14/08/2026
শাহাদাতে সিররি বা গোপন শাহাদত পাক ।
২৮ শে সফর হযরত ইমাম হাসান ইবনে আলী (আঃ) এঁর শাহাদাত পাক। বড় ইমাম পাক হযরত ইমাম হাসান (আঃ) অভিশপ্ত মুয়াবিয়াকে কখনও স্বীকৃতি দেননি।
লেখক ও গবেষকঃ মুফতি মওলানা মুহাম্মাদ রুকুন উদ্দীন ক্বাদরী ।
সূরা আল বাকারা, আয়াত: ১৫৪
উচ্চারণঃ ওয়ালা-তাকূলূ লিমাইঁ ইউকতালুফী ছাবীলিল্লা-হি আমওয়া-তুন বাল আহইয়াউওঁ ওয়ালা-কিল্লা-তাশ‘উরূন।
অর্থঃ আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদের মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বুঝ না।
তৃতীয় হিজরির ১৫ ই রমজান ইসলামের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ও অফুরন্ত আনন্দের দিন। কারণ, এই দিনে জন্ম নিয়েছিলেন বেহেশতি যুবকদের অন্যতম সর্দার এবং হুজুর পুর নূর দোজাহানের বাদশাহ তাজেদারে কায়েনাত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য ও অন্যতম প্রিয় শাহজাদা পাক হযরত ইমাম হাসান মুজতাবা (আঃ)। তিনি ছিলেন আমিরুল মু’মিনিন ওলীয়ে খোদা ওসীয়ে মুস্তাফা আসাদুল্লাহ-হিল গালিব আলী ইবনে আবু তালিব কাররামুল্লাহ ওজহু ও স্যাইয়েদায়ে কায়েনাত খাতুনে আতহার ফাতিমা বিনতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর প্রথম আওলাদে আতহার, আওলাদে রাসূল (সাঃ) এবং সে যুগের সব মু’মিন মুসলমানের দৃষ্টিতে সবচেয়ে প্রিয় শাহজাদা পাক।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মহান আল্লাহ পাকের নির্দেশে প্রিয় প্রথম দৌহিত্রের নাম পাক রাখেন হযরত ইমাম হাসান আল-মুজতবা (আঃ)। হাসান শব্দের অর্থ সবচেয়ে ভাল বা উত্তম, পছন্দনীয় ইত্যাদি। বড় ইমাম পাক হাসান (আঃ) এঁর সাত বছর বয়স পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হায়াতে তৈয়্যাবাতে ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বহুবার প্রিয় এই শাহজাদা পাক কে কাঁধে নিয়ে বলেছেন, “হে প্রভু, আমি ইমাম হাসান (আঃ) কে ভালবাসি, আপনিও তাঁকে ভালবাসুন।“ তিনি আরও বলতেন, “যাহারা হযরত ইমাম হাসান ও হুসাইন (আঃ) কে ভালবাসবে তারা আমাকেই ভালবাসল। আর যাহারা এ দুজনের সঙ্গে শত্রুতা করবে তারা আমাকেই তাদের শত্রু হিসেবে গণ্য করল।” মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আঃ)-কে “বেহেশতের যুবকদের নেতা” ও “মুসলিম উম্মাহর দুই সুবাসিত ফুল” বলে উল্লেখ করেছেন এবং তিনি আরও বলেছেন, “আমার এই দুই শাহজাদা পাক উভয়ই মুসলমানদের ইমাম বা নেতা।” রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এই দুই শাহজাদা পাকের সাথে (শৈশবে) সঙ্গে খেলতেন, তাদের বুকে চেপে ধরতেন, চুমু খেতেন এবং তাদের ঘ্রাণ নিতেন। তাহারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এঁর নামাজের সময় নানাজান মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এঁর গলায় বসে পড়লে নানাজান সিজদা থেকে উঠতেন না যতক্ষণ না দুই ইমাম কিবলা ও ক্বাবা নিজ মর্জি পাকে উঠে যেতেন। محمد ركن الدين قادري
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হযরত ইমাম হাসান ও হুসাইন (আঃ) কে তাঁদের শৈশবেই অনেক চুক্তিপত্রের সাক্ষী হিসেবে মনোনীত করেছেন। যখন মহান আল্লাহর নির্দেশে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) নাজরানের খ্রিস্টানদের সঙ্গে মুবাহিলা করার। محمد ركن الدين قادري
‘মুবাহিলা’ বলতে মিথ্যাবাদী কে তা প্রমাণের লক্ষ্যে মিথ্যাবাদীর ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষণের জন্য দোয়া বা প্রার্থনা করাকে বোঝায়। পবিত্র কুরআনের সুরা আলে ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
সূরা আল ইমরান (آل عمران), আয়াত: ৬১
فَمَنْ حَآجَّكَ فِيهِ مِنۢ بَعْدِ مَا جَآءَكَ مِنَ ٱلْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا۟ نَدْعُ أَبْنَآءَنَا وَأَبْنَآءَكُمْ وَنِسَآءَنَا وَنِسَآءَكُمْ وَأَنفُسَنَا وَأَنفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَل لَّعْنَتَ ٱللَّهِ عَلَى ٱلْكَٰذِبِينَ
উচ্চারণঃ ফামান হাজ্জাকা ফীহি মিম বা‘দি মা-জাআকা মিনাল ‘ইলমি ফাকুল তা‘আ-লাও নাদ‘উ আবনাআনা-ওয়া আব নাআকুম ওয়া নিছাআনা-ওয়া নিছাআকুম ওয়া আনফুছা-নাওয়া আনফুছাকুম ছু ম্মা নাবতাহিল ফানাজ‘আল লা‘নাতাল্লা-হি আলাল কা-যিবীন।
