22/08/2026
জুলাইয়ের চার সত্য, জুলাইয়ের আমসত্ত্ব
আখতারুজ্জামান আজাদ
১২-১৫ জুলাই ২০২৬
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো ২০২৪-এর কোটাসংস্কার আন্দোলন। ’৭৫-এর মুজিবহত্যা ও সামরিক শাসন জারি, ’৮১ সালের জিয়াহত্যা ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতাগ্রহণ, ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থান ও এরশাদপতন, ’৯২-এর গণআদালত গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের মুখে ’৯৬-এ বিএনপি সরকারের পতন, ২০০৪-এর একুশে আগস্টের গ্রেনেডহামলা, ২০০৭-এর আধাসামরিক শাসন, যুদ্ধাপরাধমামলায় ২০১৩ সাল থেকে শুরু হওয়া রায়প্রদান ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাবলি; যেগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন চর্চা হয়েছে এবং হবে। ২০২৪-এর আন্দোলনও সেই তালিকায় অনিবার্যভাবে স্থান করে নিয়েছে। কোটাসংস্কারের নিরপেক্ষ ছদ্মাবরণে শুরু হলেও আন্দোলনের পরিকল্পনাকারীদের অনেকেই বলেছেন কোটাসংস্কার ছিল উপলক্ষ মাত্র, সরকারপতিনই ছিল এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। এই আন্দোলনে ইউএসএর প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা ও সার্বক্ষণিক হস্তক্ষেপও এখন সর্বজনবিদিত ও সর্বজনস্বীকৃত। আন্দোলনে যাদের পতন হয়েছে, সেই আওয়ামি লিগ দাবি করে তারা সেরেফ প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের শিকার, আন্দোলনের বৃহত্তম অংশীজন বলে দাবি করা জামায়াতে ইসলামি ছদ্মবেশী জুলাই আন্দোলনকে প্রতারণা বলে স্বীকার করতে নাছোড়বান্দা রকমের নারাজ এবং আন্দোলনের অন্যতম অংশীজন বিএনপি কোনোভাবেই স্বীকার করতে ইচ্ছুক নয় ৫ আগস্টের মতো মহাপ্রলয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরির পেছনে বিএনপিরও দায় আছে। এই লেখায় নিরূপণ করার চেষ্টা করব ৫ আগস্টের ঘটনায় এই তিন রাজনৈতিক দলের দায় কতটা।
৫ আগস্ট পতন যেহেতু আওয়ামি লিগ সরকারের হয়েছে, সেহেতু শুরুতেই নজর দেওয়া যেতে পারে এর পেছনে আওয়ামি লিগের ঐতিহাসিক দায়ের ওপর। ইতিহাসের দিকে সামান্য দৃষ্টিপাত করলেই দেখা যায়— বাংলাদেশের কোনো সরকারই একতরফা নির্বাচন আয়োজন করে সেই সংসদের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। স্বৈরশাসক এরশাদের আয়োজিত ১৯৮৬ সালের নির্বাচন দুই বড় দলের এক দল বিএনপি বর্জন করেছিল এবং সেই সংসদ দুই বছরও স্থায়ী হয়নি। এরশাদ-আয়োজিত ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে মূল ধারার কোনো দলই অংশ নেয়নি এবং এই সংসদের মেয়াদও পূর্ণ হতে পারেনি, নির্বাচনের সাড়ে তিন বছরের মাথায় বরং গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হন। খালেদা জিয়া কর্তৃক আয়োজিত ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বাদে অংশ নিয়েছিল শুধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের দল ফ্রিডম পার্টি। সেই সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর বারো দিনের মাথায় সরকারকে বিদায় নিতে হয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত কোনো সরকারই টিকে থাকতে পারেনি। এ-ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম শেখ হাসিনার আওয়ামি লিগ। পরপর দুটো ভুয়া নির্বাচন আয়োজন করার পরও আওয়ামি লিগ সরকার বহাল তবিয়তে টিকে ছিল এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আরও একটি ভুয়া নির্বাচন আয়োজন করেছিল। কিন্তু তৃতীয় যাত্রায় সেই সরকার আর টেকেনি, নিয়েছে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক ও সবচেয়ে রক্তাক্ত বিদায়।
