22/09/2026
বক্তৃতা ইংরাজিতে দেন বা বাংলায় পাঠ করেন, দুএকটা উচ্চারণ গত সমস্যাও বিষয় না! তার চেয়ে বিষয় আমেরিকা আপনাকে কোন চোখে দ্যাখে?
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে যাচ্ছেন। সরকার বলছে এটি একটি ঐতিহাসিক সফর। কিন্তু এই ঐতিহাসিক সফরের পেছনে ১৮ বছরের একটি অন্ধকার ইতিহাস আছে, যেটি সরকার ভুলিয়ে দিতে চায়।
প্লিজ তিনটি তারিখ মনে করুন।
৩ নভেম্বর, ২০০৮ - যেদিন আমেরিকা আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছিল তারেক রহমান গুরুতর দুর্নীতিবাজ এবং তার আমেরিকায় প্রবেশ বন্ধ করা উচিত।
নভেম্বর, ২০১১ - যেদিন এফবিআই এসে ঢাকার আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছিল - হ্যাঁ, এই ব্যক্তি টাকা পাচার করেছে, সিঙ্গাপুরে।
আর ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ - যেদিন সেই একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমেরিকায় পা রাখবেন, তাও আবার জাতিসংঘের বিশেষ সুবিধা নিয়ে।
চলেন, পয়েন্ট বাই পয়েন্ট দেখি।
প্রথম পয়েন্টঃ মার্কিন দূতাবাসের চোখে তারেক রহমান কে ছিলেন?
উইকিলিকস এর ফাঁস করা রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি 08DHAKA1143_a ক্যাবল:
"The Embassy believes that Tarique Rahman has engaged in serious political corruption that has had a serious negative impact on the national interests of the United States."
এবং তিনি সুপারিশ করছেন - Section 212(f) এবং Presidential Proclamation 7750 -এর অধীনে তার প্রবেশ বন্ধ করা হোক। এই প্রক্লেমেশন ৭৭৫০ কী? এটি দুর্নীতিবাজদের জন্য। যারা ঘুষ খায়, রাষ্ট্রের টাকা চুরি করে, তাদের জন্য।
ক্যাবলে আরও কী লেখা ছিল? তারেক রহমান "notorious and widely feared" - কুখ্যাত এবং ব্যাপকভাবে ভীতিকর। তিনি "a symbol of kleptocratic government and violent politics" - লুটপাটতন্ত্র এবং সহিংস রাজনীতির প্রতীক।
এবং তার কি কি দুর্নীতি কারা চিহ্নিত করেছিলো? সিমেন্স থেকে ঘুষ, হারবিন কোম্পানি থেকে ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার ঘুষ, মোনেম কনস্ট্রাকশন থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এমনকি বসুন্ধরা গ্রুপের একটি খুনের মামলা থেকে আসামিকে বাঁচাতে ২১ কোটি টাকা ঘুষ!
এগুলো সবই মার্কিন দূতাবাসের নিজস্ব তদন্ত এবং দুদকের অভিযোগ।
আমার প্রশ্ন - যে ব্যক্তিকে আমেরিকা নিজে ২০০৮ সালে "মার্কিন স্বার্থের জন্য হুমকি" বলেছিল, আজ ২০২৬ সালে তাকে কেন বিশেষ সুবিধা দিয়ে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে? তার দুর্নীতির অভিযোগ কি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে? না। তাহলে কেনো বা কিভাবে?
দ্বিতীয় পয়েন্টঃ এফবিআই
অনেকে বলে - এটি রাজনৈতিক মামলা। কিন্তু এফবিআই কি বিএনপি করে, না আওয়ামী লীগ করে?
২০১১ সালে ডেবরা ল্যাপ্রেভোট ঢাকায় এসে কী বলেছিলেন? তিনি বলেছিলেন - আমি নিজে তদন্ত করেছি। টাকা গেছে বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুরে। ওসিবিসি ব্যাংক থেকে সিটিব্যাংক। অ্যাকাউন্ট নম্বর ১৫৮০৫২-০১৬-০০৮। সেই অ্যাকাউন্টে তারেক রহমানের পাসপোর্টের কপি জমা দেওয়া ছিল ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য।
এটি মাদের পুলিশ বা দুদকের গল্প নয়, এটি এফবিআই-এর ফরেনসিক রিপোর্ট।
যদি এই অভিযোগ মিথ্যা হতো, তাহলে তারেক রহমান কেন সিঙ্গাপুরের সেই ব্যাংকে গিয়ে বলেননি - এটি আমার অ্যাকাউন্ট নয়? কেন তিনি লন্ডনে বসে ১৭ বছর ধরে এই মামলার মোকাবিলা করলেন না? কেনো এফবিআইয়ের এজেন্টের বক্তব্য নাকচ করে কোন কথা বললেন না!