অর্থঃ অতঃপর আপনার নিকট সত্য সংবাদ এসে যাওয়ার পর যদি এই কাহিনী সম্পর্কে আপনার সাথে কেউ বিবাদ করে, তাহলে বলুন-এসো, আমরা ডেকে নেই আমাদের পুত্রদের এবং তোমরা তোমাদের পুত্রদের এবং আমরা আমাদের স্ত্রীদের ও তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের কে এবং আমরা আমাদের আত্নাদেরকে ও তোমরা তোমাদের আত্নাদেরকে আর তারপর চলুল আমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করি এবং তাদের প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত করি যারা মিথ্যাবাদী। محمد ركن الدين قادري
এই ঘটনাটি ঘটেছিল খ্রিস্টানদের সঙ্গে তিন দিন ধরে বিতর্ক চলার পর। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মুখে মানুষের সঙ্গে সাদৃশ্যহীন আল্লাহর পরিচয় সম্পর্কে অকাট্য যুক্তি (হযরত আদম-(আঃ) এঁর উদাহরণসহ) শোনার পরও নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধিরা ঈসা (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বা পুত্র-আল্লাহ বলার মত অদ্ভুত বিশ্বাসের ওপর অবিচল ছিল এবং রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে সত্য নবী হিসেবে মানতে অস্বীকার করছিল। (খ্রিস্টান পাদ্রিরা এ বিতর্কের সময় বলছিল যে হযরত ঈসা নবী-(আঃ) যেহেতু পিতা ছাড়াই জন্ম নিয়েছেন তাই তিনি আসলে আল্লাহর পুত্র। জবাবে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছিলেন, আদম-(আঃ) তো পিতা ও মাতা ছাড়াই জন্ম নিয়েছিলেন তাহলে তো আল্লাহর পুত্র হওয়ার সম্ভাবনা-নাউজুবিল্লাহ- তারই বেশি হওয়ার কথা ছিল!)
এ অবস্থায় রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মুবাহিলার চ্যালেঞ্জ জানান। অর্থাত যারা মিথ্যাবাদী তাদের ধ্বংসের জন্য উভয় পক্ষ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাবে। খ্রিস্টান পাদ্রিরা বেশ সাহস দেখিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মেনে নেয়। محمد ركن الدين قادري
এ অবস্থায় নাজেল হয় পবিত্র কুরআনের সূরা আল ইমরান (آل عمران), আয়াত: ৬১
فَمَنْ حَآجَّكَ فِيهِ مِنۢ بَعْدِ مَا جَآءَكَ مِنَ ٱلْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا۟ نَدْعُ أَبْنَآءَنَا وَأَبْنَآءَكُمْ وَنِسَآءَنَا وَنِسَآءَكُمْ وَأَنفُسَنَا وَأَنفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَل لَّعْنَتَ ٱللَّهِ عَلَى ٱلْكَٰذِبِينَ
যেখানে মহান আল্লাহ পাক উভয় পক্ষকে তাদের নারী, পুত্র এবং শিশু সন্তানসহ শহরের বাইরে একটি ময়দানে একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দেন।
পরের দিন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) শান্তচিত্তে ও অবিচল আস্থা নিয়ে নির্ধারিত স্থানে আসেন। সঙ্গে ছিলেন স্যাইয়েদায়ে কায়েনাত খাতুনে আতহার ফাতিমা বিনতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ফাতেহে বাবে বিলায়াত সারওয়ারে বাব ইমামাত ইমামুল আওলিয়ায়ে বর-গুজিদায়ে কিবরিয়া ওলীয়ে খোদা ওসীয়ে মুস্তাফা আসাদুল্লাহ-হিল গালিব আলী ইবনে আবু তালিব কাররামুল্লাহ ওজহু এবং শাহজাদা বড় ইমাম পাক হযরত ইমাম হাসান আল-মুজতবা ও শাহেন-শাহে কারবালা পাকের দুলহা{ওফাদাইনাহু বি-যিবহিন আজীম}মাজলুম ইমাম শহীদে কারবালা হযরত ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (আঃ)।(তাঁদের সবার ওপর মহান আল্লাহর অশেষ দরুদ ও রহমত বর্ষিত হোক)। محمد ركن الدين قادري
পাক পাঞ্জাতন পাকের নুরানি চেহারা মুবারক ও অভিব্যক্তি দেখেই খ্রিস্টানরা স্তম্ভিত হয়ে পড়ে যায়। ইসলাম যে সত্য ধর্ম তা তারা বুঝতে পারে। তাই তারা মিথ্যাবাদীর ওপর খোদায়ী অভিশাপ বর্ষণের আহ্বান জানানোর চ্যালেঞ্জ প্রত্যাহার করে নেয়। محمد ركن الدين قادري
