17/07/2026
শক্তিশালী এল নিনো, তীব্র গরম! ২০২৪ সালের পুনরাবৃত্তি?
আপনার ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন, প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হয়েছে এল নিনো! যেটা এই বছরের বাকি সময় ও আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। এবং এই সময়ে এই এল নিনো ইতিহাসের সর্বোচ্চ শক্তিধর হতে পারে বলে ইতিমধ্যে আমরা ধারণা পেয়েছি। এই বছরের এল নিনো নিয়ে আমরা ইতিমধ্যেই বেশ কিছু পোস্ট এবং বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছি।
সর্বশেষ আমরা ২০২৩ সালে এল নিনো দেখেছিলাম! যেটা মৌসুমী বায়ু থেকে শুরু করে ২০২৪ এর প্রায় ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। এবং সেই বছরগুলোতে অর্থাৎ ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে আমরা দেখেছি বাংলাদেশ থেকে শুরু করে ভারতীয় অনেক স্থানের তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি। মূলত এল নিনো তৈরির বছরের পরের বছরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার প্রভাব দেখা যায়। ফলে ২০২৩ সালের এল নিনোর পর ২০২৪ সালের তাপমাত্রা ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ।
তাহলে এই যে ২০২৬ সালের ইতিহাসকৃত শক্তিশালী এল নিনো সাগরে তৈরি হচ্ছে, এর ফলে ২০২৭ সালের তাপমাত্রা আবারও কি রেকর্ড করতে পারে বাংলাদেশ ? চলুন এটা নিয়ে আলোচনা করা যাক-
এল নিনো তৈরি হলে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলেও, মূলত বাংলাদেশের অধিকাংশ স্থানের তাপমাত্রায় তেমন প্রভাব রাখে না! নিচের ছবিতে লক্ষ্য করুন:
এই ছবিতে আমরা (অক্টোবর - নভেম্বরের) এল নিনো বা লা লিনার সাথে পরের বছরের গ্রীষ্মকালের (এপ্রিল এবং মে মাসের) তাপমাত্রার একটা সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। ছবিতে উজ্জল সবুজ থেকে লাল মূলত সদৃশ বা অনুরূপ সম্পর্ক বুঝানো হয়েছে এবং উজ্জ্বল নীল থেকে গোলাপি মূলত বিপরীত সম্পর্ক বোঝানো হয়েছে।
অর্থাৎ, যখন Enso3.4 এলাকার তাপমাত্রা বেশি থাকে মানে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে অর্থাৎ এল নিনো থাকে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে তখন এর ফলে পরবর্তী বছরের এপ্রিল ও মে মাসে কোন এলাকার তাপমাত্রা সদৃশ বা অনুরূপ সম্পর্ক রয়েছে? দেখুন দেশের খুলনা বিভাগের যশোর থেকে তার দক্ষিণ তাছাড়া বরিশাল বিভাগে এবং চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম ও তার দক্ষিণ অংশে মূলত এল নিনো বা লা লিনার সাথে তাপমাত্রা সুসম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ এল নিনা হলে এই সকল স্থানের তাপমাত্রায় কিছুটা বৃদ্ধি দেখা যায়। এবং লা লিনা হলে তাপমাত্রা সামান্য কিছুটা কমতি দেখা যায়।
পক্ষান্তরে, খুলনার যশোরের উত্তর, বরিশালের উত্তর এবং চট্টগ্রামের চট্টগ্রাম থেকে তার উত্তরে এর সম্পর্ক সম্পূর্ণ নেই! অর্থাৎ এখানে লা লিনা বা এল নিনোর সাথে না সুসম্পর্ক রয়েছে না বিপরীত সম্পর্ক রয়েছে! অর্থাৎ ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, খুলনা বিভাগের যশোরের উত্তর এবং চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রামের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম অংশে লা লিনা হলে তাপমাত্রা তেমন পরিবর্তন হয় না ঠিক এল নিনো হলেও সেখানে তাপমাত্রার তেমন প্রভাবিত হয় না। সেখানে তাপমাত্রার পরিবর্তনে মূলত আবহাওয়ার অন্যান্য উপাদান বা প্যারামিটার কাজ করে।
এখন প্রশ্ন হতে পারে তাহলে ভাই ২০২৩ সালের এল নিনো কিভাবে ২০২৪ সালের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করেছিল?
আমি আগেই বলেছি, এল নিনো থেকে মূলত দেশের খুলনা, যশোরে, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম ও তার দক্ষিণ অংশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু ঢাকার তাপমাত্রা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে কাজ করেছিল অন্য প্যারামিটার। ২০২৩ সালের এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগর থেকে পর্যাপ্ত গরম জল বা তাপ অপসারণ করতে পারেনি। যার কারণে এর যে স্বভাবগত রূপ, অর্থাৎ এল নিনোর সময় পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের জলের তাৎপর্য স্বাভাবিকের থেকে বেশি এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের জলের তাপমাত্রা স্বাভাবিক বা তার থেকে কম সেই রূপ দেখা যায়নি। ফলে এর থেকে তৈরি হওয়া রসবি তরঙ্গ মূলত ব্লকিং প্যাটার্নের মাধ্যমে উক্ত স্থানগুলোতে প্রভাবিত করেছিল। ফলে এল নিনোর জন্য যশোর ও তার দক্ষিণ, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম ও তার দক্ষিণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও রসবি ব্লকিং প্যাটার্নের জন্য অন্যান্য স্থানের তাপমাত্রা মূলত বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলে সকল কিছু মিলে দেশের তাপমাত্রা ছিল ইতিহাসকৃত সর্বোচ্চ।
তাহলে এই বছর কি হবে?
এখন এই বছরের যেই জলের তাপমাত্রা বা প্রশান্ত মহাসাগরে যেই তাপ সরবরাহ ছিল সেটা বেশ কমে গেছে। এবং এই এল নিনো সেটাকে আরও হ্রাস করবে ফলে এইবার রসবি ব্লকিং প্যাটার্নের সম্ভাবনা অনেক কম থাকবে। ফলে দেশের মধ্য, পশ্চিম এবং উত্তরাঞ্চলে ২০২৭ সালে তাপমাত্রায় প্রভাব রাখার সম্ভাবনা কম। তবে এই এল নিনোর প্রভাবে দেশের দক্ষিণ অঞ্চল এবং উপকূলীয় স্থানগুলোতে সামান্য তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভাবনা রয়েছে।
মোটকথা: এল নিনো হোক বা লা লিনা সেটা নিয়ে এত তুলকালাম হওয়ার মত কিছু নেই! সেটা নিয়ে অতিরঞ্জিত হওয়ার মত কিছু নেই। এল নিনো হলেই যে তাপমাত্রা বাড়বে তেমন না! আবার লালিনা হলেই যে তাপমাত্রা কমতি থাকবে সেটাও ঠিক না। দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অন্যান্য উপাদান বা প্যাটার্ন কাজ করে।
--- ধন্যবাদ (অভিজ্ঞ আবহাওয়া সংস্থা - XP Weather)