18/08/2026
মা চাকরি করলে সন্তানের উপর কি কি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, এবং এর সমাধান কী?
একজন মা যখন চাকরি করেন, তখন তিনি শুধু নিজের জন্য কাজ করেন না—অনেক সময় পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা, সন্তানের ভবিষ্যৎ, স্বামীর পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের আত্মসম্মানের জন্যও কাজ করেন। তাই “মা চাকরি করেন বলেই সন্তান অবহেলিত হবে”—এমন ধারণা একেবারেই ঠিক নয়।
তবে এটাও সত্যি, মায়ের কর্মজীবনের সঙ্গে যদি সন্তানের প্রয়োজনীয় সময়, ভালোবাসা, শাসন ও মানসিক উপস্থিতির ভারসাম্য না থাকে, তাহলে সন্তানের মধ্যে কিছু নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—সমস্যা চাকরিতে নয়, সমস্যাটা হতে পারে সময় ও মনোযোগের ঘাটতিতে।
একজন মা সারাদিন অফিসে থাকার কারণে সন্তান যদি দিনের পর দিন মায়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ না পায়, নিজের কথা বলার মানুষ না পায়, মায়ের কাছ থেকে স্নেহ ও নিরাপত্তার অনুভূতি না পায়, তাহলে ধীরে ধীরে তার মনে একটা শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
সন্তান হয়তো মাকে খুব ভালোবাসে, কিন্তু মনে মনে ভাবতে শুরু করতে পারে—
“মায়ের কাছে আমার জন্য সময় নেই।”
এই অনুভূতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সন্তান বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে অন্য কারও কাছে মানসিক আশ্রয় খুঁজতে পারে। কখনো বন্ধু, কখনো মোবাইল ফোন, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আবার কখনো এমন মানুষের কাছেও, যার প্রভাব তার জন্য ভালো নাও হতে পারে।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো সন্তানের আচরণগত পরিবর্তন।
ছোট শিশু মায়ের মনোযোগ পাওয়ার জন্য জেদ করতে পারে, অকারণে কান্না করতে পারে, রাগ দেখাতে পারে কিংবা স্কুলে মনোযোগ হারাতে পারে। একটু বড় সন্তান আবার নিজের সমস্যাগুলো মায়ের সঙ্গে শেয়ার না করে নিজের মধ্যেই রেখে দিতে পারে।
আর কিশোর বয়সে এই দূরত্ব আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
কারণ এই বয়সে সন্তান শুধু খাবার, পোশাক কিংবা পড়াশোনার যত্ন চায় না—সে চায় একজন মানুষ, যার কাছে নিজের ভয়, কষ্ট, প্রেম, বন্ধুত্ব, ব্যর্থতা, অপমান কিংবা গোপন কথাগুলো নির্ভয়ে বলতে পারে।
তৃতীয় সমস্যা হতে পারে সন্তানের অতিরিক্ত মোবাইল নির্ভরতা।
মা-বাবা দুজনই ব্যস্ত থাকলে অনেক পরিবারে শিশুকে ব্যস্ত রাখার সবচেয়ে সহজ উপায় হয়ে যায় মোবাইল ফোন। প্রথমে হয়তো কার্টুন দেখানোর জন্য ফোন দেওয়া হয়, পরে গেম, তারপর ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক কিংবা অন্যান্য অনলাইন কনটেন্ট।
একসময় দেখা যায়, সন্তান মায়ের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে মোবাইলের সঙ্গে বেশি সময় কাটাচ্ছে।
তবে এখানে আবারও মনে রাখতে হবে—মা চাকরি করেন বলেই সন্তান মোবাইল আসক্ত হবে, এমন নয়। বাবা-মায়ের সময় ব্যবস্থাপনা, পারিবারিক পরিবেশ এবং সন্তানের প্রতি নজরদারিও এখানে বড় ভূমিকা রাখে।
চতুর্থ সমস্যা হতে পারে সন্তানের পড়াশোনায় নজরদারির ঘাটতি।
চাকরির ব্যস্ততায় অনেক মা সন্তানের পড়াশোনা, স্কুলের খবর, বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক, পরীক্ষার প্রস্তুতি কিংবা শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলো নিয়মিত খেয়াল রাখতে পারেন না।
ফলে সন্তান পড়াশোনায় পিছিয়ে গেলেও অনেক সময় সেটা পরিবারের নজরে আসে দেরিতে।
আর সন্তান যখন বুঝতে পারে—
“আমার পড়াশোনা কেউ দেখছে না”—
তখন তার দায়িত্ববোধও ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে।
পঞ্চম সমস্যা হলো মানসিক দূরত্ব।
মা সারাদিন বাইরে থাকলেন, অফিসের চাপ সামলালেন, বাসায় ফিরে ক্লান্ত হয়ে গেলেন। সন্তান সারাদিন মায়ের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু মা বাসায় ফিরে যদি শুধু বলেন,
“পড়তে বসেছো?”
“খেয়েছো?”
“হোমওয়ার্ক করেছো?”
তারপর আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যান—তাহলে সন্তান মাকে ধীরে ধীরে একজন “নিয়ম-কানুনের মানুষ” হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারে।
অথচ সন্তানের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হতে পারে মাত্র দশ মিনিটের একটি প্রশ্ন—
“আজ তোমার দিনটা কেমন গেল?”