তথা যারা সত্য ধর্মের বিরোধিতায় লিপ্ত তারা আল্লাহর অভিশাপে ধ্বংস হয়ে যাবে। বিতর্ককারী খ্রিস্টানদের সঙ্গে যৌথভাবে এমন ঘোষণা দেয়ার} সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তখন আল্লাহর নির্দেশেই সঙ্গে নিয়েছিলেন হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ) সহ হযরত মওলা-এ-কায়েনাত পাক ইমাম আলী (আঃ) ও সাইয়্যেদায়ে-কায়েনাত পাক হযরত মা ফাতিমা (সালামুল্লাহি আলাইহা) কে। আর সে সময়ই মওলা আলী (আঃ) সহ আহলে বাঈত পাক নবী-পরিবারের এই সদস্যরা যে পবিত্র সে বিষয়ে কুরআনের আয়াত নাজেল হয়েছিল।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর ওফাতের পর থেকে হযরত ইমাম হাসান (আঃ) ছিলেন তাঁর পিতার অনুসারী এবং পিতার মতই অত্যাচারীদের সমালোচনা করতেন ও মজলুমদের সমর্থন দিতেন। তিনি জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফিন যুদ্ধে পিতার পক্ষে অংশ নিয়েছিলেন এবং অসাধারণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। জঙ্গে জামাল যুদ্ধের আগুন নেভানোর জন্য তিনি পিতার নির্দেশে হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির (রাঃ) কে সঙ্গে নিয়ে কুফায় গিয়ে সেখানকার জনগণকে পিতার পক্ষে সংঘবদ্ধ করে তাদেরকে বসরায় নিয়ে এসেছিলেন। محمد ركن الدين قادري
আমিরুল মু'মিনিন মওলা-এ-কায়েনাত পাক হযরত মওলা আলী (আঃ) নিজের ইন্তিকালের সময় হযরত ইমাম হাসান (আঃ) কে তাঁর খেলাফতের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেন। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ই তা করার জন্য হযরত ইমাম আলী (আঃ)-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন নিজের জীবদ্দশায়। محمد ركن الدين قادري
বড় ইমাম পাক হযরত হাসান (আঃ) যখন ওজু করতেন তখন আল্লাহর ভয়ে তাঁর চেহারা বিবর্ণ হয়ে যেত এবং তিনি কাঁপতে থাকতেন। মৃত্যু ও পুনরুত্থানের কথা যখন স্মরণ করতেন তখন তিনি কাঁদতেন ও বেহাল হয়ে পড়তেন। তিনি পায়ে হেটে এবং কখনও নগ্ন পায়ে ২৫ বার মদিনা শরীফ থেকে মক্কা শরীফে গিয়ে পবিত্র হজ্ব ও ওমরাহ পালন করেছেন। বড় ইমাম পাক হযরত ইমাম হাসান (আঃ) জীবনে অন্ততঃ দুবার তাঁর ব্যক্তিগত সব সম্পদ দান করে দিয়েছেন এবং বেশ কয়েকবার অর্ধেক বা তারও বেশি সম্পদ দান করে দিয়েছিলেন। নিষ্পাপ ইমাম হওয়া সত্ত্বেও তিনি আল্লাহর দরবারে নিজেকে পাপী বলে অভিহিত করে আল্লাহর ক্ষমা ও দয়া ভিক্ষা করতেন। কোনো প্রার্থীকে বিমুখ করতেন না বড় ইমাম পাক হযরত ইমাম হাসান (আঃ)। তিনি বলতেন, “আমি নিজেই যখন আল্লাহর দরবারে ভিখারি (ও তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করি) তখন কোনো প্রার্থীকে বিমুখ করতে আমার লজ্জা হয়।” محمد ركن الدين قادري
মানুষের সমস্যা সমাধানে তিন এত উদগ্রীব ও ব্যস্ত থাকতেন যেন এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজের কথা তাঁর জানা ছিল না। তিনি নিজেই এ ব্যাপারে বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (দঃ) এঁর একটি বাণী তুলে ধরে বলতেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন যে তার মুমিন ভাইয়ের কোনো একটি সমস্যা সমাধান করবে সে যেন নয় হাজার বছর ধরে আল্লাহর এমন গভীর ইবাদত করল যেন ওই নয় হাজার বছরের দিনগুলোতে সে রোজা রেখেছে ও রাতে ইবাদত করেছে।
বড় ইমাম পাক হযরত ইমাম হাসান মুজতাবা (আঃ) এঁর ক্ষমাশীলতা, পরোপোকারিতা, ধৈর্য ও সহনশীলতা শত্রুদেরও মুগ্ধ করত।
হযরত ইমাম হাসান (আঃ) খলিফা হওয়ার পর অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়া তা মেনে নেয়নি। মওলা-এ-কায়েনাত আলী (আঃ) এঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও ষড়যন্ত্রের যে ধারা অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়া সূচিত করেছিল এই নতুন ইমাম পাকের বিরুদ্ধেও সেই একই ধারা অব্যাহত রাখে। হযরত ইমাম হাসান (আঃ) অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়ার কাছে এক দীর্ঘ চিঠি লিখেন তাকে সুপথে আনার চেষ্টা করেছিলেন। সেই চিঠির একাংশে তিনি লিখেছিলেন, “তুমিও অন্যদের মতই আমার হাতে বাইয়্যাত গ্রহণ কর। তুমি নিজেই ভাল করে জান যে আমি তোমার চেয়ে বেশি যোগ্যতার অধিকারী। আল্লাহকে ভয় কর এবং অত্যাচারী জালিমদের মধ্যে গণ্য হয়ো না।” محمد ركن الدين قادري
অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়া যদি এখনও ভুল করে (অর্থাত বিদ্রোহ অব্যাহত রাখে) তাহলে হযরত ইমাম হাসান (আঃ) মুসলমানদেরকে নিয়ে তাকে শাস্তি দেবেন বলেও সতর্ক করে দিয়েছিলেন ওই চিঠিতে। তিনি তাকে এও লিখেছিলেন যে, “আল্লাহকে ভয় কর, জুলুম ও মুসলমানদের রক্তপাত বন্ধ কর। অনুগত ও শান্তিকামী হও। আর এমন লোকদের সঙ্গে কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধ করো না যারা তোমার চেয়ে এ কাজে বেশি যোগ্য।”
