14/04/2024
★ বাংলা নববর্ষ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা ★
বাংলা নববর্ষ, মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে আমার আগের দুটি পোস্ট নিয়ে ফেসবুক বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ বিরুপ মন্তব্য করেছেন। তাদের জন্য খুব সংক্ষিপ্ত নিবেদন;
সংস্কৃতির খুব সহজ সংজ্ঞা, আমরা যা, তাই আমাদের সংস্কৃতি, Culture is nothing but what we are.
স্থান, কাল, ধর্মভেদে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এ সংস্কৃতি আমরা সচেতনভাবে লালন ও পালন করি।
বাংলাদেশের বাংলা ভাষাভাষি প্রধান জনগোষ্ঠী বাঙালি।
বাঙালি জাতির উৎপত্তির ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের। বাংলা নববর্ষ কে চালু করলো এবং কবে চালু হলো? তাও আমাদের অজানা নয়। অনুসন্ধিৎসু পাঠক গুগলে সার্চ দিয়ে ২/৩ টি প্রবন্ধ পড়ুন বা ইতিহাস সংক্রান্ত বইসমুহ পড়ুন। ঐতিহাসিকবৃন্দ তাদের গবেষণায় বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।
বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অধিকাংশ মানুষ মুসলিম, এর বাইরে আছেন সনাতন হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষ, বাঙালি খ্রিস্টানের ইতিহাস সাম্প্রতিক। বাঙালির সংস্কৃতি যুগ যুগান্ত ধরে গড়ে ওঠেছে যেমন
১। নামকেন্দ্রিক: নিমাই, যতীন, স্বরসতি, এবং মোমিন, করিম, ফাতিমা খাদিজা নামে বুঝা যায়, কে কোন ধর্মাবলম্বী;
পক্ষান্তরে বাবু, শিউলি, পরাগ, টম, টেমি, জেমি ইত্যাদি কিছু কমন নাম সকল ধর্মাবলম্বী এবং বাঙালি ব্যবহার করে;
২। খাদ্যাভাস: মুসলিমরা গরু খায়, হিন্দুরা খায় না। উভয় সম্প্রদায় মুরগি খায় এবং রান্না একই ধরনের। কিন্তু হিন্দু মানুষ ভগবানের নামে মুরগি জবাই করলে তা খাওয়া মুসলমানদের জন্য হারাম, যদিও তাদের বাসায় মাছ, ডিম দিয়ে খেতে বারণ নেই;
৩। পোষাক; কামিজ পাজামা ও শাড়ি বা পাজামা পান্জাবি সকল ধর্মের মানুষ পড়ে। তবে মুসলিম পর্দানশীল মেয়েরা কামিজ পাজামাতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কারণ শাড়ি পড়ে রিকশায় ওঠলে হাটু পর্যন্ত উদাম হয়, পেট বের হয়। পক্ষান্তরে কামিজ পাজামায় তা হয়না।
বাংলাদেশের মুসলিমরা ধুতি পড়ে না কিন্তু ভারতীয়রা পড়ে। ইসলামে সতর ঢাকা ফরজ এবং পোষাক নির্দিষ্ট করা নেই কারণ সৌদির আলখেল্লা গ্রীষ্ককালে বাংলাদেশে পড়া সম্ভব নয়;
৪। শব্দ চয়ন: ধর্মের বিষয় না হলেও শব্দ চয়ন ও সম্বোধন রীতিতেও আমরা আলাদা। যেমন দাদা, দিদি, মাসি,পিসি, জল, আদাব
ভাই, বোন, খালা, ফুপু, পানি, সালাম আমরা সচেতন ভাবে বলি ও রক্ষা করি। একই দেশ, একই ভাষা, একই গ্রাম--- কিন্তু দাদা-ভাই, জল- পানি এক হয় না। এটিই সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ বা স্বাজাত্যবোধ;
০৫.। এ পোস্টের মূল বিষয়ে আসি। বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষ যা করে, তাই বাঙালি সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি ধর্মকেন্দ্রিক পরিবর্তন হয়েছে। কিছু সংস্কৃতি কমন, যেমন বৈশাখী মেলা, হাডুডু, কাপাডি খেলা, নৌকাবাইচ, নাগরদোলা---পান্তা খাওয়া, গুড়ের জিলাপি, কানমুচরি খাওয়া--।
