02/09/2018
১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট
খুব ভোরে চাঁদপুর নৌবন্দরে বিকট শব্দে বিস্ফোরন.... ১৫ই আগস্ট গভীর রাতে সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন চাঁদপুর শহরের কাছে এক বাড়িতে আশ্রয়ে ছিলেন একদল মুক্তিযোদ্ধা। ১৩ আগস্ট রাত থেকে গোপন আশ্রয়ে ছিলেন তারা ২০ জন। তাঁরা সবাই নৌ-কমান্ডো। তাঁদের দলনেতা বদিউল আলম। নিঃশব্দে এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন তাঁরা। প্রত্যেকের বুকে বাধা লিমপেট মাইন। কোমরে ড্যাগার। তাঁরা এগিয়ে চলেছেন মেঘনা-ডাকাতিয়া নদীর মোহনা দিকে। তাঁদের টার্গেট ছয়টি জাহাজ, পন্টুন ও বার্জ। সেগুলো মাইন দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া। দলনেতা বদিউল আলম ১৮ জনকে ছয় দলে ভাগ করে প্রতিটি টার্গেটের জন্য তিনজনকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। বাকি দুজন নদীর তীরে থাকবেন। বদিউল আলমের নেতৃত্বে কমান্ডোরা নেমে পড়লেন বন্দরসংলগ্ন নদীতে। বর্ষায় মেঘনার মোহনায় ভয়ংকর এক রূপ। অথৈ পানি, প্রবল ঢেউ আর স্রোত। এর মধ্যে তাঁরা অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে সাঁতরিয়ে চলছেন। শত্রুর জাহাজ থেকে অনুসন্ধানী আলো ঘুরছে চারদিকে। বিপজ্জনক এক অবস্থা। সব দলই সফলতার সঙ্গে নির্দিষ্ট টার্গেটে মাইন লাগিয়ে ফিরে চলল নিরাপদ স্থানে। ৪৫ মিনিটের মধ্যেই বিস্ফোরিত হবে মাইনগুলো। এ সময় হঠাৎ দেখা দিল নতুন বিপদ। যে দিক দিয়ে তাঁরা ফিরে যাবেন, সেখানে নোঙর ফেলেছে রকেট স্টিমার সার্ভিসের জাহাজ ‘গাজী’। পাকিস্তানি সেনা ও গোলাবারুদ নিয়ে খুলনা থেকে এসেছে। সেনারা সব জাহাজে, কেউ নামেনি। ডেকে দেখা যাচ্ছে, কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা অস্ত্র হাতে পাহারায়। জাহাজটি অন্ধকারে প্রেতচ্ছায়ার মতো নদীর পাড় ঘেঁষে ভেসে আছে পানির ওপর। এই জাহাজটি দেখে তাঁরা চমকে উঠলেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। যাওয়ার কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছেন না তাঁরা। অল্পক্ষণের মধ্যেই মাইনের বিস্ফোরণ ঘটবে। রাতও প্রায় শেষ হয়ে আসছে। এ অবস্থায় প্রথম দলটি দ্রুত একটি বার্জের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। এই বার্জে মাইন লাগানো হয়নি। অন্যরাও তাঁদের পেছনে সেখানে লুকিয়ে পড়লেন। প্রথমে বিকট একটি শব্দ। দু-তিন মিনিট পর আরেকটি। তারপর একসঙ্গে দু-তিনটি। এরপর খই ফোটার মতো বিস্ফোরণ শুরু হলো। নৌবন্দর থেকে নদীর মোহনা পর্যন্ত এলাকার জলভাগে যেন মহাপ্রলয় শুরু হয়ে গেল। বিস্ফোরণের গগণবিদারী শব্দে বন্দরসংলগ্ন শহর কয়েকবার কেঁপে উঠল। বন্দর ও জাহাজের ডেকে পাকিস্তানি সেনাদের অস্থির ছোটাছুটির হুলস্থুল কাণ্ড। একটু পর একে একে ডুবতে থাকল মাইন লাগানো জাহাজ-বার্জগুলো। ডুবন্ত জাহাজের ডেক থেকে ভীতসন্ত্রস্ত পাকিস্তানি সেনা ও নাবিকেরা এলোমেলো গুলি চালাতে চালাতে লাফিয়ে পড়ে নদীতে। মুহূর্তে কী ঘটে গেল, এখন কী করা উচিত, ভেবে দেখার সময় নেই কারও। দেখতে দেখতে বেশ কয়েকটি জাহাজ-বার্জ তোলপাড় তুলে ডুবে গেল।
ঘটনাটি অপারেশন জ্যাকপটের একটি অংশ। এরকম রক্ত হিম করা আরো অনেক ইতিহাসে সমবৃদ্ধ আপনার দেশ। এ ইতিহাসকে জানুন, পূর্বপুরুষদের নিয়ে গর্ব বোধ করুন, তাদের বুকের টাটকা রক্ত বৃথা হতে দিয়েন না। মুক্তিযুদ্ধকে জানুন শুধু বি সি এসের জন্য না, বরং আত্মপরিচয়ের জন্য জানুন। নিজে পরিবর্ততন হন, আপনাকে দিয়েই পরিবর্তন আসবে.......