27/06/2026
তিস্তার তীর রক্ষা প্রকল্পে ২১০ কোটি টাকার হরিলুট, বালুর বদলে ভরা হচ্ছে কাদামাটি!
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বৃহত্তর রংপুরের পাঁচ জেলায় তিস্তা নদীর তীর রক্ষায় নেওয়া মেগা প্রকল্পে চলছে নজিরবিহীন অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের মহোৎসব। দরপত্রের শর্ত ও বৈজ্ঞানিক নিয়ম নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জিও ব্যাগে বালুর পরিবর্তে নদীর কাদামাটি ভরাট করা হচ্ছে। নামমাত্র কাজ দেখিয়ে প্রকল্প থেকে প্রায় ২১০ কোটি টাকা লুটে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। চলতি জুন মাসেই বরাদ্দের মেয়াদ শেষ হতে চলায় তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ দেখিয়ে ঠিকাদাররা অধিকাংশ অর্থ তুলে নিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
সরেজমিনে তিস্তা ব্রিজ সংলগ্ন বালাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, তীর রক্ষার কাজে চলছে চরম ফাঁকি। দরপত্র অনুযায়ী, ৬ বস্তা বালুর সঙ্গে ১ বস্তা সিমেন্ট মেশানোর নিয়ম থাকলেও ঠিকাদার লাভলু মিয়া ১২ বস্তা বালুর সঙ্গে মাত্র দেড় বস্তা সিমেন্ট মেশাচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমাকে এভাবেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।"
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের মূল ঠিকাদার অতি লাভের আশায় কাজের দায়িত্ব অন্য ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। সেই সাব-ঠিকাদার আবার তা আরেকজনের কাছে হস্তান্তর করেছেন। এমন হাতবদলের কারণে কাজের মান একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। এমনকি বস্তা গণনা না করেই নদীর তীরে ডাম্পিং করা হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে দায়িত্বরত রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যসহায়ক খোকন দাস কাজের কোনো সঠিক বিবরণ দিতে পারেননি। তবে তিনি দাবি করেন, প্রতিদিন বালু আনা হয়। যদিও বাস্তবে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বালু আনা হয় খুব কম, বেশি তো কাদামাটি। ঊর্ধ্বতনেরা বলেছে কাদামাটি দিয়েই ব্যাগ ভরতে।"
তিস্তার ভাঙন ও বন্যার সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকা স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে এখন চরম ক্ষোভ। বালাপাড়ার বাসিন্দা আক্কাশ মিয়া (৫৫) বলেন, "আমরা নিজ চোখে দেখছি কাদামাটি ভর্তি করছে। তিস্তার স্রোতে এগুলো যখন-তখন ভেসে যাবে। এই টাকা লুটের বিচার কে করবে?"
একই আশঙ্কার কথা জানান গৃহিণী রওশনারা বেগম (৪০)। তিনি বলেন, "বর্ষায় আমাদের ঘরবাড়ি ভেসে যায়। সরকারি টাকায় যদি এত বড় লুটপাট হয়, তাহলে আমাদের বাঁচাবে কে?" চরপাড়ার যুবক জাকির হোসেনের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা মাঠে নেমে কাজ দেখেন না, তারা শুধু ঊর্ধ্বতনদের খুশি করতে স্মার্টফোনে ছবি তুলে চলে যান।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জিও ব্যাগে কাদামাটি ব্যবহারের কথা স্বীকার করলেও কাজের নিম্নমানের অভিযোগটি কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। তিনি বলেন, "কিছু কাজ শেষ হয়েছে, সেখানে হয়তো পরিষ্কার চলছে। তবে ফাইনাল টেস্ট রিকোয়ারমেন্ট ফুলফিল না হওয়া পর্যন্ত ঠিকাদার চূড়ান্ত বিল পাবে না।"
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সদর দফতর থেকে জানানো হয়েছে, তারা অভিযোগ পেয়েছেন এবং দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা যাচাই করতে কিছুটা সময় লাগবে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান রিপন বলেন, "জিও ব্যাগে কাদামাটি ব্যবহারের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বালু-সিমেন্টের সঠিক অনুপাত না থাকলে তীর স্থায়িত্ব পাবে না। তিস্তার প্রবল স্রোতে মাত্র এক বর্ষা মৌসুমেই প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ বিলীন হয়ে যেতে পারে।"
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ই-লার্নিং সেন্টারের উপ-পরিচালক মাসুদার রহমান সতর্ক করে বলেন, এই নিম্নমানের কাজের কারণে আগামী বছরগুলোতে ওই অঞ্চলে বড় ধরনের দুর্যোগ দেখা দিতে পারে, যা লক্ষাধিক মানুষের জানমালের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া এই প্রকল্পের তীব্র সমালোচনা করেছেন বর্তমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। সম্প্রতি রংপুর সফরে এসে তিনি বলেন, "নতুন করে তিস্তার বুকে বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প গ্রহণের সময় আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে এই ধরনের আর কোনো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নেওয়া হবে না।"
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের দাবি, খণ্ড খণ্ড ও বিচ্ছিন্ন প্রকল্প দিয়ে তিস্তার ভাঙন রোধ সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। একই সাথে বর্তমান প্রকল্পে হওয়া এই বিশাল দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।