20/10/2026
১৯৮৯ সালে সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশাহ ফাহাদের জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রিন্স ফয়সাল বিন ফাহাদের রিয়াদের প্রাসাদে মালি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন ক্রিয়াংক্রাই তেকামং নামের এক থাই শ্রমিক। প্রাসাদের নিরাপত্তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তিনি ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে প্রায় ৯০ কেজি ওজনের রাজকীয় গহনা ও রত্ন চুরি করেন, যার বাজারমূল্য ছিল তখনকার সময়ে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান ছিল ডিমের আকারের ৫০ ক্যারেটের একটি অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য ‘নীল হীরা’।
সৌদি সরকারের চাপে থাই পুলিশ তেকামংকে গ্রেপ্তার করে এবং চুরি যাওয়া রত্ন উদ্ধার করে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখন, যখন থাইল্যান্ডের উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা উদ্ধারকৃত রত্নগুলোর একটি বড় অংশ নিজেরা আত্মসাৎ করেন এবং আসল গহনার বদলে নকল গহনা মিশিয়ে ১৯৯০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরবে ফেরত পাঠান। সৌদি রাজপরিবার পরীক্ষা করে দেখে, ফেরত পাঠানো গহনার অর্ধেকই নকল এবং সবচেয়ে মূল্যবান সেই ‘ব্লু ডায়মন্ড’টি উধাও! এর কিছুদিন পরই থাই মিডিয়ার ছবিতে দেখা যায়, থাইল্যান্ডের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাদের স্ত্রীরা বিভিন্ন পার্টিতে সৌদি রাজপরিবারের সেই হারানো গহনা পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এতে সৌদি রাজপরিবার চরম অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়।
চুরি যাওয়া আসল রত্ন এবং থাই পুলিশের দুর্নীতির তদন্ত করতে সৌদি সরকার ব্যাংককে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে। কিন্তু এর পরপরই ঘটে ইতিহাসের অন্যতম রহস্যজনক হত্যাকাণ্ড, ৪ জানুয়ারি ১৯৯০ সালে ব্যাংককে সৌদি দূতাবাসের একজন কূটনীতিককে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর ১লা ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ সালে ব্যাংককের রাজপথে প্রকাশ্য দিবালোকে আরও তিনজন সৌদি কূটনীতিককে গুলি করে হত্যা করা হয়।এই হত্যাকাণ্ডগুলোর পেছনে থাইল্যান্ডের দুর্নীতিবাজ পুলিশ সিন্ডিকেট ও মাফিয়াদের হাত ছিল বলে ধারণা করা হয়, যারা হীরা আত্মসাতের প্রমাণ লোপাট করতে চেয়েছিল।
এই চুরি ও হত্যাকাণ্ডের পর সৌদি আরব এবং থাইল্যান্ড উভয় দেশেই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র বর্ণবাদী ও জাতিগত বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে, যা কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। সৌদি মিডিয়া এবং সামাজিক পরিমণ্ডলে পুরো থাই জাতিকে ‘অকৃতজ্ঞ’, ‘চোর’ এবং ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিত্রিত করা শুরু হয়। সৌদি সরকার তাদের নাগরিকদের থাইল্যান্ড ভ্রমণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। অন্যদিকে থাইল্যান্ডের স্থানীয় মিডিয়া এবং জনগণের একটি অংশ সৌদিদের ‘উদ্ধত’, ‘বর্বর’ এবং ‘টাকার গরমে অন্ধ’ জাতি হিসেবে পাল্টা প্রচারণা চালায়। থাই মিডিয়ায় সৌদি প্রাসাদের ভেতরে প্রবাসী শ্রমিকদের সাথে দাসত্বমূলক আচরণ ও নির্যাতনের মুখরোচক গল্প প্রচার করে চুরির ঘটনাটিকে একধরনের ‘প্রশংসনীয় প্রতিশোধ’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়, যা সৌদি রাজপরিবারকে আরও ক্ষিপ্ত করে তোলে। এর ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ৩২ বছর বন্ধ থাকে। এবং আড়াই লাখ থাই শ্রমিকের জায়গায় ভারত, পাকিস্তান থেকে শ্রমিকদের এনে পূরণ করা হয়।
আজ কয়েকদিন ধরে আমাদের নিউজফিড সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদন্ডের ঘটনায় বেশ উত্তপ্ত। এবং বাংলাদেশের মানুষের রাগটা যৌক্তিক। তবে আমাদের একটু ঠাণ্ডা মাথায় বেশ কিছু বিষয় ভাবতে হবে। ২০১২ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অপরাধ প্রবণতা ও ভুয়া কাগজপত্রের অজুহাতে বাংলাদেশিদের ভিসা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন স্থানীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়েছিল, যার পেছনে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের লবিস্টদের বড় ভূমিকা ছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এর ফলে আমিরাতের শ্রমবাজারের সিংহভাগ দখল করে নেয় ভারত ও পাকিস্তান। এ টাইপের ঘটনা কিন্তু নিয়মিতই ঘটে। এবং এক দেশ ইচ্ছা করে আরেক দেশের বাজার দখল করতে এসব করে।
আমাদের মাথায় রাখতে হবে, বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। সামনেই সৌদি যুবরাজের মেগা প্রজেক্ট ‘ভিশন ২০৩০’ এবং ২০৩৪ সালের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ। এই মেগা প্রজেক্টগুলোর জন্য আগামী কয়েক বছরে সৌদি আরবে লাখ লাখ নির্মাণ ও সেবা খাতের শ্রমিকের প্রয়োজন হবে, যা শত বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্সের বাজার।এই বিশাল বাজারের সিংহভাগ নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া ভারতসহ নানা দেশ। কিন্তু সাধারণ শ্রমের বাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকরা তুলনামূলকভাবে কম বেতনে কাজ করতে পারে বলে সৌদি নিয়োগকর্তাদের কাছে তাদের চাহিদা বেশি। তাই প্রতিযোগিতায় জিততে হলে বাংলাদেশি শ্রমিকদের গায়ে ‘নিরাপত্তা ঝুঁকি’ বা ‘সৌদি-বিদ্বেষী’ তকমা লাগিয়ে দেওয়াটা প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য সবচেয়ে সহজ কৌশল। এটাকে কন্সপিরেসি থিওরি বলতে পারেন। তবে একেবারে উড়িয়ে দেওয়াটা ঠিক হবে না। কারণ, খেয়াল করে দেখুন। আমেরিকার বাজারে শুল্কমুক্ত ওষুধ প্রবেশের ঘোষণার মাঝেই আমাদের দুটো ওষুধ ফ্যাক্টরিতে রহস্যজনক আগুন লাগলো। এসব কি কাকতালীয়?
আমাদের সবার উচিত সৌদি ইস্যুতে সাবধান হওয়া। সরকার এরই মাঝে সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকেছে। এবং সত্যি বলতে আমাদের আসলে এর চেয়ে খুব একটা বেশি কিছু করার নেই। ভিক্টিমরা ডেড। তবে যা আমরা করতে পারি, তা হলো সতর্কতা অবলম্বন করতে পারি। কারণ, দেশের আশেপাশে আছে সেই পুরোনো শকুন।
--- Mehedi Hasan