আওয়ামি লিগ ১৯৮৬ সালের নির্বাচন প্রথমে বর্জন করার ঘোষণা দিলেও শেষতক অংশগ্রহণ করেছিল এবং প্রধান বিরোধীদলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন বিএনপি-জোট বয়কট করায় আওয়ামি লিগ একশো তিপ্পান্ন আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘জয়লাভ’ করেছিল। আওয়ামি লিগ ১৯৮৬ সালে বিরোধীদল হয়ে এরশাদকে যে-ঋণের জালে আবদ্ধ করেছিল, বিএনপিবিহীন সংসদে বিরোধীদল হয়ে এরশাদের জাতীয় পার্টি আটাশ বছর পর ২০১৪ সালে সেই ঋণ শোধ করেছে; একই কাজ করেছে ২০২৪ সালের নির্বাচনেও। কথিত আছে, ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর আওয়ামি লিগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দলীয় ফোরামে পরামর্শ দিয়েছিলেন সংসদ ভেঙে দিয়ে সব দলের অংশগ্রহণে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন আয়োজনের। কিন্তু শেখ হাসিনা এবং আওয়ামি লিগের অন্য নেতারা আশরাফের সেই পরামর্শকে পাত্তা দেননি; বরং তাকে প্রথমে সরানো হয়েছে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে, পরে সরানো হয়েছে দলের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে এবং দলের এই গুরুদায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে ওবায়দুল কাদেরের মতো একজন যুগশ্রেষ্ঠ অপদার্থের হাতে। শেখ হাসিনা ভুয়া নির্বাচনও আয়োজন করেছেন তিনবার, ওবায়দুল কাদেরকে দলের সাধারণ সম্পাদকও বানিয়েছেন তিনবার। বলাই বাহুল্য, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পরামর্শক্রমে ২০১৪-পরবর্তী যেকোনো সময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচন আয়োজন করলে আওয়ামি লিগের পরিণতিও এমন হতো না, দেশও এমন সুদূরপ্রসারী দুর্দশায় পড়ত না। আওয়ামি লিগের মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেশকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
তিন ভুয়া নির্বাচনের মধ্যে আওয়ামি লিগ সবচেয়ে বড় জোচ্চুরি করেছে ২০১৮ সালে। মূল ধারার সব দলই সেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল এবং নির্বাচন যদি শতভাগও সুষ্ঠু হতো, তাতেও আওয়ামি লিগের জেতার সম্ভাবনা ছিল, হারলে স্বল্প ব্যবধানেই হারত। কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের জঘন্যতম নির্বাচনটি আয়োজন করে আওয়ামি লিগ সরকার। ভোটকারচুপির সব ধরনের নির্লজ্জতাকে হার মানিয়ে আওয়ামি লিগ সরকার এই নির্বাচনে বিএনপির মতো একটি বড় দলকে মাত্র পাঁচটি আসনে জয়ী দেখিয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনসহ সংসদে বিএনপি-জোটের মোট সদস্য ছিলেন সাকুল্যে সাতজন। ২০১৮ সালের নির্বাচন কতটা বীভৎস ও কুৎসিত ছিল, এর নমুনা পাওয়া যাবে কয়েকটি উদাহরণ দিলে। এই নির্বাচনে মাদারিপুর-১ আসনে আওয়ামি লিগের প্রার্থী নুর-ই-আলম লিটনের প্রাপ্ত ভোটসংখ্যা ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৯৩, পক্ষান্তরে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামি আন্দোলনের জাফর আহমদ পেয়েছেন ৪৫২ ভোট; সিরাজগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামি লিগের মোহাম্মদ নাসিম পেয়েছেন ৩ লাখ ২৪ হাজার ৪২৪ ভোট, নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির রুমানা মোরশেদ কনকচাঁপা পেয়েছেন ১ হাজার ১১৮ ভোট; চট্টগ্রাম-৬ আসনে আওয়ামি লিগের হাছান মাহমুদের ২ লাখ ১৭ হাজার ১৫৫ ভোটের বিপরীতে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এলডিপির নুরুল আলম পেয়েছেন ৬ হাজার ৬৫ ভোট। গোপালগঞ্জে এই পরিসংখ্যান আরও শোচনীয়। গোপালগঞ্জের তিনটি আসনে আওয়ামি লিগের তিন প্রার্থী শেখ হাসিনা, শেখ ফজলুল করিম সেলিম এবং ফারুক খান পেয়েছেন মোট ৮ লাখ ১৪ হাজার ৫৭২ ভোট। আর তাদের নিকটতম তিন প্রতিদ্বন্দ্বী মিলে পেয়েছেন ১ হাজার ৪৩৭ ভোট।