কিন্তু অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়া চিঠির উত্তরে নিজেকে বেশি অভিজ্ঞ বলে দাবি করে। অবশ্য সে প্রলোভন দেখানোর জন্য বলে যে, বড় ইমাম হাসান (আঃ) তাকে খলিফা হিসেবে মেনে নিলে পরবর্তী খলিফা ইমামকেই করা হবে। محمد ركن الدين قادري
অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়া এখানেই ক্ষান্ত হয়নি। সে বড় ইমাম পাক (আঃ) কে গোপনে হত্যার জন্য কিছু লোককে নিয়োজিত করে। খলিফা হিসেবে হযরত ইমাম হাসান (আঃ)-কে মেনে না নেয়ার কারণ হিসেবে বড় ইমাম পাক (আঃ) বয়সের স্বল্পতার অজুহাত দেখানো সত্ত্বেও অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়া নিজের তরুণ সন্তান মদ্যপায়ী ইয়াজিদকে {ইয়াজিদ আল-খুমুর} পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করে। এছাড়াও অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়া বড় ইমাম পাক (আঃ) কে বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য লোকজন একত্রিত করে তাদেরকে ইরাকে পাঠায়। محمد ركن الدين قادري
এ অবস্থায় বড় ইমাম পাক হযরত ইমাম হাসান (আঃ) যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন এবং ইমামের কয়েকজন অনুসারী যুদ্ধের জন্য জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে জনগণের এক বিশাল অংশকে যুদ্ধের জন্য সংঘবদ্ধ করেন। কিন্তু এদের মধ্যে একদল ছিল খারেজি। এরা অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়ার বিরোধী হলেও বড় ইমাম পাক (আঃ) এঁর অনুগত ছিল না। আর একদল এসেছিল কেবল গণিমতের লোভে। আর একদল ছিল গোত্রবাদের কারণে গোত্রীয় সর্দারদের নির্দেশে যুদ্ধ করতে আসা ব্যক্তি। এদের কোনো ধর্মীয় উদ্দেশ্য ছিল না। আর অতি অল্প কয়েক জন ছিল বড় ইমাম পাক (আঃ) এঁর খাঁটি সমর্থক ও ভক্ত ছিলেন । محمد ركن الدين قادري
শাহজাদা পাক হযরত ইমাম হাসান-মুজতবা (আঃ) তাঁর বাহিনীর একাংশকে পাঠান আনবার শহরে হাকামের সেনাপতিত্বে। হাকাম অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়ার সঙ্গে আঁতাত করে বসে। পরবর্তী সেনাপতির অবস্থাও হয়েছিল একই রকম। বড় ইমাম পাক (আঃ) নিজে মাদায়েনের সাবাত্ব এলাকায় গিয়ে সেখান থেকে বারো হাজার সেনাকে ওবায়দুল্লাহ বিন আব্বাসের সেনাপতিত্বে অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়ার সঙ্গে লড়াই করার জন্য পাঠান। আর কেইস বিন সা'দ বিন ইবাদাহকে উপ-সেনাপতি করেন যেন ওবায়দুল্লাহর অনুপস্থিতিতে তিনি সেনাপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন। محمد ركن الدين قادري
এদিকে অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়ার কেইসকে ধোঁকা দেয়ার ফন্দি করে। সে তার সঙ্গে সহযোগিতা অথবা অন্ততঃ বড় ইমাম পাক (আঃ) এঁর পক্ষ ত্যাগ করার জন্য কেইসের কাছে এক মিলিয়ন দেরহাম পাঠায়। কেইস জবাবে বলে: “প্রতারণার মাধ্যমে তুমি আমার ধর্মকে কেড়ে নিতে পারবে না।” কিন্তু প্রধান সেনাপতি ওবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস কেবল সেই অর্থেই প্রতারিত হয় এবং রাতের অন্ধকারে তার একদল একনিষ্ঠ অনুসারী নিয়ে অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়ার দিকে পালিয়ে যায়। কেইস এই ঘটনা বড় ইমাম পাক হযরত ইমাম হাসান (আঃ)-কে জানান এবং বীর বিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকেন। এ অবস্থায় অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়ার বড় ইমাম পাকের সেনাবাহিনীতে গুপ্তচর পাঠিয়ে অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়ার সঙ্গে কেইসের সন্ধি হওয়ার বানোয়াট সংবাদ প্রচার করতে থাকে। আর অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়ার আরেক দল গোয়েন্দা কেইসের সেনাবাহিনীতে ঢুকে এ কথা প্রচার করতে থাকে যে বড় ইমাম পাক হাসান (আঃ) নিজেই মুয়াবিয়ার সঙ্গে সন্ধি করেছেন। এভাবে খারেজি ও সন্ধি-বিরোধীরা প্রতারিত হয়। তারা বিদ্রোহ করে ও হঠাত বড় ইমাম পাক হযরত হাসান (আঃ) এঁর তাবুতে হামলা চালায় ও লুট-তরাজ করে। এমনকি বড় ইমাম পাক হযরত হাসান (আঃ) এঁর বিছানা মুবারক পর্যন্ত লুট-তরাজ করে এবং বড় ইমাম পাক হযরত হাসান (আঃ) এঁর জিসমে আতহারে তলোয়ার দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত হানে। ফলে তিনি শোচনীয়ভাবে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। বড় ইমাম পাক হযরত হাসান (আঃ) এঁর সঙ্গীরা তাঁকে মাদায়েনের গভর্নরের বাড়ীতে নিয়ে যান। সেখানে কিছুদিন তাঁর চিকিৎসা চলে। محمد ركن الدين قادري
