটি ম্যাপও আপনি দেখতে পাবেন, যে ম্যাপটি হয়তো সেই চিরকুট লেখকই একে গিয়েছেন, যাকে আপনি জীবনে একটা বারের জন্যে না দেখেও চিরকুটের কয়েকটি কথা পড়ামাত্রই তা বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন...
তবে চিরকুট লিখা সেই ব্যক্তিটি যদি তার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে ব্যর্থ হয়, অর্থাৎ মরিচা পড়া সে নলকূপ থেকে যদি যদি আপনি উপকৃত আর নাই হোন, তবে ধরে নিতে হবে আল্লাহ আপনার জন্যে বিকল্প কোন পরিকল্পনা রেখেছেন, যেটি এই মরিচা পড়া নলকূপ থেকে পানি পাওয়ার ভাবনা থেকে উত্তম...
খুব সম্ভবত সে কারণেই ১৯১৩ সালের অনেক ব্যক্তিই টাইটানিক জাহাজে চড়ার টিকিট পাননি... কারণ উপরে থাকা মহাবিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিমান এবং ভবিষ্যতদ্রষ্টা সেই ভদ্রলোকটি খুব ভালকরেই জানতেন, যে এই গ্রহের সবচেয়ে বড় এই জাহাজটি জীবনে প্রথমবারের মত যাত্রা শুরু করছে... এবং একই সাথে জীবনে শেষবারের মত...
🙂
লিখাঃ আশিক সরকার