প্রধান বিরোধীদল সদলবলে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করার পর অন্তত ২০১৮ সালে আওয়ামি লিগ সরকার একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে পারত বা পারত ‘সহনীয় মাত্রায়’ কারচুপি করতে (নিজের মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের খুল্লামখুল্লা দুর্নীতিতে অসহায় হয়ে আওয়ামি লিগেরই শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ কর্মকর্তাদেরকে একবার বলেছিলেন সহনীয় মাত্রায় দুর্নীতি করতে)। কিন্তু দুর্বিনীত আওয়ামি লিগ একেকটি আসনে নিজেদের মার্কায় দুই-তিন লাখ করে সিল মেরে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের মার্কশিটে দেখিয়েছে পাঁচশো-একহাজার ভোট, ক্ষেত্রবিশেষে এমনকি ১৭২ ভোট। সারাবিশ্বে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও এবং ১৯৯৬ সালে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে আওয়ামি লিগ দেশ অচল করে দিলেও ২০১৮ সালে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ধারণাটিকেই আওয়ামি লিগ সেরেফ কবর দিয়ে দিয়েছে, কবর দিয়েছে নিজেদেরকেও। তিন ভুয়া নির্বাচনের পক্ষে আওয়ামি লিগ বরাবরই অজুহাত দাঁড় করায় যে, আওয়ামি লিগ সবাইকে নির্বাচনে আসতে দিয়েছে, বিরোধীদল নির্বাচন বর্জন করলে আওয়ামি লিগের আর কী বা করার আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো তিন ভুয়া নির্বাচনের অন্তত একটিতে সব বিরোধীদল অংশ নিয়েছিল এবং সেই নির্বাচনে প্রধান বিরোধীদলকে পাঁচটি আসন দিয়ে বাকি সব আসন আওয়ামি লিগ নিজে রেখে দিয়েছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জনগণের ভোট নিয়ে এহেন ছেলেখেলা করে আওয়ামি লিগ যে-পাপ করেছে, এখন প্রায়শ্চিত্তকাল চলছে।
২০২৪-এর ৭ জানুয়ারির দশদিন পর একটি কলামে লিখেছিলাম— ‘২০২৪-এর শেখ হাসিনার সামনে-পেছনে ডানে-বামে আর কিছুই থাকল না। তিনি এখন এমন এক সর্বশক্তিমান সত্তা হয়ে গেলেন— যিনি রাষ্ট্রের কেবল প্রধানমন্ত্রীই নন; একাধারে রাষ্ট্রপতি, প্রধান বিচারপতি, প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা, তিন বাহিনীর প্রধান, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র্যাবের মহাপরিচালক, ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপকও তিনি; তিনিই মহাহিশাবনিয়ন্ত্রক, তিনিই শিক্ষাবোর্ডের মহাপরীক্ষক। অর্থাৎ তিনি সর্প হয়ে দংশন করার ক্ষমতাও রাখবেন, ওঝা হয়ে ঝাড়ার ক্ষমতাও রাখবেন; ক্ষমতা রাখবেন হাকিম হয়ে হুকুম করারও, পুলিশ হয়ে ধরারও। নির্বাচনকে প্রতিযোগিতাপূর্ণ করার জন্য তিনি যে নিজ দলের নেতাদেরকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী বানিয়ে মাঠে নামিয়ে দিলেন, তিনি নিজেও জানেন— এর ফলে আওয়ামি লিগে স্থানীয় পর্যায়ে চিরস্থায়ী দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হলো। নৌকা প্রতীক পাওয়া প্রার্থী আর আওয়ামি লিগেরই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে আসনে-আসনে যে-শত্রুতা এই নির্বাচনে সৃষ্ট হয়ে গেল, এ আর কখনোই মিটবে না। কোনো-কোনো সরীসৃপ মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে গেলে নিজের লেজ নিজেই কামড়ে খেয়ে ফেলার চেষ্টা করে এবং মৃত্যুমুখে পতিত হয়। আলোচ্য নির্বাচনে আওয়ামি লিগ নিজেই নিজের লেজে কামড় দিয়েছে, খাওয়া শুরু করে দিয়েছে নিজেকে নিজে। এভাবে নিজেকে খেয়ে আওয়ামি লিগ কতদিন ক্ষুধা নিবারণ করতে পারবে— তা সময়ই নির্ধারণ করে দেবে।’ একই কলামে লিখেছিলাম— ‘সবচেয়ে বড় কথা— ক্ষমতা থেকে নিরাপদ প্রস্থানের কোনো রাস্তাই আওয়ামি লিগ অবশিষ্ট রাখল না। অস্বাভাবিক প্রস্থানই আওয়ামি লিগ নিজ ভাগ্যলিপিতে লিখে ফেলেছে।’