এ সময় বড় ইমাম পাক হযরত হাসান (আঃ) জানতে পারেন যে অনেক গোত্র-প্রধান বা সর্দার তাঁকে অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়ার কাছে তুলে দিতে প্রস্তাব কাছে গোপনে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়ার হুবহু তাদের চিঠিগুলো বড় ইমাম পাক (আঃ) এঁর কাছে পাঠিয়ে সন্ধির অনুরোধ করে এবং বলে যে এই সন্ধিপত্রে বড় ইমাম পাক (আঃ) যেই শর্তই দেন না কেন, তা-ই মেনে নেয়া হবে। محمد ركن الدين قادري
এ অবস্থায় বড় ইমাম পাক (আঃ) যখন একদিকে অসুস্থ ও তাঁর অনুসারীরা নানা দিকে বিক্ষিপ্ত ও ছিন্ন-ভিন্ন এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে পথ ও মতের মিল ছিল না তখন যুদ্ধ অব্যাহত রাখা আর ইসলামের স্বার্থের অনুকূল রইল না। কারণ, মুয়াবিয়া যুদ্ধে জয়ী হলে ইসলামের মূলোতপাটন করে ছাড়ত। তাই বড় ইমাম পাক (আঃ) বেশ কিছু কঠিন শর্ত দিয়ে সন্ধি-চুক্তি তথা যুদ্ধ-বিরতি করতে সম্মত হলেন। محمد ركن الدين قادري
উল্লেখ্য, বিদ্রোহী মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে উৎসাহিত করার জন্য হযরত ইমাম হাসান মুজতাবা (আঃ) এঁর খেলাফতের দায়িত্ব নেয়ার পর পরই যোদ্ধাদের বেতন শতকরা ১০০ ভাগ বৃদ্ধি করেছিলেন। তাই এ ধারণা ঠিক নয় যে ইমাম হাসান (আঃ) সাহসী ও জিহাদপন্থী ছিলেন না। মিথ্যা প্রচারে অভ্যস্ত বনু উমাইয়ারাই বড় ইমাম পাক (আঃ) কে ভীরু ও বিলাসী হিসেবে ইতিহাসে তুলে ধরতে চেয়েছে। তিনি যদি জিহাদকে ভয় পেতেন তাহলে বাবার সঙ্গে জামাল ও সিফফিন যুদ্ধে অংশ নিতেন না। محمد ركن الدين قادري
এ ছাড়াও বড় ইমাম পাক (আঃ) জানতেন যে মুসলমানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে এই সুযোগে বাইজান্টাইন সম্রাট ‘চতুর্থ কনস্তানতিন’ মুসলমানদের প্রথম কিবলা অধ্যুষিত বায়তুল মোকাদ্দাস শহরটি দখলের পদক্ষেপ নেবে। তাই বড় ইমাম পাক (আঃ) শান্তি ও কূটনৈতিক পন্থার মাধ্যমে প্রিয় নানাজান রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর ধর্মের বার্তা তথা খাঁটি মুহাম্মদী ইসলামকে রক্ষার জন্য ও ইসলামকে দূষণমুক্ত করার যে কাজ পিতা হযরত মওলা-এ-কায়েনাত পাক আলী (আঃ) শুরু করেছিলেন সেই মিশনকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে অভিশপ্ত মুয়াবিয়ার সঙ্গে সন্ধি করার সিদ্ধান্ত নেন। মূলত সমর্থকদের নিষ্ক্রিয়তা ও আদর্শিক বিচ্যুতির কারণেই বড় ইমাম হাসান (আঃ)-কে যুদ্ধ-বিরতির পথ বেছে নিতে হয়েছিল। محمد ركن الدين قادري
বড় ইমাম পাক হযরত হাসান (আঃ) এও জানতেন যে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা বা শাসন-ক্ষমতা হাতে না পেলেও মুসলমানদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত ইমামই থেকে যাবেন। তাই অভিশপ্ত মুয়াবিয়ার স্বরূপ বা আসল চেহারা জনগণের কাছে তুলে ধরার জন্য তাকে কিছু (নোংরা কাজের সুযোগ) অবকাশ দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। অন্যদিকে এ সন্ধির ফলে মুসলমানদের রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল। محمد ركن الدين قادري
অবশ্য বড় ইমাম পাক হাসান (আঃ) তিনি তাঁর ছোট ভাই হযরত ইমাম-এ-মাজলুম হুসাইন (আঃ) এঁর মতই জালেম শাসকের বিরুদ্ধে জিহাদের পথই ধরতেন যদি তিনি দেখতেন যে, অল্প কিছু সংখ্যক হলেও তাঁর কিছু একনিষ্ঠ ও নিবেদিত-প্রাণ সমর্থক রয়েছেন যারা ইসলামের জন্য যুদ্ধ করতে ও শহীদ হতে প্রস্তুত। ইতিহাসে দেখা যায় শেষ পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন (বা কিছু কম/বেশি) শাহাদত-পাগল ও আহলে-বাইত প্রেমিক মুসলমান বড় ইমাম পাক হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ) এঁর সঙ্গে স্বেচ্ছায় থেকে গেছেন এবং মহাবীরের মত লড়াই করে শহীদ হয়েছেন। ছোট ইমাম পাক হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ) কুফার প্রায় সব মানুষের সমর্থন পেয়েছিলেন প্রথম দিকে। তারা পরবর্তীতে এই ইমাম-এ পাক (আঃ) এঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। অন্যদিকে বড় ইমাম পাক হযরত ইমাম হাসান (আঃ) এঁর সঙ্গীরা প্রথম দিকেই তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং এমনকি গোপনে শত্রু -শিবিরে যোগ দেয়। তাই হযরত ইমাম হাসান (আঃ) এঁর নিবেদিত-প্রাণ সমর্থকের সংখ্যা ছিল হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ) এঁর নিবেদিত-প্রাণ সঙ্গীদের সংখ্যার চেয়েও অনেক কম বা হাতে গোনা যে কয়জন সঙ্গী ছিল তাদের ওপর ভরসা করতে পারেননি বড় ভাই ইমাম হাসান (আঃ) । কারণ, আদর্শিক দৃঢ়তা তাদের মধ্যে ছিল না।
