06/01/2026
বিদেশী গরুর মাংস আমদানিতে ঝুঁকি আছে: মপ্রাম উপদেষ্টা
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা জনাব ফরিদা আখতার বলেছেন, আমেরিকা আমাদের দেশে মাংস রপ্তানি করতে চায়, ব্রাজিল স্বল্পমূল্যে মাংস রপ্তানি করতে চায়। কিন্তু আমি বিদেশে গিয়ে দেখেছি তাদের ডোমেস্টিক মাংসের দাম কম না। তারা আসলে তাদের প্রাণিসম্পদ ইন্ড্রাস্ট্রির উদ্বৃত্ত মাংস আমাদের দেশে রপ্তানি করতে চায়। বিদেশ থেকে মাংস আমদানির ক্ষেত্রে নানাবিধ ঝুঁকি রয়েছে। একটি ঝুঁকি তো হলো, মাংস আমদানি করা হলে আমাদের খামারিরা বিপদে পড়বে, তাদের গরুর মাংস বিক্রি হবে না। এছাড়া বিদেশি মাংস সাবান-শেম্পুর মতো ইন্ড্রাস্ট্রির পণ্য হওয়ায়, এগুলো আমদানির ফলে স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও থেকে যায়।
আজ বিকেলে সাভারে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) কর্তৃক বাস্তবায়িত “আইওটি বেইজড 4F মডেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের খরা-প্রবণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই জলবায়ু সহিষ্ণু প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সেমিনার ও ‘4F মডেল’ এর রেপ্লিকা উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথি ভাষণে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা জনাব ফরিদা আখতার একথা বলেন।
এসময় তিনি আরও বলেন, কোন সেক্টরই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের বাইরে নয়। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তন এবং কার্বন নিঃসরণ রোধকল্পে ‘4F মডেল’ একটি আকর্ষণীয় মডেল। এই মডেল মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব হবে। আমার আরও ভালো লেগেছে এটি জেনে যে, এই মডেলটি বিশেষ করে আমাদের দেশের ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য অধিক উপযোগী। এতে করে একদিকে যেমন প্রান্তিক খামারিরা লাভজনক খামার করতে পারবে, তেমনিভাবে জৈব গ্যাস ও জৈব সার তাদের বাড়তি লাভের যোগানও দিতে পারবে।
উক্ত রেপ্লিকা উদ্বোধন এবং সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) জনাব গাজী মো. ওয়ালি-উল-হক। সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ান। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বিএলআরআই এর মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রধান অতিথি এবং অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ বিএলআরআই গবেষণা খামারে অবস্থিত প্রকল্প এলাকার কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এসময় প্রকল্প আওতায় স্থাপিত ‘4F মডেল’ এর রেপ্লিকা উদ্বোধন করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা জনাব ফরিদা আখতার। এসময় তিনি প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রমে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
এরপর অতিথিগণ বিএলআরআই এর চতুর্থ তলার কনফারেন্স রু্মে আয়োজিত সেমিনারে অংশ নেন। বিকাল ০৩.০০ ঘটিকায় পবিত্র কুরআন হতে তেলোয়াতের মধ্য দিয়ে সেমিনারটি শুরু হয়। এর পর আমন্ত্রিত অতিথিদের উদ্দেশ্যে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত পরিচালক ড. এ বি এম মুস্তানুর রহমান।
স্বাগত বক্তব্যের পরে “আইওটি বেইজড 4F মডেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের খরা-প্রবণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই জলবায়ু সহিষ্ণু প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন” শীর্ষক প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, বাস্তবায়ন কার্যক্রম পদ্ধতি, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ইত্যাদি সার্বিক বিষয়ে উপস্থাপন করেন সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং ইনস্টিটিউটের বায়োটেকনোলজি বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ খায়রুল বাশার।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পরে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষজ্ঞ আলোচনা। এসময় আলোচনা করেন বিএলআরআই এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জলবায়ু সহিষ্ণু প্রাণিসম্পদ উৎপাদন গবেষণা কেন্দ্রের দপ্তর প্রধান ড. সরদার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এর ন্যাশনাল কনসালটেন্ট ও বিএলআরআই এর সাবেক মহাপরিচালক ড. খান শহীদুল হক। পাশপাশি এসময় প্রকল্প কার্যক্রম সম্পর্কে অনলাইনে মতামত ব্যক্ত করেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ ফেলো (একাডেমিক স্টাফ) ড. রফিকুল ইসলাম।
বিশেষজ্ঞ আলোচনার পরে প্রকল্পের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুজন খামারি প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন। এর পরে অনুষ্ঠিত হয় উন্মুক্ত আলোচনা। উন্মুক্ত আলোচনা অংশ পরিচালনা করেন বিএলআরআই এর মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক। এসময় বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত প্রতিনিধি ও শিক্ষকগণ, বিভিন্ন সংগঠন থেকে আগত প্রতিনিধিবৃন্দ, বিএলআরআই এর বিজ্ঞানীগণ ও অন্যান্য আমন্ত্রি অংশগ্রহণকারীগণ। উন্মুক্ত আলোচনার পরে আমন্ত্রিত অতিথিরা একে একে তাদের বক্তব্য প্রদান করেন।
