28/08/2026
গ্যাস অনুসন্ধানের কূপ খনন নিয়ে বিএনপির মিথ্যাচার: আসুন সত্যটা জাানি
———
বিএনপির মিথ্যাচার যেন অতীতের সব রেকর্ডকেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ বাজেট অধিবেশনে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর কাছে প্রশ্ন রাখেন— প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও কেন এখনো আশুগঞ্জ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি, যেখানে জ্বালানি মন্ত্রী নিজেই ১ মে’র মধ্যে গ্যাস সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছিলেন। জবাবে মন্ত্রী দাবি করেন, গত ১৭ বছরে দেশে নাকি কোনো গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খননই করা হয়নি।
কিন্তু বিষয়টা এখানেই থেমে থাকেনি। এবার রাজধানীর মহাখালীতে বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রায় একই সুরে কথা বললেন। তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছরে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার সরকার গ্যাসের একটি নতুন কূপও খনন করতে দেয়নি সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে। অর্থাৎ যে দাবিটি প্রথমে একজন মন্ত্রীর মুখে শোনা গিয়েছিল, এবার তা এলো একেবারে সরকারপ্রধানের কণ্ঠে।
আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, একই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন, বর্তমান গ্যাস সংকটের প্রকৃত কারণ আসলে কী। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে জাহাজে আনা গ্যাস যে দুটি ভাসমান স্টোরেজে রাখা হয়, তার একটিতে হঠাৎ দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার কারণেই সরবরাহে এই সংকট দেখা দিয়েছে, এবং কারিগরি ত্রুটি ইতিমধ্যে সারানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব ব্যাখ্যা অনুযায়ীই বর্তমান সংকটের সঙ্গে অনুসন্ধান কূপ খনন হয়েছে কি হয়নি তার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই— সমস্যাটি মূলত আমদানি অবকাঠামোর, অর্থাৎ ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটির। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়— সংকটের প্রকৃত কারণ নিজে জানার পরেও কেন বারবার "গত ১৭ বছরে কোনো কূপ খনন হয়নি" জাতীয় বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে?
চলুন, তথ্য দিয়ে বিষয়টা আরেকবার খতিয়ে দেখি।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত—শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার মোট ১৫৫টি কূপ খনন করেছে। এই সময়েই আবিষ্কৃত হয়েছে ৬টি নতুন গ্যাসক্ষেত্র—সুন্দলপুর, শ্রীকাইল, রূপগঞ্জ, ভোলা নর্থ, জাকিগঞ্জ এবং ইলিশা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে তখন দেশে গ্যাস উৎপাদন ছিল মাত্র ১৭৪৪ এমএমসিএফডি। সেই সীমাবদ্ধতা কাটাতে সরকার একসঙ্গে কয়েকটি কৌশল নেয়— দেশীয় অনুসন্ধান জোরদার, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আমদানির সমন্বয়।
এর ফলও আসে। কোভিড মহামারির আগে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বেড়ে প্রায় ২৭৫০ এমএমসিএফডি-তে পৌঁছায়। শুধু উৎপাদন নয়—অবকাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আসে। ২০০৯ সালে দেশে কূপ খননের জন্য একটি রিগও সচল ছিল না। পরবর্তীতে একটি পুরাতন রিগ পুনরায় চালু করা হয়, এবং আরও ৪টি নতুন রিগ সংগ্রহ করা হয়।
একই সময়ে অনুসন্ধান কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়— দ্বিমাত্রিক সিসমিক জরিপ চালানো হয় ৩১ হাজার ২৮১ লাইন কিলোমিটার, এবং ত্রিমাত্রিক জরিপ প্রায় ৬ হাজার ৯৮৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকায়। সমুদ্র অঞ্চলেও অনুসন্ধান থেমে থাকেনি— গভীর ও অগভীর সমুদ্রে ১২ হাজার ৬৪২ লাইন কিলোমিটার মাল্টিক্লায়েন্ট ২ডি সার্ভে সম্পন্ন হয়।
শুধু কূপ খনন বা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারই নয়— জ্বালানি খাতের প্রায় প্রতিটি সূচকেই ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বড় পরিবর্তন এসেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সালে দেশে সচল গ্যাসক্ষেত্রের সংখ্যা ছিল ২৩টি, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৯টিতে। এলএনজিসহ মোট গ্যাস সরবরাহ ১৭৪৪ এমএমসিএফডি থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৩১০০ এমএমসিএফডির বেশি। গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য ২১০২ কিলোমিটার থেকে বেড়ে হয় ৩৬৫৭ কিলোমিটার— অর্থাৎ নতুন করে যুক্ত হয় প্রায় ১৫৫৫ কিলোমিটার পাইপলাইন।
