04/09/2026
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য এবং স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, জননেতা ্দুর_রহিম এর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি
--------------------
এম. আব্দুর রহিম ১৯২৭ সালে ২১ নভেম্বর দিনাজপুর সদর উপজেলার শংকরপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামের এক সমভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
অবস্থাপন্ন কৃষক পরিবারের ধর্মীয় অনুশাসন ও ধর্মের প্রতি বাবা ইসমাইল সরকারের আগ্রহের কারণেই মাদ্রাসা শিক্ষায় শুরু হয় তাঁর প্রথম পাঠ। ১৯৪২ সালে জুনিয়র পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়ে রাজশাহী সরকারি মাদ্রাসা হতে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। এরপর ১৯৫০ সালে ১ম বর্ষে ভর্তি হন রাজশাহী কলেজে। সেখান থেকে থেকে ভর্তি হন রংপুর কারমাইকেল কলেজে। কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর ১৯৫৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে বিএ পাশ করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন।
১৯৫৬ সালের ১৭ জুন চিরিরবন্দর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের মরহুম শাহ্ আব্দুল হালিম এর কন্যা নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন এম আব্দুর রহিম।
১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রী অর্জন করার পর ১৯৬০ সালে আইনজীবী হিসেবে দিনাজপুর বারে আইন পেশা শুরু করেন।
ছাত্র অবস্থায় এম আব্দুর রহিম পাকিস্তান বিরোধী স্বাধিকার আন্দোলন যুক্ত হন। রাজশাহী কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের সকল কর্মসূচীতে সক্রিয়তার স্বাক্ষর রাখেন। কলেজের শহীদ মিনার নির্মাণে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুসলিম লীগ সরকারের হক, ভাসানী, সোহরাওর্দীর যুক্তফ্রন্টের একজন কর্মী হিসেবে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনী প্রচারাভিযানে অংশ নেন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ঐতিহাসিক আগরতলা মামলার লিগ্যাল এইড কমিটির একজন সদস্য ছিলেন এম আব্দুর রহিম। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের (দিনাজপুর সদর ও চিরিরবন্দর থানার আংশিক) সদস্য নির্বাচিত হয়ে ১৯৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বৃহত্তর দিনাজপুর অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। ১৩ এপ্রিল ৭১ পর্যন্ত দিনাজপুর হানাদার মুক্ত ছিলো। পাক হানাদার বাহিনী দিনাজপুর আক্রমন করলে এম আব্দুর রহিমকে আহ্বায়ক করে দিনাজপুরে “মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম পরিষদ” গঠন করা হয়। মানবিক মূল্যবোধ আর দেশাত্ব বোধের চেতনায় উজ্জ্বীবিত হয়ে তিনি ভারতের পশ্চিম বঙ্গের পতিরাম, রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ, বালুরঘাট, গঙ্গারামপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শ্বরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
৭১ এ ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারন গঠন হলে গোটা দেশকে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য ১১টি বেসামরিক জোনে ভাগ করেন। মুজিব নগর সরকার এম আব্দুর রহিমকে পশ্চিম জোন-১ এর জোনাল চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন। শ্বরনার্থী শিবিরের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, ইয়ুথ ক্যাম্প পরিচালনা মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটমেন্ট এবং প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সংগ্রহ এবং ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব ছিল তার উপরে। উল্লেখ্য তাঁর প্রশাসনিক জোনের অধীন ১১২ টি রিলিফ ক্যাম্প, ১২টি যুব অভ্যর্থনা শিবির ৬টি মুক্তি যোদ্ধা ক্যাম্পসহ ১টি মুক্তিযোদ্ধা বাছাই ক্যাম্প ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি ১৭ই ডিসেম্বর সদ্য স্বাধীনপ্রাপ্ত দেশে পশ্চিম জোন-১ এর চেয়ারম্যান হিসেবে বগুড়া জেলার প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৮ ডিসেম্বর সকাল ১১টায় দিনাজপুর গোর এ শহীদ বড় ময়দানে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় মিত্রবাহিনীর এই অঞ্চলের অধিকনায়ক ব্রিগেডিয়ার ফরিদ ভাট্টি ও কর্ণেল শমসের সিং এর নেতৃত্বে একটি চৌকস দল তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। স্বাধীনতার পর তিনি যুদ্ধবিদ্ধস্ত বৃহত্তর দিনাজপুর (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়) অঞ্চল