এই প্রশ্নটাই কখনো কখনো শিশুর মনে মায়ের জন্য আজীবন নিরাপত্তা তৈরি করে।
তাহলে কি মায়েদের চাকরি ছেড়ে দেওয়া উচিত?
না।
বরং প্রয়োজন হলো চাকরি ও মাতৃত্বের মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য তৈরি করা।
মা চাকরি করবেন, নিজের স্বপ্ন পূরণ করবেন, পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন—এটা সন্তানের জন্যও গর্বের বিষয় হতে পারে। কিন্তু সেই সঙ্গে সন্তান যেন কখনো মনে না করে, “আমার মায়ের জীবনে আমি সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ।”
এর জন্য কিছু বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত—প্রতিদিন সন্তানের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখুন।
সময়টা অনেক বড় হতে হবে না। প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিটও যদি হয়, সেই সময়টুকু শুধু সন্তানের জন্য রাখুন। ফোন দূরে রাখুন, টেলিভিশন বন্ধ রাখুন এবং তার সঙ্গে কথা বলুন।
দ্বিতীয়ত—সন্তানের কথা শুনুন, শুধু উপদেশ দেবেন না।
সে কোনো ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে বকাঝকা না করে আগে জিজ্ঞেস করুন—
“কেন এমন করেছো?”
কারণ অনেক সময় শিশুর ভুল আচরণের পেছনে থাকে কোনো অভিমান, ভয়, একাকিত্ব কিংবা মনোযোগ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
তৃতীয়ত—সপ্তাহে অন্তত একটি দিন সন্তানের সঙ্গে বিশেষ সময় কাটান।
একসঙ্গে হাঁটতে বের হওয়া, পার্কে যাওয়া, গল্প করা, রান্নায় সাহায্য করা, একসঙ্গে সিনেমা দেখা কিংবা শুধু ছাদে বসে গল্প করাও হতে পারে সেই সময়ের অংশ।
শিশুর মনে দামি খেলনা যতটা স্মৃতি তৈরি করে, তার চেয়ে অনেক বেশি স্মৃতি তৈরি করে—মায়ের সঙ্গে কাটানো সময়।
চতুর্থত—শিশুকে শুধু গৃহকর্মী বা আত্মীয়ের কাছে রেখে দায়িত্ব শেষ মনে করবেন না।
যদি অন্য কেউ সন্তানের দেখাশোনা করেন, তাহলে মা নিয়মিত তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন এবং সন্তানের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে জানবেন।
পঞ্চমত—বাবার ভূমিকা বাড়াতে হবে।
সন্তান শুধু মায়ের দায়িত্ব নয়। বাবা-মা দুজনেরই দায়িত্ব সন্তানকে সময় দেওয়া, তার পড়াশোনা দেখা, তার সঙ্গে কথা বলা এবং তার মানসিক বিকাশের দিকে নজর রাখা।
একজন মা চাকরি করবেন, আর বাবা বলবেন “বাচ্চা সামলানো তোমার দায়িত্ব”—এটা কোনো ভারসাম্যপূর্ণ পরিবার নয়।
ষষ্ঠত—সন্তানের সামনে মায়ের চাকরিকে কখনো বোঝা হিসেবে তুলে ধরবেন না।
বরং তাকে বোঝান—
“তোমার মা কাজ করেন, কারণ তিনি তোমাকে ভালো ভবিষ্যৎ দিতে চান। আর কাজের পাশাপাশি তোমার জন্যও তার সময় আছে।”
এতে সন্তান মায়ের চাকরিকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, মায়ের সংগ্রামের অংশ হিসেবে দেখতে শিখবে।
সবশেষে একটা কথা মনে রাখা দরকার—
একজন মা সারাদিন সন্তানের পাশে থেকেও সন্তানের প্রতি অবহেলাশীল হতে পারেন। আবার একজন কর্মজীবী মা অল্প সময়ের মধ্যেও সন্তানের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হতে পারেন।
তাই সন্তানের জন্য শুধু মায়ের উপস্থিতি নয়, মায়ের মানসিক উপস্থিতিটাও জরুরি।
মা চাকরি করবেন কি করবেন না—এটা মূল প্রশ্ন নয়।
মূল প্রশ্ন হলো—
মা যতক্ষণ সন্তানের সঙ্গে থাকেন, সেই সময়টুকুতে সন্তান কি মায়ের ভালোবাসা, নিরাপত্তা, মনোযোগ এবং গুরুত্ব অনুভব করতে পারে?
কারণ সন্তানের কাছে মায়ের দেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস টাকা নয়, দামি খেলনা নয়, বড় বাড়ি নয়—
মায়ের সময়, মায়ের কথা শোনা, মায়ের স্পর্শ এবং এই নিশ্চয়তা—
“যাই হোক না কেন, আমার মা আমার পাশে আছে।”
এই অনুভূতিটুকু যদি একটি সন্তান পায়, তাহলে কর্মজীবী মায়ের সন্তান হওয়া তার জন্য দুর্বলতা নয়; বরং মায়ের সংগ্রাম দেখে বড় হয়ে ওঠা তার জীবনের অন্যতম শক্তি হয়ে উঠতে পারে।