উল্লেখ্য, অভিশপ্ত মুয়াবিয়ার বাবা আবু সুফিয়ান ছিল ইসলামের ও রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর কঠোরতম শত্রু দুশমন। মক্কা বিজয়ের পর (অষ্টম হিজরিতে) অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুয়াবিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর পবিত্র আহলে বাইত (আঃ) এঁর সঙ্গে তার শত্রুতা অব্যাহত থাকে। হযরত মওলা-এ-কায়েনাত মুশকিল কুশা আলী (আঃ) এঁর বিরুদ্ধে এক মিথ্যা অজুহাতে সে সিরিয়া থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। সিফফিনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এই বিদ্রোহের কারণে। এই যুদ্ধে মুয়াবিয়ার পক্ষে ৪৫ হাজার নিহত এবং হযরত মওলা মুশকিল কুশা আলী (আঃ) এঁর পক্ষে শহীদ হন পঁচিশ হাজার মুজাহিদ। محمد ركن الدين قادري
হযরত মওলা মুশকিল কুশা আলী (আঃ) এঁর বিরুদ্ধে সিরিয়ায় বিদ্রোহ শুরু করার পেছনে অভিশপ্ত মুয়াবিয়ার অজুহাত ছিল তৃতীয় খলিফার হত্যাকাণ্ডের বিচার। এটা যে নিছক অজুহাতই ধোঁকা ছিল তার প্রমাণ হল হযরত মওলা মুশকিল কুশা আলী (আঃ) এঁর শাহাদতের পর মুসলিম বিশ্বের সব অঞ্চল ছলে বলে কৌশলে করায়ত্ত করা সত্ত্বেও অভিশপ্ত মুয়াবিয়া আর কখনও তৃতীয় খলিফার হত্যাকারীদের বিচারের কথা মুখেও উচ্চারণ করেনি। দ্বিতীয় খলিফার শাসনামল থেকেই সিরিয়ায় প্রায় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রধানের মত চালচলনে অভ্যস্ত অভিশপ্ত মুয়াবিয়া জানত যে হযরত মওলা মুশকিল কুশা আলী (আঃ) এঁর মত কঠোর ন্যায়-বিচারক শাসক তাকে কখনও ছোট বা বড় কোন পদ দেবেন না। তাই হযরত মওলা মুশকিল কুশা আলী (আঃ) খলিফা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার মত অভিশপ্ত মুয়াবিয়াকেও পদচ্যুত করলে ইসলামের ইতিহাসে রাজতন্ত্র প্রবর্তনকারী অভিশপ্ত মুয়াবিয়া সিরিয়ায় বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে। محمد ركن الدين قادري
অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়ার সঙ্গে বড় ইমাম পাক হযরত ইমাম হাসান আল-মুজতবা (আঃ) এঁর সন্ধির কিছু শর্ত:
১। আজ থেকে মাবিয়া কুরআন-সুন্নাহ মুতাবিক চলবে।
২। আহলে বাঈত পাক (আঃ) এঁদের অনুসারীদের রক্ত সম্মানিত ও হেফাজত থাকবে এবং তাদের অধিকার পদদলিত করা যাবে না।
৩। অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়াকে হযরত মওলা মুশকিল কুশা আলী (আঃ) এঁর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার, গালি-গালাজ, অপবাদ ও প্রচারণা বন্ধ করতে হবে।
৪। জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবারগুলোকে এক মিলিয়ন দেরহাম অর্থ দিতে হবে ইরানি প্রদেশগুলোর সরকারি আয় থেকে।
৫। বড় ইমাম হযরত হাসান (আঃ) অভিশপ্ত মুয়াবিয়াকে আমিরুল মু’মিনিন বলে উল্লেখ করবেন না।
৬। অভিশপ্ত মুয়াবিয়াকে অনৈসলামীক আচার-আচরণ পরিহার করতে হবে এবং আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাত অনুযায়ী আমল করতে হবে।
৭। অভিশপ্ত মুয়াবিয়া কোনো ব্যক্তিকেই (খেলাফতের জন্য) নিজের উত্তরসূরি মনোনীত করতে পারবে না।
৮। অভিশপ্ত মুয়াবিয়া মারা গেলে খেলাফত ফেরত দিতে হবে বড় ইমাম হযরত ইমাম হাসান ইবনে আলী (আঃ) এঁর নিকটে।
৯। বড় ইমাম পাক হযরত ইমাম হাসান ইবনে আলী (আঃ) যদি পর্দ্দা বা ইন্তিকাল করেন , তাহলে মুসলিম জাহানের খেলাফত হস্তান্তর করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর ছোট দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (আঃ) এঁর কাছে।
কিন্তু মুনাফিক অভিশপ্ত মুয়াবিয়া প্রকাশ্যেই নির্লজ্জভাবে সন্ধির শর্তগুলো লঙ্ঘন করেছিল। অভিশপ্ত মুয়াবিয়া ৫০ হিজরিতে গোপনে বিষ প্রয়োগ করে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর বড় দৌহিত্র হযরত ইমাম ইমাম হাসান ইবনে আলী (আঃ)-কে শহীদ করে। ৬০ হিজরিতে মৃত্যুর কিছু দিন আগে অভিশপ্ত মুয়াবিয়া তার মদ্যপায়ী ও লম্পট ছেলে ইয়াজিদকে মুসলমানদের খলিফা বলে ঘোষণা করে। محمد ركن الدين قادري
