23/05/2025
শ্রমিক গণ-অভ্যুত্থানের ১৯বছর।
২০ মে ২০২৫ গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের আব্দুল্লাহ আল মেহেদি সোহাগের ১৯তম মৃত্যু বার্ষিকী আজ। সোহাগ ছিলেন গাজিপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত এস কিউ গ্রুপের এফ এস সুয়েটার শ্রমিক এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের একজন সক্রিয় সাহসী নেতা। এফ এস সুয়েটারের শ্রমিকরা দির্ঘদিন যাবৎ পিসরেট বৃদ্ধি ও কারখানার ভিতরে শ্রমিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছিল। ১১ মে ২০০৬ তারিখে এফ এস সোয়েটার কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের উৎপাদিত পন্যের পিসরেট মজুরি ২০ টাকা কমিয়ে দেয়। হঠাৎ করে৫৮ টাকা রেটের মাল ২০ টাকা কমিয়ে ৩৮ টাকায় নির্ধারন করায় শ্রমিরা বঞ্চিত - ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হন।
সমস্যা সমাধানের জন্য শ্রমিকরা মালিক কর্তৃপক্ষেরর সাথে আলোচনায় বসে। সেখানে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ভাড়াটিয়া মাস্তানরা শ্রমিকদের উপড় হামলা করে কয়েকজনকে আহত করে। ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা মজুরি কমানো ও শ্রমিকদের উপড় হামলার প্রতিবাদে স্বতস্ফুর্ত ধর্মঘট শুরু করে। ১৩ মে এক বৈঠকে মালিকপক্ষ শ্রমিকদের কিছু দাবী মৌখিক ভাবে মেনে নেয়। শ্রমিকরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে কাজে যোগ দেয়। মৌখিক ভাবে শ্রমিকদের দাবী মেনে নেয়া ছিল ধুরন্দর মালিকদের একটি অপকৌশল মাত্র। একদিকে দাবী মেনে নেয় অপরদিকে কারখানার ব্যাবস্থাপক বাদি হয়ে ৮০ জন শ্রমিকের নামে গোপনে শ্রীপুর থানায় মামলা দায়ের করে। ১৮ মে প্রকাশ্যে কারখানার শ্রমিক নেতা আমিনুল ও মুজিবুরকে কারখানা থেকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। পরের দিন শুক্রবার বিকালে গাজিপুর চৌরাস্তায় গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের ডাকে বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়। ২০ মে শনিবার সকালে শ্রমিকরা কারখানায় এসে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও সহ কর্মিদের মুক্তির দাবীতে ধর্মঘট শুরু করে। মালিক পক্ষ শ্রমিকদের কারখানা থেকে তারিয়ে দিতে পানি ও বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয় এবং পুলিশ ডেকে আনে। শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে কারখানা ছেড়ে বেলা ১২ টার দিকে বাহিরে ঢাকা ময়মনসিংহ মহা সড়কে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের শ্রীপুর থানার সভাপতি শফি্উল আলম আজাদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে। সোহাগ ছিলেন এই আন্দোলনের সামনের সারির নেতা ও গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের শ্রীপুর থানার সক্রিয় সংগঠক। পুলিশ শ্রমিকদের সেই মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দিতে উদ্ধত হলে শুরু হয় সংঘর্ষ। শ্রমিকরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। পুলিশ শত রাউন্ড টিয়ার সেল ও গুলি ছোড়ে শ্রমিকদের মিছিলে।গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান শ্রমিকদের পরম বন্ধু ও সাহসী সংগঠক সহযোদ্ধা আব্দুল্লা আল মেহেদী সোহাগ। আহত হন শতাধিক শ্রমিক।
প্রশাসনের সহযোগীতায় মালিক পক্ষ সোহাগের লাশ গুম করার অপতৎপরতা চালায়। কিন্ত শ্রমিক আন্দোলন আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। শ্রমিক আন্দোলনের চাপের মুখে ২১ মে বিকালে গাজিপুরের ডেপুটি কমিশনারের উপস্থিতে কারখানার ভিতরে সুতার বস্তায় চাপা দেয়া অবস্থায় সোহাগের লাশ খুজে পাওয়া যায়। ফাঁস হয়ে যায় খুনি মালিক ও প্রশাসনের লাশ গুমের ষড়যন্ত্র। পুলিশ ও কারখানা কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে সোহাগের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠাতে। আন্দোলন আরো নতুন মাত্রা পায়। সোহাগ হত্যার প্রতিবাদে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। ২০মে রাতে জরুরি মিটিং ডেকে সোহাগ হত্যার প্রতিবাদে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের আহবানে ও নেতৃত্বে ২৩ মে গাজিপুরসহ সারা দেশে ধর্মঘট ঘোষনা করা হয়। ধর্মঘট সফল করার লক্ষ্যে ২২ মে গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় মাইকিং, মিছিল এবং রাতে মশাল মিছিল করে শ্রমিকরা।২৩ মে ভোর থেকেই রাজপথ দখলে নেয় শ্রমিকরা। ২৩ মে আমরা গার্মেন্ট শ্রমিকরা এক সফল ধর্মঘট পালন করি। অবশ্য একদিনের ধর্মঘট লাগাতার তিনদিন পর্যন্ত চলে। সরকার ও মালিকরা বেসামাল হয়ে আন্দোলনের মাঠ থেকে গ্রেফতার করে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি কমরেড মোশরেফা মিশুসহ প্রায় শতাধিক নেতা কর্মিকে। আন্দোলন আরো বেগবান হয়। সরকার ও গার্মেন্ট মালিকরা আন্দোলনের মুখে সোহাগের জীবনের বিনিময়ে বাধ্য হয় ত্রিপক্ষিয় চুক্তি করতে। সেই চুক্তি নিয়ে তালবাহনা করতে থাকলে আবারো চুক্তি বাস্তবায়নের দাবীতে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের ডাকে ১০ ই অক্টোবর সফল ধর্মঘট পালন হয়। এবং এই আন্দোলনের ফলে দির্ঘ ১২ বছর পর ২০০৬ সালে গঠিত হয় ওয়েজ বোর্ড। আমরা আজো যে বেতন পাই তা অমানবিক, চলমান মনুষ্যচিত বেতনের দাবীতে আমাদের যে আন্দোলন, তার প্রেরনা শহীদ আব্দুল্লা আল মেহেদি সোহাগ। সোহাগসহ অনেক বন্ধুর রক্ত ভেজা পথ ধরেই আমরা সাফল্যের পথে লড়াই চালিয়ে যাব। সোহাগ- লাল সালাম কমেরড।