গুম, খুন, ধর্ষণ, লুটতরাজ, স্বজনপ্রীতি, পদবাণিজ্য, অর্থপাচার, রাজনৈতিক দমনপীড়ন সব সরকারই করে এবং এর পরিমাণও সমান-সমান। এসব অপরাধের জন্য বাংলাদেশের কোনো সরকারকেই মেয়াদপূর্তির আগে বিদায় নিতে হয়নি। বাংলাদেশের অধিকাংশ নাগরিকই ব্যক্তিজীবনে দুর্নীতিপরায়ণ বিধায় সরকারের দুর্নীতিকে এই নাগরিকরা নেতিবাচকভাবে নেয় না, বরং অপেক্ষাকৃত বড় দুর্নীতিবাজদেরকে মনে-মনে ঈর্ষা করে। বাংলাদেশে সরকারপতন হয় ভুয়া নির্বাচন আয়োজন করলে। ছাত্রদের বুকে গুলি চালালে মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপে, কিন্তু অল্প কিছুদিনের মাথায় ক্ষোভ থিতিয়েও আসে। পাকিস্তান আমলে নিয়মিত বিরতিতেই ছাত্রদের বুকে গুলি চালানো হতো, কিন্তু সরকারপতন হয়েছে মাত্র একবার, ১৯৬৯ সালে। ছাত্রদের বুকে নিয়মিত গুলিবর্ষণ হয়েছে এরশাদের আমলেও। কিন্তু তার পতন হয়েছিল মূলত দুটো ভুয়া নির্বাচন আয়োজনের জন্য। একই অপরাধে বেগম খালেদা জিয়াকেও একবার লজ্জার সঙ্গে বিদায় নিতে হয়েছে, ১৯৯৬ সালে। আওয়ামি লিগকেও ২০২৪ সালে বিদায় নিতে হয়েছে তিনটি ভুয়া নির্বাচন এবং ছাত্রদের বুকে গুলিবর্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে। ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামি লিগের নেতাকর্মীরা প্রায়ই বলতেন— সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াতের হাতে ক্ষমতা তুলে দিলে আরেকটি একুশে আগস্ট ঘটবে। কিন্তু এখনকার প্রতিটি দিনই আওয়ামি লিগের নেতাকর্মীদের জন্য একেকটি একুশে আগস্ট। অর্থাৎ ভুয়া নির্বাচন আয়োজন করে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রেখে একুশে আগস্ট ঠেকানো যায় না, বরং এক হাজার একুশে আগস্টের চেয়ে শক্তিশালী ৫ আগস্ট এসে মহাপ্রলয় ঘটিয়ে দেয়।
ব্যাপারটি ইতোমধ্যেই স্পষ্ট যে, স্বাভাবিক বিদায়ের কোনো রাস্তাই আওয়ামি লিগ খোলা রাখেনি, অস্বাভাবিক বিদায়ই আওয়ামি লিগ নিজেদের হাতে নিজেদের ভাগ্যলিপিতে লিখে রেখে ফেলেছিল। ২০২৪-এ পতন না-হলে অদূর ভবিষ্যতে কখনও-না-কখনও আওয়ামি লিগকে অস্বাভাবিকভাবেই বিদায় নিতে হতো। দেশে এমন কোনো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটতে পারত, যাতে এক রাতে মারা পড়তে পারতেন আওয়ামি লিগের মন্ত্রিসভার অর্ধেক সদস্য কিংবা অধিকাংশ সাংসদ। কিন্তু সেসবের কিছুই ঘটেনি। বালামুসিবত যা যাওয়ার, সব গিয়েছে সাধারণ জনগণের ওপর দিয়ে এবং দলের সাধারণ কর্মীদের ওপর দিয়ে। আওয়ামি লিগের একজন কেন্দ্রীয় নেতাও আগস্টপরবর্তী সহিংসতায় নিহত হননি, বরং সেনানিবাসে আশ্রয় পেয়েছেন, সুবিধাজনক সময়ে দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশে গিয়ে ভোগবিলাসেই মত্ত আছেন। আরও উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, নিকটাত্মীয়দের প্রায় সবাইকে শেখ হাসিনা ৫ আগস্টের আগেই দেশ থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন অথবা ফাঁসির দড়িতে লটকে পড়ার বিপদ আঁচ করতে পেরে তারা নিজেরাই ৫ আগস্টের আগমুহূর্তে নিরাপদ দূরত্বে সটকে পড়েছেন। ফলে, ‘৫ আগস্ট’ ছিল আওয়ামি লিগের পাপের সর্বনিম্ন শাস্তি। মোদ্দা কথা— জুলাই আন্দোলন মেটিকিউলাস ডিজাইন হোক, হোক দেশী-বিদেশী চক্রান্ত— অস্বাভাবিক বিদায় এড়ানোর কোনো সুযোগ আওয়ামি লিগ নিজেই নিজের জন্য খোলা রাখেনি। এই সত্য মেনে নেওয়ার কোনো বিকল্প আওয়ামি লিগের হাতে নেই। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট আওয়ামি তার প্রাপ্য বুঝে পেয়েছে।
এবার আসা যাক বিএনপি প্রসঙ্গে। বাংলাদেশে একবিংশ শতাব্দীতে অসাংবিধানিক সরকার এসেছে দু’বার— ২০২৪-এর ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে একটি, আরেকটি ২০০৭-এর ১১ জানুয়ারি ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে। অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ্য যে, দুটো অসাংবিধানিক সরকারগঠনের প্রেক্ষাপটের সঙ্গেই বিএনপির দায় আছে। ২০২৪-এ ছিল পরোক্ষ দায়, ২০০৭-এ প্রত্যক্ষ দায়। অসাংবিধানিক সরকার ২০০৭-এ এসেছিল বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতিকে কলুষিত করেছিল বলে, ২০২৪-এ এসেছিল বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতিকে কলুষিত করেছিল বলেই। আওয়ামি লিগ নিজেদের কবর রচনা করেছিল ২০১১ সালের ৩০ জুন— পঞ্চদশ সংশোধনী এনে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি ঝেঁটিয়ে বিদায় করে এবং আওয়ামি লিগের এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিলের প্রেক্ষাপট বিএনপিই তৈরি করে দিয়েছিল। অর্থাৎ ‘৫ আগস্ট’ বিএনপি ও আওয়ামি লিগের সম্মিলিত কর্মফল। তলিয়ে দেখা যাক সেই ইতিহাস।
