24/07/2026
রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ ও ভারতের আঞ্চলিক তাস: রাষ্ট্রপতি ‘ছুপ্পু’ ও সেনাপ্রধান ওয়াকার সমীকরণ
- লে কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান (অব)
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (ছুপ্পু)-র অপসারণ বা পরিবর্তন নিয়ে সম্প্রতি যে রাজনৈতিক আলাপ শুরু হয়েছে, তার পেছনের ঘটনাপ্রবাহ কেবল "লন্ডনে গিয়ে সাক্ষাৎ" বা কোনো সস্তা কাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একবিংশ শতাব্দীর তথ্যপ্রযুক্তির যুগে শেখ হাসিনার সাথে যোগাযোগের জন্য কাউকে সশরীরে লন্ডনে উড়াল দিতে হয় না—এই সাধারণ সত্যটুকু বুঝতে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
ছুপ্পু কার প্রতি অনুগত, তা বোঝার জন্য তার অতীত ইতিহাসই যথেষ্ট।
প্রকৃত বাস্তবতা হলো, ছুপ্পুর নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক অস্তিত্ব বা শক্তি নেই। তার দুর্নীতি, বিদেশে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিদেশি পাসপোর্ট কিংবা মুজিব বাহিনীর সাবেক কর্মী হিসেবে তার অতীত কার্যাবলীর নথিপত্র শুধু বাংলাদেশ সরকারের কাছেই নয়, তার চেয়েও বড় বড় ফাইল সংরক্ষিত আছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে। ফলে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব কোনো ব্ল্যাকমেইল করার বা স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা নেই; তিনি একটি নিয়ন্ত্রিত চরিত্র মাত্র।
তবে মূল প্রশ্ন হলো, যদি পরিস্থিতি তাই হয়, তবে বিএনপি সরকার তাকে সরাতে এত তৎপর হলো কেন এবং এতদিন কেনই বা বিলম্ব হলো?
আসল লক্ষ্য ছুপ্পু নয়, আসল লক্ষ্য জেনারেল ওয়াকার!
সহজ কথায়, রাষ্ট্রপতি ছুপ্পু কেবল একটি বাহ্যিক রূপক; আসল রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সমীকরণ নিহিত আছে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের হাতে। বিএনপি দীর্ঘদিন যাবৎ একটি অদৃশ্য ভীতি বা "জেনারেল ওয়াকারের জুজু"তে আক্রান্ত ছিল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন ৯ম পদাতিক ডিভিশনের জিওসিকে পরিবর্তনের সুস্পষ্ট আদেশ দিয়েছিলেন, তার পর প্রায় দুই মাস ধরে সেই নির্দেশ কার্যকর না হওয়া প্রমাণ করে যে, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি বা ক্ষমতার মনস্তাত্ত্বিক বাধা কাজ করছিল। জেনারেল ওয়াকারের প্রকাশ্যে ভারতপ্রীতি, আওয়ামী কানেকশন এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের যথেষ্ট তথ্য থাকা সত্ত্বেও সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিতে দ্বিধান্বিত ছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি বদলেছে। সরকারের প্রধান দুটি গোয়েন্দা সংস্থার ওপর থেকে জেনারেল ওয়াকারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতে শুরু করায় বাস্তব তথ্য-প্রমাণগুলো এখন প্রধানমন্ত্রীর টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে। স্পষ্ট হয়েছে যে, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া এসব উপাদান আসলে দেশের ভেতরে অবস্থানরত "বিষাক্ত সাপ", যা যেকোনো মুহূর্তে ছোবল দিতে পারে।
বর্তমানে দিল্লির রাজনীতি টালমাটাল এবং শেখ হাসিনা বলয় দুর্বল অবস্থায় থাকায় বিএনপি সরকার সঠিক সময়ে সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি বাস্তব সুযোগ পেয়েছে। প্রথমে ছুপ্পু, এবং এরপর কৌশলগতভাবে জেনারেল ওয়াকার ও চিহ্নিত ভারতপন্থী কর্মকর্তাদের অপসারণ বা অবসরে পাঠাতে পারলেই কেবল বর্তমান সরকারের স্থায়িত্ব ও দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হবে।
অনলাইন মিডিয়া, প্রোপাগান্ডা ও এএসইউ (ASU)-র পেশাদারিত্বের অবক্ষয়
ক্ষমতার এই পরিবর্তন রোধ করতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের ব্যবহার করে জনমত গঠন বা ডাইভার্সন তৈরির চেষ্টা করছে।
নাজমুস সাকিব কিংবা জুলকারনাইন সায়েরদের মতো বিতর্কিত কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের পেছনে মূলত কাজ করছে এএসইউ (আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট)-র কমান্ডেন্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সামাসের মতো একটি গোষ্ঠী, আর সামাস পরিচালিত হচ্ছেন সরাসরি জেনারেল ওয়াকারের মাধ্যমে।