উক্ত সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় হতে আগত সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ, প্রাণী ও পোল্ট্রি উৎপাদন এবং খামার ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত বিশেষজ্ঞ, খামারি, উদ্যোক্তা ও সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ, বিএলআরআই-এর বিভিন্ন পর্যায়ের বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যম হতে আগত প্রতিনিধিবৃন্দ।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এর অর্থায়নে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) কর্তৃক “আইওটি বেইজড 4F মডেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের খরা-প্রবণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই জলবায়ু সহিষ্ণু প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন” শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে জুলাই, ২০২৫ হতে জুন, ২০২৭ সময়কাল পর্যন্ত এবং প্রাক্কলন ব্যস্ত নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০০.০০ লক্ষ টাকা মাত্র। সাতটি জেলার ১৪ টি উপজেলার নির্বাচিত খামারিদের নিয়ে প্রকল্পটির গবেষণা কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।
চলমান প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলে 4F মডেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই ও জলবায়ু সহিষ্ণু প্রাণিজ আমিষের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পুষ্টি ও খাদ্যের নিরাপত্তা বিধান এবং গ্রীণ হাউস গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে মাটি ও মানব স্বাস্থ্যের উন্নয়ন সাধন। 4F মডেল এর মধ্যে রয়েছে প্রাণিখাদ্য (Feed), মানব খাদ্য (Food), জৈব জ্বালানী (Fuel) এবং জৈব সার (Fertilizer)। 4F মডেলের মাধ্যমে এই চারটি উপাদানের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের মাধ্যমে কম খরচে প্রাণিখাদ্য ও মানব খাদ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জৈব সার উৎপাদনের একটি চক্র নির্মাণ করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পটির প্রধান প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ হলো- ১) গুণগত মানসম্পন্ন প্রাণী খাদ্য উৎপাদন, তার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে কম খরচ সমৃদ্ধ দুধ ও মাংস উৎপাদন, গোবর ও খামারের উচ্ছিষ্টাংশের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানী ও জৈব সার উৎপাদন নিশ্চিত করা; ২) ক্লাউডভিত্তিক IoT বেসড মনিটরিং সিস্টেম বাস্তবায়নের মাধ্যমে পানির অপচয় রোধ করা এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা; ৩) গ্রীণ হাউস গ্যাস নিঃসরণের পরিমাণ নির্ণয় করা এবং হ্রাসের পদ্ধতি নিরূপণ করা এবং ৪ সর্বোপরি লো কার্বন নিঃসরণ পদ্ধতির মাধ্যমে অধিক উৎপাদনক্ষম টেকসই এবং জলবায়ু সহিষ্ণু প্রাণিজ আমিষ উৎপাদন করে খরা প্রবণ ও উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবিকার মান উন্নয়ন করা।
প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের খরা-প্রবণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে স্বল্প খরচে গুণগত মানসম্পন্ন প্রাণিখাদ্যের উৎপাদন, তার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে দুধ ও মাংসের উৎপাদন ২০-৩০% বৃদ্ধি করে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। গোবর ও খামারের উচ্ছিষ্টাংশের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানী উৎপাদন করে প্রাকৃতিক গ্যাসের উপরে নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা যাবে। পাশাপাশি বায়োগ্যাস হতে উৎপাদিত বায়োস্লারিকে বায়ো ফার্টিলাইজারে রূপান্তরিত করে ঘাসের জমিতে প্রয়োগের মাধ্যমে রাসায়নিক সারের ব্যবহার প্রায় ৪০- ৫০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে। ফলে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পাবে, জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ প্রায় ২০- ৩০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে এবং প্রকল্প এলাকায় বছরব্যাপী সবুজ ঘাসের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা যাবে। ক্লাউডভিত্তিক আইওটি বেইজড মনিটরিং সিস্টেম বাস্তবায়নের মাধ্যমে খামারে পানির অপচয় ৭০% কমিয়ে এর দক্ষ ও পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এছাড়াও পরিচালিত গবেষণার মাধ্যমে নেপিয়ার ঘাস বিভিন্ন স্টেজে পরিবেশ থেকে কি পরিমাণ CO2 শোষণ করে তার মূল, কাণ্ড ও পাতার মাধ্যমে কি পরিমাণ কার্বন সিকুয়েস্ট্রেশন করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করছে তা নিরূপণ করা হবে। সর্বোপরি প্রকল্প এলাকার মানুষের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ২০-২৫% গ্রীণহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে মাটি ও মানব স্বাস্থ্যের উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব হবে।