আজ তিনি প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলছেন - নতুন বাংলাদেশ। কিন্তু নতুন বাংলাদেশে কি পুরনো অর্থ পাচারের হিসাব দেওয়া হবে না? সিঙ্গাপুরের সেই ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার কোথা থেকে এসেছিল? সেটি কি জনগণের টাকা ছিল না?
তৃতীয় পয়েন্টঃ বর্তমান সফর
সরকার বলছে - তিনি ২১ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে থাকবেন। প্রথমে বলা হয়েছিল সান ফ্রান্সিসকো যাবেন, ২৯ তারিখ পর্যন্ত থাকবেন। এখন হঠাৎ সফর সংক্ষিপ্ত, নাগরিক সংবর্ধনা বাতিল।
কেন? কারণ কি লজিস্টিক, নাকি ভিসার শর্ত?
আমি আপনাদের জাতিসংঘের নিয়মটি বলি। যদি কারো বিরুদ্ধে ৭৭৫০-এর মতো নিষেধাজ্ঞা থাকে, তাকে আমেরিকা সি-২ ভিসা দেয়। এই ভিসায় আপনি শুধু ২৫ মাইলের মধ্যে থাকতে পারবেন। আপনি কুইন্সে গিয়ে প্রবাসীদের নিয়ে সমাবেশ করতে পারবেন না। আপনি সান ফ্রান্সিসকো যেতে পারবেন না।
এটি শাস্তি নয়, এটি একটি সীমিত ওয়েভার। অর্থাৎ, আমরা তোমাকে গ্রেপ্তার করব না, কিন্তু তোমাকে পুরো দেশে ঘুরতে দেব না। তুমি শুধু জাতিসংঘের কাজ শেষ করে চলে যাও।
যদি তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা সত্যিই উঠে গিয়ে থাকে, তাহলে তিনি পূর্ণ এ-১ ভিসা পাচ্ছেন না কেন? তিনি কেন সান ফ্রান্সিসকো যেতে পারছেন না? কেন নাগরিক সংবর্ধনা বাতিল হলো?
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির শুধু বলছেন ব্যস্ত সূচি! কিন্তু ব্যস্ত সূচি থাকলে তো সফর বড় হওয়ার কথা, ছোট হওয়ার কথা নয়।
এখানেই সন্দেহ। আমার ধারণা - তাকে সি-২ ভিসা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, আমেরিকা এখনও তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। তারা বলছে - ঠিক আছে, তুমি প্রধানমন্ত্রী, তাই জাতিসংঘে আসতে দিলাম। কিন্তু এর বাইরে তোমাকে আমরা স্বাভাবিক রাষ্ট্রনেতার মতো চলতে দেব না।
শেষ পয়েন্টঃ
আমি তারেক রহমানের ব্যক্তিগত শত্রু নই। আমি একজন সাবেক সাংবাদিক। প্রশ্ন করতে ভালোবাসি।
আমার প্রশ্নগুলো হলো:
এক - ২০০৮ সালে যে দুর্নীতির জন্য আমেরিকা আপনাকে নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করেছিল, সেই দুর্নীতির টাকা কোথায়? জনগণকে কি তার হিসাব দেওয়া হয়েছে?
দুই - এফবিআই যে সিঙ্গাপুরের অ্যাকাউন্টের কথা বলেছে, সেই অ্যাকাউন্টটি কার? আপনি কি বলবেন সেটি আপনার নয়?
তিন - আপনি যদি সত্যিই দায়মুক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে আমেরিকা আপনাকে কেন সীমিত ভিসা দিচ্ছে? কেন আপনি সান ফ্রান্সিসকো যেতে পারছেন না?
এবং চার - নতুন বাংলাদেশের কথা বলছেন, কিন্তু পুরনো অভিযোগের জবাব না দিয়ে নতুন বাংলাদেশ কীভাবে হবে?
সরকারের সমর্থকরা বলবেন - এটি অতীত। আমি বলব - অতীত কখনো অতীত হয় না, যদি তার হিসাব না দেওয়া হয়।
২১ সেপ্টেম্বর তিনি নিউ ইয়র্কে যাবেন। তিনি ভাষণ দেবেন। ছবি তোলা হবে। কিন্তু ছবির পেছনের নথিটি থেকে যাবে।
সেই নথিতে লেখা থাকবে - ২০০৮ সালে আমেরিকা তাকে "kleptocratic rule"এর প্রতীক বলেছিল। ২০১১ সালে এফবিআই বলেছিল - তিনি অর্থ পাচারকারী।
আজ ২০২৬ সালে, তিনি প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু নথি বদলায়নি। বদলেছে শুধু ক্ষমতার চেয়ার!
সাইফুল আমিন
সাবেক সাংবাদিক
১৯.০৯.২০২৬