সকালে কাচা মরিচ, পেয়াজ, ভর্তা দিয়ে পান্তা খাওয়া---
গ্রামীণ বাঙালি জনপদের নিত্যদিনের চিত্র এই পান্তা। তাই তাদের কাছে ১লা বৈশাখে পান্তা খাওয়ার আলাদা কোনো গুরুত্ব নেই, সানকিতে রমনার বটমূলে পান্তা খাওয়া আপনার জন্য ফ্যাশন! কিন্তু গরীব বাঙালির ক্ষুধা নিবারন।
একদিনের বাঙালিপনা আপনার দৈন্যতা তুলে ধরে।
হিন্দু ধর্মাবলম্বী ধার্মিক ভাইবোনেরা প্রতিদিন সন্ধ্যায় পুজা দেয়, দীপ জ্বালায়, মঙ্গল প্রার্থনা করে, এটি তাদের ধর্মাচার ও সংস্কৃতি;
বর্তমানে যে মঙ্গল শোভাযাত্রা করা হয়, তা শুরু হয় আশির দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের কিছুসংখ্যক শিল্পীর মাধ্যমে। হয়তো হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মঙ্গল বাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেছেন, এটি তারা করতেই পারেন, তবে এটি মুসলিম পদ্ধতি নয়। মুসলমানরা নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে মঙ্গলের জন্য নিবেদন করেন, কোনো দেবতার কাছে নয়।
তাই যারা মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বাঙালির ঐতিহ্য বলছেন, তারা ইতিহাস বিকৃতি করছেন। ৮০ দশকে চালু হওয়া কতিপয় লোকের চিন্তা বাঙালির সংস্কৃতি হয় কিভাবে?
হিন্দু বিবাহিত নারীরা ধর্মীয় শাস্ত্র মতে মাথায় সিঁদুর দেয়, যা অবিবাহিত নারী করে না। যে সকল বাঙালি মুসলিম অবিবাহিত নারী মাথায় সিঁদুর দিয়ে নাচানাচি করে,তারা কি মুসলিম? এরাই এবার রোজার মাসেও হোলি খেলেছে। হোলি কিন্তু উৎসব নয়, এটি পুজা। তাই যে মুসলিম এসব না বুঝে করেন, তারা ভুল করেন, করছেন।
তাই "ধর্ম যার যার, উৎসব সবার " বলেন তাদের কাছে বিনীত প্রশ্ন হিন্দুরা কি মুসলিমদের কুরবানির ঈদে কুরবানি দেখতে আসে? গরু খায়? তারা গরু না খেলে আপনি মুসলিম নামে দেবতার ভোগ খান কোন আক্কেলে?
তাই "ধর্ম যার যার, উৎসব তাঁর তাঁর"।
তাই সংস্কৃতিকে বিকৃত করবেন না। জগাখিচুরি করা কারো জন্য কল্যাণকর নয়। সংস্কৃতি বিশুদ্ধ ও অখন্ড। যেমন মুসলিম সংস্কৃতি। আব্দুর রহমান, মোহাম্মদ নাম, নামাজ, রোজা একই নিয়মে সারা পৃথিবীর মুসলমানরা করে, ভাষা আলাদা হলেও নিয়ম ও বিশ্বাস একই।
তাই বাংলা নববর্ষ পালন দোষনীয় কিছু নয়। মুসলিম হিসেবে সকালে নামাজ পড়ুন, সারা বছর ভালো থাকার জন্য মোনাজাত করুন, পান্তা খান, আনন্দ করুন তবে তা আপনার বিশ্বাস অনুসারে। আপনার বিশ্বাস আমার ওপর চাপাবেন না বা সার্বজনীন করবেন না, সবার বলবেন না। আপনি করুন, আমার আপত্তি নেই।
আসুন বিশুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতি চর্চা করি ও তা রক্ষা করি।
ধন্যবাদ।
সংগৃহীত
লেখক: ড. মোঃ আজিজুল হক
পরিচালক(সাবেক)
উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি, রাজশাহী
প্রভাষক (সাবেক) সমাজবিজ্ঞান
সরদহ সরকারি কলেজ, রাজশাহী
পরিচালক ( সাবেক)
ইরানিয়ান কালচারাল সেন্টার রাজশাহী।
আঞ্চলিক পরিচালক, বাউবি