খনন রিগের চিত্রটাও লক্ষ্য করার মতো। ২০০৯ সালে দেশে যে দুটি রিগ ছিল, তার একটিও সচল ছিল না। ২০২৪ সালে এসে যুক্ত হয় ৪টি একেবারে নতুন রিগ, আর পুনর্বাসন করে সচল করা হয় পুরনো আরেকটি রিগ। এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থা তো ২০০৯ সালে ছিলই না— এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি কার্যক্রম হিসেবে গড়ে ওঠে, যেখান থেকে এখন সরবরাহ হয় ১১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, এই এলএনজি টার্মিনাল ব্যবস্থাই আজ প্রধানমন্ত্রীর নিজের ভাষায় বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দু— যা নিজেই একটি নতুন সংযোজন, পুরনো কোনো ব্যর্থতার ফল নয়।
জ্বালানি তেলের চিত্রেও একই ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। সরকারিভাবে পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ ৩৩ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন থেকে বেড়ে হয় ৬৯ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন। তেল মজুদ ক্ষমতা বাড়ে ৮ লাখ ৯৩ হাজার মেট্রিক টন থেকে ১৫ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টনে। জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য ২০০৯ সালে কোনো পাইপলাইনই ছিল না, ২০২৪ সালে তা দাঁড়ায় ৬২৪ কিলোমিটারে— এটিও সম্পূর্ণ নতুন সংযোজন। আর এলপিজি সরবরাহ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন থেকে বেড়ে হয় ১৪ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি— অর্থাৎ প্রায় ৩০ গুণ প্রবৃদ্ধি। এই পরিসংখ্যানগুলো জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব নথিতেই লিপিবদ্ধ আছে, যা ২০২৪ সালের আগস্টে "জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা দিবস" উপলক্ষে প্রকাশ করা হয়েছিল।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও চলমান ছিল একই সময়ে। ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম চলছিল—যেখান থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৬১৮ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। আরও বড় পরিকল্পনা ছিল—২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি কূপ খনন, ওয়ার্কওভার ও ডিপ ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৯৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য। প্রথম ৫০টি কূপের অধিকাংশই খনন সম্পন্ন হয়েছিল, এবং সেখান থেকে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্তও হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী প্রকল্পগুলো বাতিল করে দেওয়া হয় ইউনুস সরকারের সময়ে।
পেট্রোবাংলার অধীনে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং উপরের প্রতিটি পরিসংখ্যানই বলে দেয়—জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনে কতটা পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকারের সময়।
অন্যদিকে, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু নিজেই ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সেই সময়ে তার ব্যর্থতার কারণে তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। এবং সেই সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি—নাইকো চুক্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগে দেশকে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতির মুখে ফেলা হয়—যা আন্তর্জাতিক সালিশী আদালতের রায়েও উঠে এসেছে।
এমন একটি অতীত ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রী নিজে যে দাবি করেছিলেন, এখন সেই একই দাবি এসেছে খোদ সরকারপ্রধানের মুখ থেকেও— অথচ নিজের দপ্তরের নথিভুক্ত তথ্য বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা, আর সংকটের কারণ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নিজেই দায়ী করেছেন একটি ভাসমান জাহাজের যান্ত্রিক দুর্ঘটনাকে, কূপ খনন না হওয়াকে নয়।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়— সরকারের নিজস্ব দপ্তরের তথ্য-উপাত্ত সামনে থাকার পরেও বারবার এমন দাবি করা কি নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য, নাকি সচেতনভাবে তথ্য বিকৃতি?
প্রশ্নটা এখন সবার সামনে।