১৯৯১ থেকে ’৯৬ পর্যন্ত বিএনপির আমলে যতগুলো উপ-নির্বাচন হয়েছে, সবগুলোয় ব্যাপক কারচুপি হয়েছে— বিশেষত ’৯৪-এর মাগুরা উপনির্বাচন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামি লিগ ও জামায়াতে ইসলামি নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলেছিল। বিএনপি সেই দাবি অগ্রাহ্য করে এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিরোধীদলের অনুপস্থিতিতে একদলীয় নির্বাচনের আয়োজন করে। সরকারগঠন করে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অন্তর্ভুক্ত করে বিএনপি পদত্যাগও করে। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দুটো অপেক্ষাকৃত সুষ্ঠু নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়— বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন, আর বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের ইতিহাসে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল একবারই— ২০০১ সালের জুলাই মাসে। পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর আওয়ামি লিগ সরকার বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একটা সুস্থ ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই এগোচ্ছিল। প্রত্যাশিত ছিল— বিএনপিও সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে ২০০৬ সালে পদত্যাগ করবে। কিন্তু বিএনপি স্বাভাবিক পথে হাঁটেনি, বিএনপি বেছে নিয়েছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক এক পথ। সেটি হলো নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বানানোর জন্য সংবিধানপরিবর্তন।
স্বাভাবিক নিয়ম ছিল— প্রধান বিচারপতিদের মধ্যে যিনি সবার শেষে অবসর নিয়েছেন, তিনিই হবেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। কিন্তু কেএম হাসান ছিলেন বিএনপির পছন্দের প্রধান বিচারপতি। জনশ্রুতি আছে— তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন, ছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদকও। তিনি শেখ মুজিবুর রহমান হত্যামামলার বিচারকার্যে বিব্রতবোধও করেছিলেন। বিএনপির চাওয়া ছিল এই বিব্রত বিচারপতিই যেন ২০০৬-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হন। কেএম হাসান প্রধান উপদেষ্টা হলে বিএনপির জয় সুনিশ্চিত। তখন প্রধান বিচারপতিদের অবসরগ্রহণের বয়স ছিল পঁয়ষট্টি বছর। সেই অনুযায়ী স্বাভাবিক নিয়মে ২০০৪ সালে কেএম হাসান অবসরও নেন। কিন্তু কেএম হাসানের পরে যিনি (সৈয়দ জেআর মোদাচ্ছের আলী) প্রধান বিচারপতি হন, তার বয়স পঁয়ষট্টি হয়ে যায় ২০০৫ সালে। ফলে, ২০০৬ সালে সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হয়ে যান মোদাচ্ছের। কিন্তু বিএনপির কেএম হাসানকেই চাই। এ-অবস্থায় বিএনপি সরকার সংবিধান সংশোধন করে প্রধান বিচারপতিদের অবসরগ্রহণের বয়স পঁয়ষট্টি থেকে বাড়িয়ে সাতষট্টি করে দেয়, যাতে মোদাচ্ছের ২০০৫-এ অবসর না-নিয়ে ২০০৭-এ অবসর নেন। মোদাচ্ছেরকে ২০০৭-এ অবসর নেওয়ানো গেলে ২০০৬ সালে কেএম হাসানই হন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। অর্থাৎ সেরেফ কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বানানোর জন্য বিএনপি সরকার সংবিধান সংশোধন করেছিল।
পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সবারই জানা। বিএনপির আস্থাভাজন কেএম হাসানকে আওয়ামি লিগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিশেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, এর পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি (ইয়াজউদ্দিন আহমেদ) নিজেই প্রধান উপদেষ্টা হিশেবে দায়িত্ব নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন এবং এর ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়। বিএনপি যদি কেএম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা বানানোর জন্য সংবিধান সংশোধন না-করত এবং ২০০৬ সালে স্বাভাবিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করত, তা হলে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হতো না এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতাও অব্যাহত থাকত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু থাকলে বাংলাদেশে অপেক্ষাকৃত সুষ্ঠু নির্বাচন হতো; ২০১৪, ২০১৮ বা ২০২৪-এর মতো প্রহসনমূলক নির্বাচন হতো না। টানা তিনটি প্রহসনমূলক নির্বাচন না-হলে ৫ আগস্টেরও জন্ম হতো না। অর্থাৎ সেরেফ কেএম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়ে ২০০৬-এর নির্বাচনে যেকোনো মূল্যে জেতার জন্য বিএনপি সরকার যে ২০০৪-এ সংবিধানে চতুর্দশ সংশোধনী এনেছিল, বিএনপির সেই কেএম-পাপের প্রায়শ্চিত্ত বাংলাদেশকে এখনও করতে হচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে যে-দুটো অসাংবিধানিক সরকার এল, দুটোর পেছনেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে বিএনপির রেখে যাওয়া জীবাণু। বিশাল পুকুরে ক্ষুদ্র একটি ঢিল ছুড়লে সেই ঢিলসৃষ্ট ঢেউ যেমন ক্রমে-ক্রমে পুকুরের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তেমনি বিএনপির কেএম-কাণ্ডের ঢেউ দেশজুড়ে এখনও এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে পৌঁছেই চলছে।
জুলাই আন্দোলনে গোটা বাংলাদেশের জনগণ অংশগ্রহণ করেছে কেবল সাধারণ ছাত্রদের লাশ দেখে এবং বলাই বাহুল্য— জনগণের অংশগ্রহণ না-থাকলে কোনোভাবেই সরকারপতন হতো না। জনগণ জুলাইয়ে নির্দিষ্ট কোনো দলের আহ্বানে বা নির্দিষ্ট কোনো নেতার নির্দেশে রাজপথে নামেনি, নেমেছে কেবল সাধারণ ছাত্রদের রক্ত দেখে— সেরেফ বিবেকের তাড়নায়। সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দল জুলাই আন্দোলনে নেপথ্যে সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগ করেছে ঠিকই, কিন্তু সরকারপতনের পরপরই আন্দোলনের সমস্ত কৃতিত্ব এককভাবে ছিনতাই করে বগলদাবা করে ঘুরে বেড়িয়েছে জামায়াতে ইসলামি। কৃতিত্ব যে-দলেরই বা যাদেরই হোক, আন্দোলনের কৌশল হিশেবে জুলাইয়ে জামায়াত যা-যা অবলম্বন করেছিল বলে পরবর্তীকালে গণমাধ্যমে বলেছে; তা এক কথায় ন্যক্কারজনক। ইতিহাসের কুৎসিততম প্রতারণায় ঠাসা ছিল জামায়াতের কৌশলগুলো। আন্দোলন শেষ হয়ে যাওয়ার পর বৃহত্তর জামায়াতের বিভিন্ন নেতাকর্মী বিভিন্ন সময়ে বলেছেন জুলাইয়ের কোটাসংস্কার আন্দোলন কখনওই কোটাসংস্কার আন্দোলন ছিল না, বরং শুরু থেকেই ছিল সরকার হটানোর আন্দোলন। অথচ সাধারণ মানুষ একে কোটাসংস্কার আন্দোলন ভেবেই নিহত ছাত্রদের জন্য সহানুভূতি অনুভব করে রাজপথে নেমেছিল। আন্দোলন কোটাসংস্কারের ব্যাপারে না-হয়ে ভিন্ন কোনো গূঢ় উদ্দেশ্যে হচ্ছে জানলে জনসাধারণ কোনোক্রমে আন্দোলনের দিকে ফিরেও তাকাত না। এই প্রতারণা ক্ষমার অযোগ্য।
