04/09/2026
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। যে দেশটির উন্নয়ন বিশ্বজুড়ে এক বিষ্ময় হিসেবে দেখা হয়, তার জন্য জাতীয় অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত এই উত্তরণ স্থগিতের অনুরোধ করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্ত ছিল।
আমরা জানি যে, বাংলাদেশ মাথাপিছু জাতীয় আয় (GNI), মানবসম্পদ সূচক (HAI) এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক (EVI)- এই তিনটি শর্ত পূরণ করেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছিল। তবে অংশীদার ও নীতি-নির্ধারকেরা একমত হয়েছেন যে, আর্থ-সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য কাঠামোগত প্রস্তুতির অভাব এখনও রয়ে গেছে। একই সাথে, অর্থনৈতিক মাইলফলক অর্জনকে অর্থনৈতিক প্রস্তুতির সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। তাই মূল প্রশ্নটি এটা নয় যে বাংলাদেশ উত্তরণের যোগ্য কি না, বরং প্রশ্ন হলো দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের সম্ভাবনাকে ঝুঁকির মধ্যে না ফেলে উত্তরণ-পরবর্তী পরিস্থিতি সামলাতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত।
অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনা করে, সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ উন্নয়ন নীতি কমিটির (CDP) কাছে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। সিডিপি পরবর্তীতে এই অনুরোধ গ্রহণ করে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ায়। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, কঠিন সিদ্ধান্তগুলো এড়িয়ে না গিয়ে এই অতিরিক্ত সময়কে গভীর কাঠামোগত সংস্কারের কাজে লাগাতে হবে। আমাদের স্পষ্ট হতে হবে যে এই সিদ্ধান্ত কোনো কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের একটি কৌশলগত সুযোগ।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো একটি মাত্র রপ্তানি খাতের ওপর বাংলাদেশের অতিরিক্ত নির্ভরতা-তা হলো তৈরি পোশাক খাত, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় চার-পঞ্চমাংশ। এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হলেও, শুধু একটি খাতের ওপর নির্ভরতা বড় ঝুঁকি তৈরি করে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা হারাবে, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান অগ্রাধিকারমূলক সুবিধাগুলোর ক্ষেত্রে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সামান্য শুল্ক বৃদ্ধিও দেশের রপ্তানি সক্ষমতা অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে, যেখানে প্রতিযোগী দেশগুলো সুবিধা পেয়ে এগিয়ে থাকবে।
দেশের ওষুধ শিল্পও একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার 'ট্রিপস' (TRIPS) চুক্তির আওতায় মেধাসত্ত্ব সংক্রান্ত কিছু ছাড় পায়। এর ফলে দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারকরা কোনো লাইসেন্স ফি না দিয়েই অনেক পেটেন্ট করা ওষুধ তৈরি করতে পারে। এই সুবিধার কারণেই বিকাশ ঘটেছে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ওষুধ শিল্পের। এই সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমবে। ফলে উদ্ভাবন ও নীতিগত সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি না করলে বাজারে ওষুধের দাম ও সহজলভ্যতায় প্রভাব পড়তে পারে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণে আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়াটাও উদ্বেগের বিষয়। গত দুই দশক ধরে বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ নির্মাণ, চামড়াজাত পণ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং হালকা প্রকৌশলের মতো খাতগুলো পিছিয়ে রয়েছে। কোনো আধুনিক অর্থনীতি শুধু একটি খাতের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে বাহ্যিক ধাক্কা সামলে টিকে থাকতে পারে না।
রাজস্ব আয় কম হওয়াও আরেকটি বড় বাধা, কারণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অন্যতম সর্বনিম্নে। পরিকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং জলবায়ু অভিযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় বড় বিনিয়োগে অর্থায়নের মতো অভ্যন্তরীণ রাজস্ব নেই। তাই সহজ শর্তে পাওয়া ঋণের প্রভাব সামলাতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়াতে হবে।