পুণর্গঠনের আত্মনিয়োগ করেন এবং ত্রান ও পুনর্বাসন কমিটির চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এবং বর্তমান ভারতের রাষ্ট্রপতি তৎকালীন কংগ্রেস নেতা বাবু প্রনব মুখার্জীর সাথে বৈঠক করেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এম আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহিতার অভিযোগ এনে তৎকালীন পাকিস্তানী সেনাশাসক তথাকথিত সামরিক ট্রাইবুন্যালে একতরফা বিচার করে দীর্ঘ মেয়াদি কারাদন্ড সাজা প্রদান করেন। বিজ্ঞ আইনজীবি ও জনদরদী রাজনীতিক এম আব্দুর রহিম সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা পালন করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন, তখন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি হিসাবে দল গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। পঁচাত্তর পরবর্তী সামরিক শাসকদের কোন প্রলোভনই তাঁকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ৭৫ পরবর্তিতে বেগম জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ গঠন করা হলে তিনি আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং পরবর্তীতে দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় কার্য নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৯৮৪ এবং ১৯৮৬ সালে সামরিক শাসন বিরোধী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামরিক শাসক গোষ্ঠী তাঁকে গ্রেফতার করে দীর্ঘদিন কারাগারে আটক রাখে। এমনি আদর্শবান, সৎ, নিরহষ্কার, নৈতিক মূল্যবোধ সম্পূন্ন রাজনীতিবীদ বর্তমান তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুস্মরণীয়।
এম আব্দুর রহিম ১৯৯১ সালে দিনাজপুর সদর আসন থেকে পুনরায় জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি দীর্ঘদিন দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দিনাজপুর জেলা আইনজীবি সমিতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৫ সালে চাঞ্চল্যকর কিশোরী ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলনের বলিষ্ঠতা সেসময় তাঁকে দিনাজপুর তথা দেশের গণমানুষের কাছে আলোকিত করে।
একজন সৎ ও আদর্শবান রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক পত পরিক্রমায় তিনি নেতৃত্বের আসনে থেকে দিনাজপুরের মানুষকে যুগিয়েছেন সাহস-অনুপ্রেরণা-উদ্দীপনা। জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য তাঁকে অনেকবার কারাবরণ করতে হয়েছে। রাজনীতিকে মানুষের সেবা-কল্যাণ আর মঙ্গলের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে তিনি সমাজ সেবায় ছিলেন একনিষ্ঠ। দিনাজপুর ডায়াবেটিক হাসপাতাল, চক্ষু হাসপাতাল, রেডক্রিসেন্ট হাসপাতাল সহ নানা সেবামুলক প্রতিষ্ঠান এবং স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ ও হিন্দু উপসনালয়সহ দিনাজপুরের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ডের তিনি কান্ডারী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি রেডক্রস/রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি ও হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমীর বোর্ড অব গভর্নস এর সদস্য এবং বার কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও ডায়াবেটিক সমিতির আজীবন সদস্য ছিলেন। তিনি জাতীয় অন্ধ কল্যান সমিতি, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি ও জাতীয় যক্ষা নিরোধ সমিতি প্রভৃতির জেলা ও কেন্দ্রীয়ভাবে কমিটির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি সর্বশেষ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর লেখা ধর্মের মুখোশ ও ৫ম সংশোধনীর মজেজা দুটি গ্রন্থ ব্যাপক সাড়া জাগায়।
তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি হিসেবে দিল্লীতে সর্বভারতীয় কংগ্রেস সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯৭৪ সালে মস্কোয় অনুষ্ঠিত বিশ্বশান্তি সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের উপনেতা হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। ১৯৭৮ সালে কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত বিশ্ব রেডক্রস সোসাইটি কর্তৃক আয়োজিত মানবাধিকার বিষয়ে এক সম্মেলনে যোগদান করেন। তিনি ১৯৯৬ সালে পবিত্র হজব্রত পালন করেন।
এম আব্দুর রহিম মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন অকুতোভয় সৈনিক। তাঁর সততা নীতি, আদর্শ দেশাত্ববোধ, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা, রাজনৈতিক শিক্ষা, সামাজিক সাংষ্কৃতির সর্বক্ষেত্রে তাঁর অনন্য অবদানের কথা দেশবাসী শ্রদ্ধার সাথে মনে রাখবে।