07/06/2026
নতুন গল্প (নাম ঠিক করা হয়নি)
পর্ব ১: নীল খামের দিনলিপি
তখন ঢাকা শহরের আকাশটা অন্যরকম ছিল। পিচঢালা রাস্তায় নীল ধোঁয়া উড়িয়ে ‘বেবি ট্যাক্সি’ চলত, বাতাসে সিসার গন্ধ থাকত সত্যি, কিন্তু মানুষের সম্পর্কে কোনো ভেজাল ছিল না। ডিজিটাল স্ক্রিনের নীল আলো তখনো আমাদের চোখের ঘুম কেড়ে নেয়নি; বরং আমরা অভ্যস্ত ছিলাম ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় চিঠির নীল খাম পড়তে।
আমি অনিন্দ্য। সামায়নের বিশ্ববিদ্যালয়ের বড়ো ভাই তবে বন্ধুর চেয়েও বেশি এবং ওর জীবনের একমাত্র জবানবন্দী। সামায়নের গল্পটা আমি যেভাবে দেখেছি, যেভাবে ওর ডায়েরির পাতা থেকে চিনেছি, সেটাই আজ আপনাদের বলব।
১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি। যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়তে আসা সামায়নকে দেখলে মনে হতো, এক ঝটকায় আসা বাতাসেই বুঝি ও উড়ে যাবে। লিকলিকে গড়ন, চাপা ভাঙা চোয়াল, কিন্তু চোখ দুটো ছিল অসম্ভব তীক্ষ্ণ আর মায়াবী। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ও সবার ছোট, চার-চারটে বোনের বিয়ের খরচ আর সংসারের জোয়াল টানতে টানতে ওর বাবার পিঠ ঠেকেছে দেয়ালে। সামায়ন নিজে টিউশনি করে চলত, আর মাস শেষে নিজের খাবার খরচ বাঁচিয়ে একটা বড় অংশ বাড়ি পাঠাত।
সংসারের চরম অনটন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসের ফাঁকে সামায়নের দিনগুলো যখন কেবলই টিকে থাকার এক ক্লান্তিকর লড়াই, ঠিক তখনই তার এই ধূসর ক্যানভাসে টিউশনির সূত্রে জড়িয়ে গেল ‘মায়া’ নামটা। ঢাকা শহরের বেইলি রোডের নামকরা একটি কলেজের প্রথম বর্ষের বিজ্ঞানের ছাত্রী সে। মায়ার বাবা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা; বেইলি রোডের অভিজাত সরকারি কোয়ার্টারে তাঁদের বসবাস, যা সামায়নের মতো গাঁয়ের ছেলের চোখে রাজকীয় প্রাসাদের চেয়ে কম কিছু নয়। মায়াদের আদি পুরুষদের শিকড় সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের হাওরাঞ্চলের পলিমাটিতে প্রোথিত হলেও, বর্তমানে তাঁদের ডালপালা ছড়িয়ে আছে সুদূর পশ্চিমে। বাবার দিকের আত্মীয়-স্বজনেরা প্রায় সবাই স্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্য প্রবাসী, আর মায়ের দিক থেকে মামা-মামাতো ভাইবোনেরা থিতু হয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। কেবল মায়ার বাবার সম্মানজনক উচ্চপদস্থ চাকুরিটার খাতিরেই তাঁরা এখনো দেশের মাটিতে পা দিয়ে আছেন, তবে চাকুরির মেয়াদ ফুরোলেই চিরতরে দেশ ছেড়ে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানোর সব বন্দোবস্ত একদম পাকা।
পড়াশোনার এই অসম বৃত্তে সামায়নের অবস্থান ছিল ঠিক মায়ার বিপরীত মেরুতে। প্রথম প্রথম বেইলি রোডের সেই আলো-ঝলমলে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আড়ষ্ট হয়ে মায়াকে পড়াত সামায়ন; মনের ভেতর সারাক্ষণ কাজ করত এক অদ্ভুত সংকোচ। কিন্তু সেই জড়তা কাটাতে সময় লাগেনি, কারণ মায়া ছিল স্বভাবগতভাবেই এক চঞ্চল আর ছটফটে মেয়ে, যার পুরোটা জুড়ে সারাক্ষণ খেলা করত এক আকাশ হাসিখুশি। গম্ভীর ও মিতভাষী সামায়নের সামনে মায়া যখন বইয়ের পাতা উল্টে অনর্গল কথা বলে যেত, তখন মনে হতো যেন শান্ত, থমথমে এক দিঘির বুকে হঠাৎ এক টুকরো চঞ্চল রোদ্দুর এসে পড়েছে। দিঘিটা শান্তই রয়ে যেত, কিন্তু সেই রোদ্দুরের আলোয় তার ভেতরের জল টলমল করে উঠত এক গোপন আকুলতায়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: সামায়ন আর মায়ার এই অবরুদ্ধ অথচ পবিত্র প্রেমের গল্পটি আপনাদের কেমন লাগছে, কমেন্টে অবশ্যই জানাবেন। আপনাদের প্রতিটি মন্তব্য আমার পরবর্তী পর্ব লেখার অনুপ্রেরণা।
পাঠকদের উদ্দেশ্যে একটি বিশেষ অনুরোধ:
গল্পটির মূল খসড়া তৈরি হলেও, এখন পর্যন্ত এর কোনো যথোপযুক্ত নাম ঠিক করা হয়নি। সামায়ন আর মায়ার এই গভীর, বিরহগাথা ও পবিত্র ভালোবাসার সাথে মিল রেখে আপনাদের মনে কোনো সুন্দর নাম ঘুরপাক খেলে তা কমেন্ট বক্সে সাজেস্ট করুন। আপনাদের দেওয়া সেরা নামটিই হতে পারে এই গল্পের চূড়ান্ত শিরোনাম!
(আগামী পর্ব দেখতে পেজে লাইক ও ফলো দিয়ে সাথেই থাকুন।)
©কথক অনিন্দ্য
#পর্ব_১