চিরকাল প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া জামায়াত জুলাইয়ে আরও প্রতারণা করেছে নিজ দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাদের পরিচয় লুকিয়ে রেখে, শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে স্লোগান দিয়ে এবং দেশজুড়ে লক্ষ-কোটি রকমের গুজব ছড়িয়ে দিয়ে। যে মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষ শিল্পসংস্কৃতি ও নারীনেতৃত্বকে ব্যবহার করে জামায়াত জুলাইয়ে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করেছে; রাষ্ট্রক্ষমতা করায়ত্ত হওয়ার পর এর সবগুলোকেই জামায়াত ঝেটিয়ে বিদায় করেছে। জামায়াতে ইসলামি সাতচল্লিশে ব্রিটিশদের কবল থেকে উপমহাদেশের স্বাধীনতাও চায়নি, মুসলমানদের জন্য আলাদা আবাসভূমি পাকিস্তানের জন্মও চায়নি; জামায়াতে ইসলামি একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতাও চায়নি, চালিয়েছে স্বজাতির ওপর গণহত্যা। জামায়াত সাতচল্লিশেরও পরাজিত শক্তি, একাত্তরেরও পরাজিত শক্তি। প্রতারণার মাধ্যমে জনসাধারণকে রাজপথে নামিয়ে একটি সরকারপতন ঘটার পর সেই সরকারপতনকে জামায়াত প্রচার করেছে দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্বাধীনতা হিশেবে, ৫ আগস্টের পরপরই বিএনপির সঙ্গে মিলে জামায়াত সারাদেশ থেকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় স্মারকচিহ্ন, গুঁড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম আঁতুড়ঘর হিশেবে পরিচিত শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডি ৩২-এর বাসভবন। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো পরোক্ষভাবে ক্ষমতা হাতে পেয়ে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে একজোট হয়ে যে বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ মুহাম্মদ ইউনুসের শাসনামলজুড়ে চালিয়েছে, তাতে ছাত্রদের লাশ দেখে রাজপথে নামা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন যেকোনো নাগরিক জুলাই আন্দোলনের ওপর বীতশ্রদ্ধ হতে এবং প্রতারিত বোধ করতে বাধ্য। জুলাই একদিকে ছিল অনিবার্য ও স্বতঃস্ফূর্ত, অন্যদিকে ছিল বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা।
বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে ২০০৬ সালে যে অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হবে, তা সকলেরই জানা ছিল। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগে অসাংবিধানিক সরকার গঠিত হতে পারে, সাধারণ মানুষ না-জানলেও ইউএসএর মতো চতুর ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো তা নিশ্চয়ই জানত। এদিকে, অসাংবিধানিক সরকারের ‘প্রধান’ পদে বসানোর জন্য কিংবা অসাংবিধানিক সরকারের আমলে কিংস পার্টি গঠন করে পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে সেই কিংস পার্টিকে জয়ী করে সরকারপ্রধান বানানোর জন্য ইউএসএ প্রস্তুত করে রেখেছিল মুহাম্মদ ইউনুসকে এবং দেশ-বিদেশের কোথাও কোনো ধরনের শান্তি প্রতিষ্ঠায় ন্যূনতম ভূমিকা না-থাকা সত্ত্বেও— মার্কিন মেটিকিউলাস ডিজাইনের অংশ হিশেবে— ইউএসএ ঠিক ২০০৬ সালেই ইউনুসকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাইয়ে দেয়। মার্কিন মহাপরিকল্পনা মোতাবেক ২০০৭ সালে ইউনুস ‘নাগরিক শক্তি’ নামক একটি রাজনৈতিক দল গঠনও করেছিলেন এবং অল্প কয়েক মাসের মাথায় তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিতেও বাধ্য হয়েছিলেন। দারিদ্র্যব্যবসায়ী ইউনুস মোটেই ‘পলিটিক্স ম্যাটেরিয়াল’ না। কিন্তু ইউনুসকে ঘিরে ইউএসএর মেটিকিউলাস ডিজাইন ২০০৭-এ ব্যর্থ হলেও ২০২৪-এ সফল হয়েছে এবং ২০২৪-এ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে ইউএসএর সব ধরনের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে ইউনুস শান্তিপূর্ণভাবে বিদায় নিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক বিদায়ের কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি ইউএসএর সঙ্গে নানান রকমের চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন এবং এসব অকল্পনীয় রকমের অসম চুক্তির যেকোনো একটি চুক্তি অন্য কোনো দেশের সঙ্গে হলে আন্দোলনে-আন্দোলনে দেশ অচল হয়ে যেত। সামরিক অভিযান না-চালিয়েই কোনো দেশ দখল করতে চাইলে ইউএসএ সে-দেশে একটি দুর্বল সরকার বসিয়ে দেয়, ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ছিল ইউএসএর বসানো সে-ধরনের দুর্বল সরকার। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধুরন্ধর ইউনুস দেড় বছরে বাংলাদেশের যতটুকু ক্ষতি করে গিয়েছেন, তা বাংলাদেশ কখনওই মেরামত করতে পারবে না।