অভিশপ্ত মুয়াবিয়া বলত যেখানে টাকা দিয়ে কাজ হয় সেখানে আমি টাকা বা ঘুষ ব্যবহার করি, যেখানে চাবুক দিয়ে কাজ হয় সেখানে আমি তরবারি ব্যবহার করি না, আর যেখানে তরবারি দরকার হয় সেখানে তরবারি ব্যবহার করি। অভিশপ্ত মুয়াবিয়া রাজ-কোষাগারকে ব্যবহার করত প্রভাবশালী লোকদের পক্ষে আনার কাজে। محمد ركن الدين قادري
অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর বড় দৌহিত্র ইমাম হাসান (আঃ) এঁর সঙ্গে স্বাক্ষরিত সন্ধি-চুক্তির অপব্যবহার করেছিল। সে কুফায় প্রবেশ করে বক্তৃতার আসনে এটা বলে যে “ হাসান আমাকে যোগ্য মনে করেছে, নিজেকে নয়। এ জন্য সে খেলাফত আমার কাছে ছেড়ে দিয়েছে।”রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর বড় দৌহিত্র হযরত ইমাম ইমাম হাসান (আঃ) সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,মালাউন বা অভিশপ্ত মুয়াবিয়া মিথ্যাচার করছে।“ এরপর তিনি ইমাম পাকের যোগ্যতা ও মর্যাদার ব্যাপারে বিস্তারিত বক্তব্য রাখেন। সে সবের মধ্যে মুবাহিলাতে তাঁর অংশ গ্রহণের কথা তুলে ধরেন। অবশেষে তিনি বলেন, “আমরা কুরআন এবং হুজুর পাক (সাঃ) এর সুন্নাহ মুতাবিক সবার চেয়ে উত্তম এবং এ কারণেই সবার চেয়ে যোগ্যতর।” محمد ركن الدين قادري
বড় ইমাম পাক (আঃ) সন্ধির শর্তেই এটা উল্লেখ করেছিলেন যে তিনি কখনই মালাউন বা অভিশপ্ত মুয়াবিয়াকে আমিরুল মু’মিনিন বলবেন না। এরই আলোকে তিনি কখনও মুয়াবিয়ার হাতে বাইয়্যাত হননি এবং মুয়াবিয়ার কোনো নির্দেশই মান্য করতেন না। যেমন, মুয়াবিয়া খারেজিদের বিদ্রোহ দমনে ইমামের সহায়তা চান এবং তাঁকে খারিজিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নির্দেশ দেন। কিন্তু ইমাম হাসান (আঃ) তাঁর কথায় মোটেও কর্ণপাত করেননি।
অনেকে এ প্রশ্ন করেন যে, একদল লোক তো মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিল। তাহলে হযরত ইমাম হাসান (আঃ) কেন যুদ্ধ করলেন না? এর উত্তর হল, সে সময় যুদ্ধ করাটা ছিল মুসলমানদের বৃহত্তর স্বার্থের পরিপন্থী, তাই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দাবি যারা করেছিল তা মেনে নেয়াকে ইমাম যৌক্তিক মনে করেননি। নবী ও ইমামরা কখনও ভুল করেন না, যদিও জনগণ অনেক সময় এই ঐশী নেতৃবৃন্দের দূরদৃষ্টিপূর্ণ সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারে না বরং বহু পরে বুঝতে পারে। যেমন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর সম্পাদিত হুদায়বিয়ার সন্ধি। যেমন, হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা) হুদায়বিয়া সন্ধির অপমানজনক (দৃশ্যত) শর্তগুলোর আলোকে এ সন্ধির সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করছিলেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তখন বলেছিলেন, “ আমি আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল! আমি কখনও তাঁর নির্দেশের বিরোধিতা করি না এবং তিনি কখনও আমার কোনো ক্ষতি করেন না”। আর তাই হয়েছিল। কিছু দিন পর এই শান্তি চুক্তির কল্যাণকর দিকগুলো সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। কারণ, যুদ্ধের আগুন নিভে যাওয়ায় ও মক্কাতে মুসলমানদের গমনাগমনের কারণে মুশরিকরা ইসলামের প্রকৃত স্বরূপ বোঝার সুযোগ পেয়েছিল এবং তাদের অনেকেই মুসলমান হয়ে যায়। ফলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই মক্কার অধিবাসীদের বেশিরভাগই ইসলামে দীক্ষিত হয়। محمد ركن الدين قادري
বড় ইমাম পাক হযরত হাসান (আঃ)–কে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল মুনাফিক অভিশপ্ত মুয়াবিয়া জালিম হওয়া সত্ত্বেও আপনি নিজে সত্য পথে থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সত্ত্বেও কেন তার সঙ্গে যুদ্ধ-বিরতি বা সন্ধি করেছেন? বড় ইমাম পাক হযরত হাসান (আঃ) তখন হুদায়বিয়ার সন্ধির দৃষ্টান্ত দেন এবং হযরত খিজির (আঃ) এঁর কাজগুলোর রহস্যময় উদ্দেশ্য বুঝতে না পারার কারণে হযরত মুসা নবী (আঃ) এঁর রাগের কথা তুলে ধরেন। তিনি আরো জানান যে, অভিশপ্ত মুয়াবিয়ার সঙ্গে ওই সন্ধি না করলে পৃথিবীর বুকে আহলে বাইতের কোনো অনুসারী টিকে থাকত না। محمد ركن الدين قادري
“রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর বড় দৌহিত্র ইমাম হাসান (আঃ) এঁর যুগে কপটতা বা মুনাফিকির মাত্রা তাঁর বাবার যুগের তুলনায় এত বেশি বেড়ে গিয়েছিল যে বড় ইমাম পাক (আঃ) জানতেন তিনি যদি তাঁর মুষ্টিমেয় সঙ্গীদের নিয়ে যুদ্ধ করে শহীদ হয়ে যান তাহলে নৈতিক অধঃপতনে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ততকালীন মুসলিম সমাজ তাঁর রক্তের বদলা নেয়ার কোনো চেষ্টাই করত না। বরং মুনাফিক অভিশপ্ত মুয়াবিয়ার প্রচারণা, অর্থ বা ঘুষ ও কূট-কৌশলগুলো সবাইকে এমনভাবে বশে নিয়ে আসত যে দুই-এক বছর পর লোকেরা বলবে,বড় ইমাম হাসান (আঃ) বৃথাই বা অনর্থক মুয়াবিয়ার মোকাবেলায় রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাই বড় ইমাম পাক (আঃ) সব ধরনের কষ্ট নিজের জন্য ডেকে এনে সেসব সহ্য করলেন, কিন্তু তবুও শাহাদতের পথ ধরেননি; কারণ, তিনি জানতেন যে তাঁর শাহাদত বৃথাই যেত।“ এহাই শাহাদাতে সিররি বা গোপন শাহাদত পাক ।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর বড় দৌহিত্র ইমাম হাসান (আঃ) যে অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন তার সাক্ষ্য বহু আগেই দিয়ে গিয়েছিলেন প্রিয় নানাজি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)। তিনি বলেছিলেন, “বুদ্ধিমত্তা যার মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে সে হল হযরত হাসান বিন আলী (আঃ)।“محمد ركن الدين قادري
অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়া, ইমাম হাসান (আঃ) এঁর সঙ্গে সন্ধির পর যখন সব কিছুর ওপর নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় তখন সে প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়ে সন্ধির শর্তগুলো লঙ্ঘন করবে বলে জানিয়ে দেয়। অভিশপ্ত আবু সুফিয়ান পুত্র মুয়াবিয়া,বড় ইমাম পাক (আঃ) মদীনায় সব ধরনের কষ্ট দেয়ার চেষ্টা চালায় এবং মদীনায় নিয়োজিত তার গভর্নররাও একই কাজে মশগুল ছিল। ফলে বড় ইমাম পাক (আঃ) মদীনায় দশ বছর অবস্থান করা সত্ত্বেও তার অনুসারীরা এই মহান বড় ইমাম পাকের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ খুবই কম পেত। ফলে বড় ইমাম পাকহযরত ইমাম হাসান (আঃ) এঁর মত মহাজ্ঞানের উৎস থেকে খুব কম সংখ্যক অনুসারীই উপকৃত হতে পেরেছে। এই মহান ইমাম (আঃ) থেকে হাদিস পাকের বর্ণনার সংখ্যাও তাই খুব কম দেখা যায়। محمد ركن الدين قادري
মুনাফিক অভিশপ্ত মুয়াবিয়া নিজের মৃত্যু আসন্ন এটা উপলব্ধি করতে পেরে নিজের ছেলের জন্য ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার আয়োজন করতে থাকে। সে এটাও বুঝতে পেরেছিল যে, বড় ইমাম হাসান (আঃ) বেঁচে থাকলে জনগণ সহজেই তার লম্পট মদ্যপায়ী ইয়াজিদ কে খলিফা হতে দেবে না। তাই প্রতারক মুনাফিক অভিশপ্ত মুয়াবিয়া বেশ কয়েক বার রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর বড় দৌহিত্র হযরত ইমাম হাসান (আঃ) কে শেষ করে দেয়ার চেষ্টা করে। অবশেষে চক্রান্তের মাধ্যমে বিষ প্রয়োগে ইমামকে শহীদ করে। পঞ্চদশ হিজরির সফর মাসের ২৮ তারিখে ৪৮ বছর বয়সে শাহাদতের অমৃত পান করেন বড় ইমাম পাক হযরত হাসান (আঃ)। তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে মা-খাতুনে আতহার (আঃ) এঁর রওযা পাকের নিকটে দাফন করা হয়।
(اِنّا لِلّه وَ اِنّا اِلَيهِ راجِعون)
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর বড় দৌহিত্র ইমাম হাসান (আঃ) দেখতে প্রায় নানাজান এঁর মত তথা বিশ্বনবী রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর মতই ছিলেন। তাঁর আচার-আচরণও ছিল সে রকম। তাঁকে দেখলেই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এঁর স্মৃতি চাঙ্গা হত দর্শকদের মনে।
এই মহান ইমামের মূল্যবান একটি বাণী শুনিয়ে এবং সবাইকে আবারও শাহাদাৎ পাকের শোক ও বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে শেষ করবো আজকের এই আলোচনা।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এঁর বড় দৌহিত্র বড় ইমাম পাক হযরত ইমাম ইমাম হাসান ইবনে আলী (আঃ) বলেছেন- “আমি বিস্মিত হই তার ব্যাপারে যে তার খাদ্যের মান নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে বা চিন্তিত অথচ নিজের চিন্তার খোরাক নিয়ে ভাবে না। অর্থাৎ সে তার পাকস্থলীর জন্য ক্ষতিকর খাবার বর্জন করলেও তার চিন্তার জগতে এমন কিছুকে প্রবেশ করতে দেয় যা তাকে ধ্বংস করে।”
লেখক ও গবেষকঃ মুফতি মওলানা মুহাম্মাদ রুকুন উদ্দীন ক্বাদরী।