এরা এখন ছুপ্পু ও ওয়াকার জুটিকে রক্ষার জন্য বয়ান (narrative) তৈরি করছে। অঙ্ক খুবই সোজা—ছুপ্পুর পতন হলে জেনারেল ওয়াকারের সামরিক ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, চরিত্র হনন ও ভুয়া চিঠি ছড়িয়ে দেওয়ার এই কৌশল নতুন নয়। যখনই জেনারেল ওয়াকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া গেছে, তখনই কোনো বিএ (BA) নম্বর ছাড়া ভুয়া স্ক্যান্ডাল কিংবা তথাকথিত "তদন্ত প্রতিবেদন আসছে" জাতীয় পোস্ট দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির অপচেষ্টা করেছিল এই গোয়েন্দা সংস্থার পেইড এজেন্ট নাজমুস সাকিব আর জুলকারনাইন সায়ের।
এএসইউ (ASU)-র মতো একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশাদার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আজ রাজনৈতিক খেলায় ব্যবহৃত হচ্ছে—যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই সংস্থায় তিনবার চাকরি করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, পূর্বেও রাজনৈতিক চাপ এসেছে, কিন্তু সত্যের অপলাপ না করার মতো মেরুদণ্ড ও সাহসিকতা (guts) তখনকার কর্মকর্তাদের ছিল। ঢাকা শাখার অধিনায়ক থাকাকালীন রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত তিনটি সরাসরি আদেশ অমান্য করার নজির আমার নিজেরই আছে। কিন্তু বর্তমান নেতৃত্বের নীতিহীনতার কারণে সংস্থাটির সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
ভারতের 'জেন-জি' আন্দোলন ও সম্ভাব্য সীমান্ত উত্তেজনা
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এখন এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের পর গণ-আকাঙ্ক্ষার এই ঢেউ এখন ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কঠোর হিন্দুত্ববাদী সামাজিক-রাজনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে ভারতের ‘জেন-জি’, পাঞ্জাবের কৃষকসমাজ এবং বিনোদন জগতের তারকারা তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলেছেন।
ঐতিহাসিক কৌশল অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি ফেরাতে মোদি সরকার এখন দুটি পথ বেছে নিতে পারে:
১. সীমান্তে কৃত্রিম উত্তেজনা: প্রতিবেশীদের সাথে সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি করে জাতীয়তাবাদী/হিন্দুত্ববাদী উন্মাদনা সৃষ্টি করে তাদের মাধ্যমে মাঠ দখল করে চলমান আন্দোলনকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা করা।
২. বাংলাদেশে সংখ্যালঘু কার্ড: বাংলাদেশে তাদের অনুগত দালালদের মাধ্যমে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়ে "সংখ্যালঘু নির্যাতন"-এর ভুয়া বয়ান বিশ্বমঞ্চে দাঁড় করানো।
সামনের পথ ও আমাদের করণীয়
জেনারেল ওয়াকারের মতো প্রভাবশালীদের অপসারণ করা সম্ভব হলে বাংলাদেশে ভারতের এই পরিকল্পিত অস্থিরতা তৈরির ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে।
অতএব, বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারের করণীয় তিনটি:
১. সীমান্তে সর্বোচ্চ নজরদারি: ভারতের সম্ভাব্য সামরিক বা গোয়েন্দা উস্কানি ব্যর্থ করতে সীমান্তজুড়ে নজরদারি জোরদার করা।
২. অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা: কোনো পক্ষই যেন সংখ্যালঘু ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন চালাতে না পারে, সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখা।
৩. বিভাগীয় শুদ্ধি অভিযান: রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ও সেনাপ্রধান ওয়াকারের অপসারণ নিশ্চিত করার পর, সেনাবাহিনী ও সিভিল প্রশাসনের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভারতপন্থী ও সার্বভৌমত্ববিরোধী উপাদানগুলোকে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চিহ্নিত করে অপসারণ করা।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই রাজনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করাই এখন সময়ের দাবি।
সরকারের জন্য শুভকামনা। See less