27/07/2026
সিপিবি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জেলা কমিটির বিবৃতি
অবিলম্বে গ্যাস সংকট নিরসন ও দেশীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালী করার দাবি
__________________________
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তীব্র গ্যাস সংকটে জনজীবন বিপর্যস্ত হওয়ার পরেও সরকার সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জেলা কমিটি। উপরন্তু, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পরপর ক্ষমতাসীন তিনটি সরকারই পরিকল্পিতভাবে দেশের জ্বালানি খাতকে দেশীয় সম্পদনির্ভর নীতি থেকে সরিয়ে আমদানিনির্ভর ও এলএনজি-নির্ভর করে তুলছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করে ধারাবাহিকভাবে ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভর নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। এর ফলে গুটিকয়েক আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মুনাফা নিশ্চিত হলেও দেশের গৃহস্থালী জ্বালানি, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ খাত এবং পরিবহন ব্যবস্থা ক্রমেই তাদের নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্যের ওঠানামার সরাসরি বোঝা এখন সাধারণ জনগণ ও উৎপাদন খাতকে বহন করতে হচ্ছে। এই নীতি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা দুর্বল করার পাশাপাশি অর্থনীতিকে আরও আমদানিনির্ভর ও সংকটাপন্ন করে তুলছে। সিপিবি পেট্রোবাংলাকে শক্তিশালী করে দেশের তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ খাতকে বিদেশি কোম্পানি এবং গুটিকয়েক দেশীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ (মনোপলি) থেকে মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে।
আজ ২৭ জুলাই ২০২৬, সোমবার বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জেলা কমিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম সমীর ও সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর মঈন এক বিবৃতিতে বলেন, গত মঙ্গলবার থেকে সারাদেশে, বিশেষ করে ঢাকায়, তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। ছয় দিন অতিবাহিত হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এই জনদুর্ভোগ ও সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তারা বলেন, গ্যাস সংকটে ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাসাবাড়িতে রান্নাবান্না কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও চুলা নিভু-নিভু জ্বলছে, আবার কোথাও একেবারেই জ্বলছে না। কেউ কেউ বিদ্যুৎচালিত চুলা কিনছেন, আর নিম্ন আয়ের মানুষ মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। সাধারণ মানুষকে বাইরের খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। যেসব রেস্তোরাঁ পাইপলাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তারাও চুলা জ্বালাতে পারছে না। ফলে সংকট প্রতিদিন আরও প্রকট হচ্ছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস নিতে গাড়ির সারি দীর্ঘ হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত গ্যাসের সবচেয়ে বড় অংশ ব্যবহৃত হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। ফলে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট কমে গেছে। এতে বিদ্যুৎ ঘাটতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুতের পর সবচেয়ে বেশি গ্যাস ব্যবহার করে শিল্পকারখানা। গ্যাস সংকটে ইতোমধ্যে কিছু কিছু শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বিবৃতিতে সিপিবি নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, দেশে আমদানিকৃত এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি বেসরকারি কোম্পানি সামিট। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার আগুন লাগার ঘটনায় এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দেশে গ্যাস সংকট আরও বেড়ে যায়। মানুষের উদ্বেগ দূর করতে সরকার এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দুর্ঘটনা ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জনসম্মুখে কোনো বিবৃতি দিচ্ছে না। সরকারের এই নীরবতা ও তথ্য গোপনের প্রবণতা জনমনে আরও অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। এ থেকেই মানুষের দুর্ভোগের বিষয়ে সরকারের উদাসীনতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিবৃতিতে বলা হয়, জ্বালানি সংকট নিরসন এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা)-কে শক্তিশালী করতে হবে। বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। বাপেক্স, এসজিএফএল ও পেট্রোবাংলার অনুসন্ধান ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত এবং দেশীয় জনবল ও প্রযুক্তির বিকাশ ছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বহুমাত্রিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে দেশীয় অর্থায়নে গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো কার্যকর উপায় নেই।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ দ্রুত কক্সবাজারের মহেশখালীতে ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান টার্মিনালটি মেরামত এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে বহুজাতিক কোম্পানিটির প্রভাবমুক্ত, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানান।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে গ্যাস সংকট নিরসন, দেশীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানসমূহকে শক্তিশালীকরণ এবং জনগণের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে আগামীকাল ২৮ জুলাই ২০২৬, মঙ্গলবার, সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পুরানা পল্টন মোড় থেকে মশাল মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তাঁরা গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত ঢাকাবাসী ও সর্বস্তরের ভুক্তভোগী মানুষকে এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
বার্তা প্রেরক-
রিফাত হাবিব
সদস্য, জেলা কমিটি সিপিবি
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