যারা নির্দিষ্ট কোনো দলের সুবিধাভোগী বা অন্ধ সমর্থক, তাদের পক্ষে সেই দলের যেকোনো ন্যায়-অন্যায়কে অকুণ্ঠ সমর্থন দেওয়া সম্ভব। কিন্তু যারা ন্যূনতম শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, তারা একটি দলকে বড়জোর ভোট দিতে পারেন। কিন্তু তারা সেই দলের বা অন্য কোনো দলের সমস্ত অনিয়মকে চোখ বুজে অনাপত্তিপত্র দিতে পারেন না। তাদের বিবেকে সায় দেয় না, তাদের বিবেকে বাধে। ২০২৪-এর জুলাইয়ে ছাত্রদের ওপর অবিচার দেখে বিবেকবান মানুষেরা এর প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছিলেন, তারা জানতেনও না এতে সরকারাপতন হতে পারে বা এই আন্দোলন কোটাসংস্কার আন্দোলনের ছদ্মবেশে সরকারপতন আন্দোলন। তারা জুলাইয়ে ছাত্রদের ওপর সংঘটিত অন্যায়েরও প্রতিবাদ করেছেন, আবার জুলাইয়ের পরে সেই একই ছাত্রদের দ্বারা সংঘটিত লুটপাট ও দেশধ্বংসের প্রতিবাদও করেছেন। সবকিছুর প্রতিবাদই যারা করেছেন, তারা সব পক্ষেরই শত্রু। বন্ধু হতে হলে আমৃত্যু নির্দিষ্ট যেকোনো একটি পক্ষের তাঁবেদারি করতে হয়, তাঁবেদারদের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলতে হয়, তাঁবেদারদের সুরের সঙ্গে সুর না-মিললেই তারা হয়ে যান গণশত্রু। তারা না ঘরকা, না ঘাটকা। তাদের ঠাঁই কোথাও নেই। বাংলাদেশে বিবেকবানরা বেওয়ারিশ।
চূড়ান্ত সত্য হলো— ক) সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিল করে এবং তিনটি ভুয়া নির্বাচন করে আওয়ামি লিগ তাদের অস্বাভাবিক পতন এবং সদলবল পলায়ন অনিবার্য করে তুলেছিল, খ) কেএম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়ে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য সংবিধান সংশোধন করে, ভোটারতালিকায় দেড় বা দুই কোটি ভুয়া ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্ত করে এবং একুশে আগস্টের গ্রেনেডহামলার ঘটনা ঘটিয়ে বা ঘটতে দিয়ে বিএনপি ২০০৪ সালেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বীজ রোপণ করেছিল, গ) আজন্ম পরাজিত দল জামায়াতে ইসলামি জন্ম থেকেই প্রতারণার রাজনীতি করেছে, ২০২৪-এর জুলাইয়েও পুরো দেশের সাথে প্রতারণা করেছে, ভারতীয় আধিপত্যের ধুয়া তুলে দলটি বিএনপির সঙ্গে মিলেমিশে ইউএসএর হাতে দেশ তুলে দেওয়ার কাজে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছে এবং দলটি উপমহাদেশের কোথাও রাজনীতি করার যোগ্যতা বা অধিকার রাখে না; ঘ) মুহাম্মদ ইউনুস বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সুচতুর দেশবিক্রেতা এবং তার ও জামায়াতে ইসলামির পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা শিশুদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি তরুণ প্রতারকদের বৃহত্তম আখড়াবাড়ি; প্রতারক ইউনুস ২০২৪-’২৫ সালে বাংলাদেশের সব শীর্ষপ্রতারককে এক ছাতার নিচে নিয়ে এসেছিলেন, একসঙ্গে এত প্রতারক বাংলাদেশ অতীতে কখনও দেখেনি। উল্লিখিত চার বক্তব্যই সত্য, ধ্রুব সত্য। একজন মানুষ মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন হলে এই চার সত্যের চারটিকেই মেনে নেবেন বা নিতে পারবেন। কিন্তু মস্তিষ্ক নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর কাছে বন্ধক রেখে অন্ধ হয়ে গেলে যেকোনো একটি, দুটো বা সর্বোচ্চ তিনটে সত্যকে মনে হবে সত্য; অন্তত একটিকে মনে হবে যারপরনাই মিথ্যে এবং ইচ্ছে করবে লেখককে জীবনের তরে শিক্ষা দিতে। পুরো সত্যকে মেনে নিতে না-পারার সংকট থেকেই বাংলাদেশে বারবার সাংবিধানিক সংকটের জন্ম হয় আর সাংবিধানিক সংকটই ডেকে আনে জনদারিদ্র্য।
© আখতারুজ্জামান আজাদ