প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের (FDI) প্রবাহও দেশের সম্ভাবনার চেয়ে অনেক কম। বিনিয়োগকারীরা নীতির অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, আইনি বিলম্ব, অসামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়মকানুন এবং সুশাসনের অভাবকে মূল বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এসব কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না হলে কেবল উত্তরণ দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো যাবে না।
শ্রমিকদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতেও জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। বাংলাদেশে বিশাল কর্মক্ষম জনসংখ্যা বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড থাকলেও ম্যানুফ্যাকচারিং, ডিজিটাল সেবা, ইঞ্জিনিয়ারিং, স্বাস্থ্যসেবা ও উন্নত প্রযুক্তির মতো জায়গায় দক্ষ শ্রমিকের অভাব রয়ে গেছে। কারিগরি শিক্ষা, ভোকেশনাল ট্রেনিং এবং উদ্ভাবনে বড় বিনিয়োগ না করলে উত্তরণের পরেও বাংলাদেশ কম মূল্যের পণ্য উৎপাদনের ফাঁদেই আটকে থাকবে।
জলবায়ুগত ঝুঁকি বাংলাদেশের অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উত্তরণের সাথে সাথে জলবায়ু সহনশীলতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, টেকসই পরিকাঠামো ও সবুজ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৯ সাল পর্যন্ত উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে আলস্যের সুযোগ হিসেবে না দেখে কৌশলগত প্রস্তুতির সময় হিসেবে দেখা উচিত। এই অতিরিক্ত তিন বছরকে একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় সংস্কারের রোডম্যাপ তৈরির কাজে লাগাতে হবে।
প্রথমত, উচ্চমূল্যের ম্যানুফ্যাকচারিং, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ ও জ্ঞানভিত্তিক সেবায় বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে রপ্তানি বহুমুখী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের GSP+ সুবিধা এবং প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সাথে দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) করার আলোচনা দ্রুত এগোতে হবে, যাতে এলডিসি সুবিধা শেষ হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তৃতীয়ত, ব্যাপক কর সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্বের পরিধি বাড়াতে হবে, কর আদায় জোরদার করতে হবে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা আনতে হবে। চতুর্থত, নিয়মনীতির স্থায়িত্ব, বিচারবিভাগীয় গতিশীলতা, দুর্নীতি দমন এবং ব্যবসা সহজীকরণের মতো ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পঞ্চমত, শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা, ডিজিটাল পরিকাঠামো, গবেষণা ও উদ্ভাবনে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হবে যাতে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে উচ্চমানের পণ্য ও সেবা সরবরাহ করতে পারে। এবং সবশেষে, রাজনৈতিক আশাবাদের ওপর ভিত্তি না করে, অর্জিত অগ্রগতির বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের জন্য উত্তরণ প্রস্তুতির একটি বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা বা মাপকাঠি নির্ধারণ করতে হবে।
ইতিহাস দেখায় যে, সফল উত্তরণ শুধু পরিসংখ্যানগত সংখ্যা দিয়ে হয় না, বরং কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে। সুবিধা শেষ হওয়ার আগেই যেসব দেশ তাদের উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে, তারাই সফলভাবে এই পরিবর্তন সামলাতে পেরেছে। আর যারা সঠিক প্রস্তুতির আগে উত্তরণ ঘটিয়েছে, তারা সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশ গত পাঁচ দশকে তার অসাধারণ সহনশীলতা দেখিয়েছে। আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ শুধু এলডিসি থেকে উত্তরণ করা নয়, বরং অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা ছাড়াই প্রতিযোগিতামূলক, বহুমুখী ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটিয়ে সমৃদ্ধি বজায় রাখা।
অতএব, উত্তরণ পিছিয়ে যাওয়াকে সাফল্য পিছিয়ে যাওয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি একটি সুযোগ, যাতে বাংলাদেশ যখন আনুষ্ঠানিকভাবে উন্নীত হবে, তখন যেন তা সম্পূর্ণ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই হতে পারে।
এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান A K M Wahiduzzaman
তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি )